১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

নদীতে পানি নেই, দেশী মাছ যেন আজ রূপকথা


নদীতে পানি নেই, দেশী মাছ যেন আজ রূপকথা

এম এ রকিব ॥ মাছে-ভাতে বাঙালী- প্রচলিত এই প্রবাদ আজ যেন আমরা ভুলতে বসেছি। আমিষের আধার মাছ আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরই অংশ। এ দেশের নদ-নদী জলাশয়ে পানি আছে অথচ মাছ নেইÑ এক সময় এমনটি ভাবাও ছিল কল্পনার অতীত। তখনকার দিনে যেমন গোয়াল ভরা ধান ছিল, তেমনি এক কথায় বলতে গেলে নদী ভরা মাছও ছিল। অতীতের সেসব দিনে নদী-নালা, হাওড়-বাঁওড় ও খাল-বিলে পাওয়া যেত প্রচুর পরিমাণে নানা প্রজাতির দেশী মাছ। এসব মাছ খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনই এসবের কদরও ছিল বেশ। কিন্তু দুঃখজনক সত্য যে, সেসব দেশী মাছ আজ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশী মাছের সেই স্বাদ যেন আমরা বাঙালীরা আজ ভুলতে বসেছি। আর দেশী মাছের সেই স্থান দখল করে নিয়েছে কৃত্রিমভাবে চাষ করা নানা জাতের বিদেশী মাছ। জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন এবং দেশী মাছের এই হারিয়ে যাওয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা রীতিমতো শঙ্কিত।

কালের বিবর্তনে দেশের নদ-নদীতে বিপুল পরিমাণে পলি জমা পড়েছে। কিন্তু সময়মতো ঐসব নদ-নদী ড্রেজিং না করায় সেখানে পানির প্রবাহ ক্রমে হ্রাস পায়। ফলে বহু নদী এখন মরু অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। যে কারণে এখন সেখানে রীতিমতো ধান চাষ হচ্ছে, অথবা চলছে গরুর গাড়ি। এসব নদী-নালা-হাওড়-বাঁওড় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। আর তাই পদ্মা ও যমুনাসহ বিভিন্ন নদীতে সৃষ্ট রেণুপোনা ও ডিমওয়ালা মাছ আহরণ কমে গেছে অনেকটাই। এমনই নানা কারণে আজ হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছ। ইতোমধ্যেই দেশী সরপুঁটি, গনিয়া, মহাশোল, পাঙ্গাস (নদীর) ও পাবদাসহ বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক জাতের সুস্বাদু মাছ। বর্তমানে যে ক’টি মাছ অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলোও ইদানীং বিলুপ্তির পথে। এক সময় কুষ্টিয়া অঞ্চলে দেশীয় প্রজাতির সুস্বাদু হরেক রকম মাছের ছিল অবাধ বিচরণ। পদ্মা, গড়াই ও কুমার নদ-নদীসহ খাল-বিলের মিঠা পানির এই মাছের ছিল বিশেষ খ্যাতি। সেসব মাছ যেন আজ রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছে।

পরিবেশবিদ গৌতম কুমার রায় জানান, এক সময় এ দেশে প্রাকৃতিক পরিবেশে মিঠা পানির মোট ২৬০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এর মধ্যে ৫৪ প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। এছাড়া চিংড়ি ছিল ২৪ প্রজাতির। বিপন্ন পথের মাছগুলোর মধ্যে ভাঙ্গনবাটা, নান্দিনা, ঘোড়া মাছ, রিটা, ঘাওড়া, বাচা, শিলং, শিসর বা চেনুয়া, পিলাশোল, নাপিত কৈ, কালা মাগুর, বেলে, চিতল, ফলই ও নয়নাসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় নানা জাতের মাছ। এসব মাছ এখন প্রায় দুষ্প্রাপ্য। তিনি এই মাছ জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যদি আমরা অতিদ্রুত এসব মাছ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করি, তাহলে এক সময় আমরা এসব দেশী মাছের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলব। সেই সঙ্গে মাছে-ভাতে বাঙালীর পরিচয় থেকেও হবো বঞ্চিত।

কুষ্টিয়া পৌর বাজারের মাছ বিক্রেতা মতিয়ার রহমান জানান, খাল-বিলের মাছ এখন খুব একটা পাওয়া যায় না বললেই চলে। তবে বাজারে এখনও এসব মাছের চাহিদা প্রচুর। কদাচিৎ দেশী কোন মাছ বাজারে উঠলেও তার দাম থাকে আকাশচুম্বী। এক শ্রেণীর ক্রেতা আছেন, যারা বেশি দাম দিয়েই এসব দেশী মাছ ছোঁ মেরে কিনে নেন। নিরীহ সাধারণ মানুষের ভাগ্যে তা জোটেই না!

কুষ্টিয়া জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. শেখ শফিকুর রহমান বলেন, নদী, হাওড়-বাঁওড়ে একসময় দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এসব মাছ খেতে যেমন ছিল সুস্বাদু। তেমনই ছিল কদর। কিন্তু নানা কারণে দেশী সেসব মাছ আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আবার অনেক মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। তিনি জানান, বর্তমানে বিলুপ্ত মাছের তালিকায় স্থান পেয়েছে; গনিয়া, পাবদা, সরপুটি, গেড়োটাকি, নদীর পাঙ্গাস, বাঘাআইড়, ভাঙ্গন, চেগা, মহাশোল ও চ্যাকা প্রভৃতি মাছ। অপরদিকে বিলুপ্তি হবার পথে রয়েছে; ভেদা, খলিসা, চাপিলা, আইড়, বোয়াল, ট্যাপা বা পটকা, কৈই, শিং, মাগুর, শোল, গজাড়, কাঁকিলা, বাশপাতা, পিয়েলি, তিনকাটা, রানী, তারাবাইম, শালবাইম, গোচেবাইম, গুতুম, কুঁচো, কাজুলি, ঘাড়ুয়া, ট্যাংরা, তপসে, চাঁদা ও গলদা চিংড়ি প্রভৃতি। এদিকে পুকুরে চাষ করা এখন বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশী মাছের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এসব মাছের মধ্যে রয়েছে থাই পাঙ্গাস, থাই সরপুঁটি, সিরভার কার্প, কৈই, তেলাপিয়া, ঘ্রাসকার্প, পিরানহা, আফ্রিকান মাগুর প্রভৃতি। এদের মধ্যে আবার আফ্রিকান মাগুর, পিরানহা ও থাই পাঙ্গাস আমাদের জলজ পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।

শফিকুর রহমান জানান, পুকুর ও খাল-বিলে বাঁধ দিয়ে এখন চাষ করা হচ্ছে ভিনদেশী এসব মাছ। সেখানে দেশীয় কোন মাছ চাষ করা হয় না। ফলে দেশী মাছের বংশবৃদ্ধি রোধ হয়ে পড়েছে। বেশি বেশি করে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এই মাছের বংশবৃদ্ধির কার্যক্রম দ্রুত হাতে নেয়া এবং মানুষজনকে দেশী মাছ চাষের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তোলাসহ দেশী মাছের বংশ রক্ষায় সঠিক গবেষণার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতি জরুরী বলেও তিনি মনে করেন।