মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বিদায় পঞ্চম বিটল!

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৬

এনামুল হক

১৯৬২ সালে এ্যাবে রোডে ইএমআই স্টুডিওতে চার তরুণ যখন প্রবেশ করেছিল তখন প্রথম যে জিনিসটা জর্জ মার্টিনের মনে দাগ কেটেছিল তা হলো এদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। সবকিছুতেই বেশ ফিটফাট দেখাচ্ছিল এদের। তা দেখে বেশ স্বস্তিবোধ করেছিলেন তিনি। তবে তাদের ডেমোনেস্ট্রেশন টেপটা তার মনে রেখাপাত করতে পারেনি। কোথাও কোন ব্যাকরুমে রেকর্ড করা সুরের ভারসাম্যের কোন ঠিকঠিকানা নেই। লিভারপুল থেকে তাদের এখানে নিয়ে আসার পেছনে অহেতুক এত প-শ্রম হলো ভেবে হতাশই হয়েছিলেন তিনি।

এ চার তরুণ ছিল বিটলস। ওরাও জর্জ মার্টিনের হাবভাব দেখে সমান অবাক হয়েছিল। তারা তাকে নামী দামী গায়কের রেকর্ডের প্রযোজক হিসেবে জানত। নিখুঁত পোশাকের কেতাদুরস্ত চেহারার এই মানুষটির কণ্ঠে ছিল সদয় হেডমাস্টারের কণ্ঠ যা তারা আশা করেনি। কিন্তু নির্দোষ কৌতুকের প্রতি তার আকর্ষণ মুহূর্তের মধ্যে ওদের এই মানুষটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলল। আর মার্টিনও অচিরেই দেখতে পেলেন যে যাদের ডেমো রেকর্ড শুনে প্রথমে তিনি হোঁচট খেয়েছিলেন তারা তার প্রযোজনায় গান গাইবার জন্য অনুগতভাবে তার পাশে জড়ো হয়েছে। ওই চার তরুণকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল ব্যান্ডদল বিটলস এবং সেই বিটলস একদিন বিশ্ব জয় করেছিল। তাদের রেকর্ড প্রডিউসার ছিলেন স্যার জর্জ মার্টিন যিনি পরিচিতি লাভ করেছিলেন পঞ্চম বিটল হিসেবে। সেই জর্জ মার্টিন যিনি একাধারে ছিলেন রেকর্ড প্রডিউসার, এ্যারেঞ্জার, কম্পোজার কন্ডাক্টর ও অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার গত ৮ মার্চ অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

দি বিটলসকে উপরে তোলার পেছনে জর্জ মার্টিনের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। বিটলসের মূল এলবামগুলোর সঙ্গে ব্যাপকভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। যুক্তরাজ্যে মার্টিনের এক নম্বরের হিট সিঙ্গেলের সংখ্যা ছিল ৩০ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২৩টি। মার্টিন কমেডি ও নবেলটি রেকর্ডের প্রযোজনা করেছিলেন ১৯৫০-এর দশকের প্রথম দিকে। কাজ করেছিলেন পিটার সেলার্স, স্পাইক মিলিগান ও বার্নার্ড ক্রিবিনসসহ অন্যান্যের সঙ্গে। ছয় দশকেরও বেশি সময়জুড়ে ব্যাপ্ত তার ক্যারিয়ারে তিনি সঙ্গীত ছাড়াও চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও সরাসরি অনুষ্ঠান পরিবেশনা নিয়েও কাজ করেছেন। মিডিয়া কোম্পানিগুলোতে কিছু সিনিয়র এক্সিকিউটিভের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। কিছু সমাজসেবামূলক কাজেও তিনি জড়িত ছিলেন। সঙ্গীতশিল্প ও গণসংস্কৃতিতে তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৮ সালে তিনি নাইট ব্যাচেলর উপাধি লাভ করেছিলেন।

জর্জ মার্টিন অসাধারণ মেধাসম্পন্ন কেউ ছিলেন না। প্রতিভার উজ্জ্বলতা তার মধ্যে ছিল না। তিনি ছিলেন সব কাজের কাজি। কিছু কাজে তিনি ছিলেন মোটামুটি রকমের ভাল। তবে তার শ্রবণযন্ত্রটি ছিল চমৎকার। শিশুবয়সে নিজে নিজে পিয়ানো বাজানোর চেষ্টা করে তেমন একটা সফল হননি। ওবোয়ি সঙ্গীত শিখেছিলেন। তবে সেটা চলনসই গোছের। স্নাতক হওয়ার পর তিনি বিবিসির ধ্রুপদী সঙ্গীত বিভাগে কাজ করেন। পরে ১৯৫০ সালে ইএমআই’এ অসকার প্রেয়ুসের সহকারী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে প্রেয়ুস অবসরে গেলে তিনি পার্লোফোনের দায়িত্ব নেন। এ সময় তিনি লঘুসঙ্গীত ও ক্লাসিকালের দিকে ঝোঁকেন। বাখের প্রতি অনুরাগ থাকলেও তিনি লক্ষ্য করেন যে পপসঙ্গীত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো ও সৃষ্টি করার সুযোগ তার অধিকতর বেশি। সেই সঙ্গীতের আয়োজন ও রেকর্ড করার কাজটা তার কাছে ছিল অসংখ্য রঙের কারুকাজ চালানোর ব্যাপার।

দি বিটলসের সঙ্গে তিনি ১৯৬২ সালে তাদের প্রথম সিঙ্গেল ‘লাভ মি ডো’ থেকে শুরু করে শেষ এলবাম ‘এ্যাবে রোড’ (১৯৬৯) পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন। এই ব্যান্ড দলটি তার খুব পছন্দের ছিল। বিশেষ করে স্টারের ড্রামিং। মার্টিন পরে স্টারের প্রশংসা করে বলেছিলেন যে সে সম্ভবত আজকের (তখনকার) বিশ্বের সেরা ড্রামার। ১৯৬২ সালে রেকর্ড করা বিটলসের ‘লাভ মি ডু’ ব্রিটিশ চার্টে সপ্তদশ স্থান লাভ করে। সে বছর লেনন ও ম্যাকার্টনীর পীড়াপীড়িতে মার্টিন নতুন করে রেকর্ড করেন ‘প্লিজ প্লিজ মী’। এই গানটিতে মার্টিনের গুরুত্বপূর্ণ এক অবদান ছিল। প্রথমে যে গানটি ছিল একটা সেøা ব্যালাড মার্টিনের পরামর্শে সেটিতে গতি সঞ্চারিত করা হয়। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে মার্টিনের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান যা কিছু ছিল তার বদৌলতে বিটলসের অপরিশুদ্ধ মেধার ক্ষেত্রে যাবতীয় শূন্যতা পূরণ হয়ে যায়। মার্টিনের বাতলে দেয়া সুর ও ধ্বনির কল্যাণে বিটলসের সঙ্গে অন্যান্য ব্যান্ড গ্রুপের সুস্পষ্ট পার্থক্য রচিত হয়। এই পার্থক্যটাই শেষ পর্যন্ত তাদের সাফল্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিটলসের বেশিরভাগ অর্কেস্ট্রা ও ইন্সট্রুমেন্টেশন সঙ্গীতের দিক দিয়ে অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ এই ব্যান্ডের সহযোগিতায় মার্টিন নিজেই রচনা করেছিলেন ও পরিবেশন করেছিলেন। ব্যান্ডটির উত্থান ও জনপ্রিয়তা লাভের পেছনে মার্টিনের অবদানকে কেউ কখনও অস্বীকার করেনি। তারই স্বীকৃতি হিসেবে তাকে বলা হতো ফিফথ বিটল। কিন্তু মার্টিনের কাছে ব্যাপারটা হাস্যকর ঠেকেছিল। রেকর্ডগুলোর লেবেলে সুরকার হিসেবে লেনন ও ম্যাকার্টনীর সঙ্গে মার্টিনের নামও সংযোজিত করার প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু সেটাও পছন্দ হয়নি মার্টিনের। কিছুকাল পর ‘প্রযোজনায় জর্জ মার্টিন’ কথাগুলো রেকর্ডের লেবেলে যুক্ত করা হয়।

তবে যেটা নিয়ে মার্টিন জোর খাটাতে চেয়েছিলেন সেটা হলো বেতন ভাতা। বিটলসের বদৌলতে ইএমআই অচিরেই লাখ লাখ পাউন্ড আয় করলেও মার্টিনের আয় বছরে ৩ হাজার পাউন্ডেই আটকে ছিল। তাকে রয়ালটির ১ শতাংশের এক-পঞ্চমাংশই মাত্র দেখা হতো। এর চেয়ে বাড়তি কিছু আদায় করতে না পেরে মার্টিন ১৯৬৫ সালে ইএমআই ছেড়ে দেন এবং লন্ডন ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে তার নিজস্ব রেকর্ডিং কোম্পানি ‘এয়ার স্টুডিওস’ প্রতিষ্ঠা করেন। দি বিটলস ইএমআইয়ের সঙ্গেই থেকে যায়। তবে তারা দাবি করে যে মার্টিন যেহেতু তাদের বন্ধু তাই তাদের রেকর্ডিংয়ের কাজগুলো তাকে দিয়েই করাতে হবে। আর সে কারণেই মার্টিন শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গেই থেকে গিয়েছিলেন এবং সেটা দৃঢ়ভাবেইÑ যদিও এর মধ্যে উত্থান পতন ছিল এবং মাদক ও গার্লফ্রেন্ড নিয়ে অনেক স্ক্যান্ডালেরও জন্ম হয়েছিল। মার্টিন অবশ্য এ নিয়ে কখনও টুঁ শব্দটি করেননি।

সূত্র : দি ইকনোমিস্ট

প্রকাশিত : ২৯ মার্চ ২০১৬

২৯/০৩/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: