২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গত অর্থবছরে বিমানের রেকর্ড যাত্রীবহন, দেখেছে লাভের মুখ


আজাদ সুলায়মান ॥ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স গত অর্থবছরে রেকর্ডসংখ্যক যাত্রী বহন করেছে। ২০ লাখ ১৯ হাজার ৬৬৫ যাত্রী বহন করে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে, যা আগের বছরের তুলনায় শতকরা ২৩ ভাগ বেশি। এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করে রাজস্ব আয় করে মোট ৪ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ২৩ শতাংশ বেশি। এ রাজস্বের বিপরীতে সরকারের ভ্যাট ট্যাক্স বাবদ পরিশোধ করে ২৯২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রকৃত লাভের পরিমাণ মোট ২৭২ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এটা ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এ বার্ষিক সাধারণ সভার হিসাব।

রবিবার রাতে বিমানের বার্ষিক সাধারণ সভার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ সব তথ্য প্রকাশ করা হয়। বার্ষিক সভায় বর্তমান পর্ষদের মেয়াদও স্বাভাবিক ধারায় শেষ হয়। কোম্পানি আইন অনুযায়ী বর্তমান পর্র্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল জামাল উদ্দিনসহ অন্যান্য সব সদস্য ওই সভায় পদত্যাগ করেন। ফলে বিমানের জন্য নতুন পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। সোমবার বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয় থেকে নতুন পর্ষদ গঠনের প্রস্তাবনা প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হয়। আজ মঙ্গলবার নতুন পর্ষদের গঠন সংক্রান্ত আদেশ জারি হতে পারে।

নতুন পর্ষদের চেয়ারম্যান পদেও নতুন মুখ দেখা যাবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। বলেছেন, এ পদে বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ারমার্শাল এনামুল বারীর নাম আগেই চূড়ান্ত করা ছিল। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়া হবে। সদস্য পদেও কয়েকজন নতুন মুখ দেখা যাবে।

সভায় গত অর্থবছরের প্রতিটি সেক্টরের আর্থিক চিত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। বিশেষ করে গত ছয় বছরে বিমানের সার্বিক আর্থিক পরিস্থিতি কোন খাতে কেমন ছিল তারও মূল্যায়ন করা হয়। অতীতের তুলনায় যাত্রী যেমন বেড়েছে, তেমনি লাভের অঙ্কও বেড়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে বিদায়ী পর্ষদের কঠোর নীতির কারণে। প্রভাবশালী সব মহলের তদ্বির ও চাপ উপেক্ষা করে বিদায়ী পর্ষদ পেশাদারী মনোভাব নিয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করায় বিমান এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অপচয় দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরায় স্বার্থানে¦ষী মহল নাখোশ হলেও বিমানের সাধারণ কর্মচারী কর্মকর্তারা বিদায়ী পর্ষদের প্রতি যথেষ্ট আস্থাশীল ছিল।

বার্ষিক সভার প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরের কাক্সিক্ষত লাভের নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করে বিমানের নিজস্ব উড়োজাহাজ দিয়ে হজ পরিচালনা। চড়া সুদে লিজে উড়োজাহাজ না নিয়ে নিজস্ব বহরের দুটো বোয়িং ৭৭৭ দিয়ে গত বছর ৫৪ হাজার ৮৪৫ হজযাত্রী বহন করে বিমান।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, শুধু যাত্রী নয়, কার্গো বহন করেও বিমান বিপুল রাজস্ব আয় করে। এ সময়ে বিমান ৪৩ হাজার ৯২৪ টন কার্গো পরিবহন করে, যা আগের বছর ছিল ৩৩ হাজার ৫৫০ টন। যাত্রীর পরই বিমানের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করা হয় গ্রাউন্ড সার্ভিস থেকে। এ খাত থেকে আসে ৫৫০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। একইভাবে বিমানের নিজস্ব ক্যাটারিং বিএফসিসি ওই সময়ে লাভ করেছে ২৮ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এ সময়ে নিজস্ব পোলট্রি শাখাও লাভ করে ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

জানা যায়, দীর্ঘদিন অভ্যন্তরীণ রুট বন্ধ থাকার পর ওই অর্থবছরে তা চালু করা হয়। বর্তমানে সাতটি গন্তব্য চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, কক্সবাজার রাজশাহী সৈয়দপুর রুটে চলাচল প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রীর নির্ভরযোগ্য বাহন বিমান। ওই সময়ে দুটো ড্যাশ-৮ দিয়ে অভ্যন্তরীণ ছাড়াও কলকাতা ও ইয়াঙ্গুনের মতো আঞ্চলিক রুট পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিকে সাধারণ সভা শেষে চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল জামাল উদ্দিনের আমলের ছয় বছরে বিমানের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপেরও মূল্যায়ন করা হয়। তার আমলে বিমানে যোগ হয় নতুন ব্র্যান্ডের নিজস্ব চারটি বোয়িং ৭৭৭ ও দুটি ৭৩৭ উড়োজাহাজ। বোয়িং কোম্পানি থেকে কেনা দশটি উড়োজাহাজের মূল পাওনা ১ হাজার ৬৭৫ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে বিমান বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ধার নেয় ৭১৩ মিলিয়ন ৩৫ লাখ ডলার। এর মধ্যে বিমান নিজস্ব তহবিল থেকে ধারের ১৮৩ মিলিয়ন ৩৯ লাখ ডলার পরিশোধ করে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় ছিল- বিমান পাবলিক লিমিটেড হবার পর থেকে এসব পাওনা পরিশোধে বিমান সোভেরিন গ্যারান্টি ছাড়া সরকারের কাছ থেকে এক টাকাও আর্থিক সহায়তা হিসেবে নেয়নি। এ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটাই বিগত ছয় বছরের মধ্যে বিমানের জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য।

নিজস্ব চারটি ছাড়াও লিজে আনা হয় আরও দুটো ৭৭৭। নিজস্ব ও লিজ নিয়ে বিমান বহরের উড়োজাহাজের সংখ্যা বর্তামানে ১৪। বিমান বহরকে আরও আধুনিকায়নের জন্য পর্যায়ক্রমে বাদ দেয়া হয় অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের ডিসি-১০ এর মতো পুরনো উড়োজাহাজ।

এ সম্পর্কে বিমানের এক পরিচালক বলেন, বিগত ছয় বছরের বিমানের বহর শক্তিশালী ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি অনলাইনে টিকেটিং সিস্টেম চালু, দক্ষ পাইলট ও কেবিন ক্রু তৈরি করে একটি নির্ভরযোগ্য মানবসম্পদ গড়ে তোলা, ঢাকা লন্ডন সরাসরি ফ্লাইট চালু, কল সেন্টার চালু, ফ্রিকোয়েন্ট ক্লায়েন্ট কর্মসূচী হাতে নেয়া, লয়্যালটি ক্লাব, রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট কার্গো এ্যাকাউন্ট সেটেলমেন্ট সিস্টেমের অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়া হয়। মূলত প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী মহলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ওই পর্ষদ এ ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। পর্ষদ প্রধান এয়ার মার্শাল জামালের কঠোর ও দৃঢ় মনোবলের দরুণ বিমানে সুবিধা করতে পারেনি কোন স্বার্থান্বেষী মহল। এ ধরনের একটি শক্তিশালী পর্ষদ থাকায় বিমান ঘুরে দাঁড়িয়েছ নব প্রত্যয়ে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: