১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ঝুট দিয়ে তৈরি হচ্ছে তুলা, সুতা, এমনকি জামা কাপড়ও


অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দিনে সাড়ে পাঁচ শ’ টনের মতো পোশাক শিল্পের বর্জ্য বিদেশে রফতানি হচ্ছে। অন্যদিকে এগুলো থেকে দেশেই এখন তৈরি হচ্ছে তুলা, সুতা, এমনকি জামা কাপড়ও। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু মানুষের জীবিকা।

এই ব্যবসার শুরুটা পোশাক কারখানায়। ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় গিয়ে দেখা গেল সেখানে কাপড়ের মোটা স্তর মেশিন দিয়ে শার্টের প্যাটার্ন অনুযায়ী কাটা হচ্ছে। তাতে করে যে টুকরো টুকরো কাপড় তৈরি হচ্ছে তা মেঝেতে ফেলে দেয়া হচ্ছে।

ঢাকায় রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান বলছেন, এ গার্মেন্টসের এসব বর্জ্য ফেলার জন্য ভবনের একপাশে তৈরি করা হয়েছে একটি টানেল। প্রতিটা তলা থেকে বর্জ্যগুলো ওই টানেলের মাধ্যমে সরাসরি নিচে একটি ঘরে ফেলে দেয়া হয়। আর সপ্তাহে একবার এগুলো সংগ্রহ করেন ঝুট ব্যবসায়ীরা। এসব কাপড় অথবা কখনও কখনও সুতো কয়েক হাত ঘুরে পৌঁছে দোকানে। ঢাকার মিরপুর, গাজীপুরের কোনাবাড়ি আর নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছে বড় ঝুট পট্টি। রাজধানী ঢাকায় মিরপুরে যে জায়গাটি ঝুট পট্টি বলে পরিচিত সেখানে মূল রাস্তা ধরে গেলে আশপাশে অনেক ধরনের টুকরো টুকরো কাপড়ের স্তূপ অথবা বস্তা ভর্তি ঝুট পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাইরে থেকে দেখে হঠাৎ করে বোঝার উপায় নেই যে এখানকার অলিগলি দিয়ে ভেতরে কত শত শত দোকান পুরো এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে।

এখানে কিছুদূর হেঁটে এগুলেই দেখা যাবে, টিনের তৈরি অন্ধকার ঘর। ভেতরে বস্তায় ঠাসাঠাসি। সুতার কণায় বাতাস ভারি হয়ে গেছে। তার মাঝে বসে আছেন জিন্না শেখ। তিনি বলছেন, যেকোন ধরনের টুকরা কাপড়েই তাদের চলে। ছোট টুকরা এক কেজি দু’টাকায় কেনেন। টুকরা বড় হলে ১০ টাকার মতো।

খবর নিয়ে দেখা গেল, পোশাক শিল্পের বর্জ্যরে বেশ বড় গন্তব্য তুলার মিল। তুলার মিলে নিয়ে গিয়ে এসব ঝুট কি করা হয়? এ প্রসঙ্গে পোশাক মালিকদের সমিতি বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, তুলার মিলে নিয়ে গিয়ে এই ঝুটগুলোকে ব্লেন্ডিং করে তুলায় পরিণত করা হয়। এসব তুলা দিয়ে বালিশ বা লেপ তৈরি হয়। কখনও সুতাও তৈরি হয়। তুলার মিলে যাওয়া ছাড়াও একটু বড় কাপড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে পোশাক, যার গন্তব্য ঢাকার বঙ্গবাজার। সেখানে সাপ্লাই দেয়ার জন্য প্যান্ট তৈরি করছিলেন শুকুর আলী। তিনি বলেন, তাদের পছন্দ গেঞ্জির কাপড়।

ঝুট ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই ব্যবসায় প্রায় ৫০ লাখের মতো মানুষের জীবিকা চলে। গার্মেন্টস শিল্পের মতো ঝুট ব্যবসার দোকানগুলোতেও নারী কর্মীর সংখ্যাই বেশি চোখে পড়ে। মাজেদা বেগম বলেন, তিনি আকৃতি ও রং অনুযায়ী কাপড়গুলো আলাদা করেন এবং তারপর বস্তায় ভরে রাখেন। আর একাজের জন্য মাসে তিন হাজার টাকার মতো পান।

মিরপুরেই কয়েকটি দোকানে চোখে পড়ল একটি দুটি পুরনো দিনের স্পিন মেশিন। সেখানে রিসাইকেল করা সুতা স্থানীয় দর্জিরা নিচ্ছেন অথবা সেগুলো আবার কখনও কখনও গার্মেন্টসেই ফেরত যাচ্ছে। ঝুট দিয়ে বানানো হয় ম্যাট্রেসও।

ঝুট ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, এই আবর্জনার রয়েছে আরও অনেক সম্ভাবনা। দেশের ভেতরে নানা কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি দেশের বাইরে রফতানিও হচ্ছে ঝুট। ঝুট রফতানিতে জড়িত আশুলিয়ার মহির হোসেন ভুট্টো। তিনি বলছেন, প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২০ কন্টেনারের মতো পোশাক শিল্পের বর্জ্য বিদেশে রফতানি হচ্ছে। প্রতি কন্টেনার পণ্যের দাম ১৫ হাজার ডলারের মতো অর্থাৎ দিনে প্রায় আড়াই কোটি টাকা আয় হচ্ছে। এছাড়া স্থলপথে ভারতে যাচ্ছে আরও অনেক। যার ঠিক পরিপূর্ণ হিসেব নেই। জনাব ভুট্টো বলেন, বাংলাদেশে ঝুটের মূল্য এখনও বোঝেননি অনেকে। বিশ্বব্যাপী রিসাইকেল করা পণ্যের রয়েছে আলাদা মর্যাদা।

বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলছেন, সেই মর্যাদা পেতে পারে বাংলাদেশের ঝুট দিয়ে তৈরি পণ্যও। শুধু দরকার ব্রান্ডিং। এজন্য সহায়তা লাগবে কোন বড় ফ্যাশন হাউজের। বিসিকের মতো সরকারী সংগঠন সহজেই ঝুট পণ্যকে প্রচার করতে পারে। বাংলাদেশে ঝুট অথবা এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যবসা চলছে অগোছালোভাবে। ময়লার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে শিক্ষিতরা এই পেশায় আসতে চান না।

মিরপুরে কাটা কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির নিরীক্ষক মোঃ সেলিম বলছেন, এই ব্যবসা দিয়ে তারা পোশাক শিল্পে যে ব্যাপক পরিমাণে আবর্জনা তৈরি হচ্ছে তা পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তাদের প্রায়ই হেনস্তা হতে হয়। বাংলাদেশে ঝুটের ব্যবসা নিয়ে প্রায়ই শোনা যায় মারামারি, স্থানীয় প্রভাবশালীদের মস্তানি আর খুন খারাবির খবর। কিন্তু ঘিঞ্জি ময়লা ঝুটের দোকানে কাজ করে জীবিকা চলে যাচ্ছে বহু মানুষের। তবে ময়লার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে অনেকেই এই পেশায় আসতে চান না।