১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

পুলিশের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই ভয়াল-ভয়ঙ্কর কালরাত্রির কথা স্মরণে এলে বাঙালী মাত্রই শিউরে ওঠেন ভয়ে-আতঙ্কে। এদিন রাতের প্রথম প্রহরে বর্বর হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অকস্মাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র নিরীহ আপামর বাঙালীর ওপর। অপারেশন সার্চলাইট নামে অভিহিত সেই নির্বিচার হামলার প্রথম শিকার হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও ব্যারাক, একইসঙ্গে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলসমূহ; ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালীমন্দির, পুরনো ঢাকার শাঁখারীবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও দফতর। আকস্মিক এই বর্বরোচিত হামলায় নিহত ও আহত হন অগণিত মানুষ, যদিও এর কোন সঠিক তথ্য-পরিসংখ্যান নেই। এর পাশাপাশি এও সত্য যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধও গড়ে ওঠে এ সময়েই, যা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সুমহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা তথা সশস্ত্র প্রতিরোধ। ওই সময়ে রাজধানীর রাস্তায় রাস্তায় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার একটি সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ ছিল ব্যারিকেড ও প্রতিবন্ধক সৃষ্টির মাধ্যমে। তবে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। প্রথম দিকে পাক বাাহনীর আক্রমণ ও হামলার ভয়াবহতায় পুলিশ বাহিনী হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও অচিরেই তারা সীমিত সাধ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে। একই সময়ে পুলিশ সদস্যরা বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে রাজধানী আক্রান্ত হওয়ার বার্তা প্রেরণ করে দেশের থানাগুলোতে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা সংবলিত বার্তাও প্রচারিত হয় রাজারবাগ ওয়্যারলেসের মাধ্যমে। সেই হিসেবে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অবদান ও ত্যাগ-তিতিক্ষা একবাক্যে স্বীকার্য। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য থানা ও পুলিশ ফাঁড়িও আক্রান্ত হলে এই বাহিনীর সদস্যরা হয় শহীদ হন অথবা মুক্তিযুদ্ধে শরিক হন। এ প্রসঙ্গ ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে প্রথম মুজিবনগর সরকারকে ১৭ জন আনসার সদস্যের গার্ড অব অনার প্রদানের বিষয়টিও স্মরণ করা যেতে পারে। এসবই ইতিহাসের বিচার ও নিরিখে সত্য হলেও, পুলিশ সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সে সময়ে পুলিশ সার্ভিসে কর্মরত বাঙালী-অবাঙালী সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৯৯৫ জন। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার পুলিশ সদস্য প্রকাশ্যে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা সরকারের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। যারা পক্ষ ত্যাগ করেনি, তারাও কোন না কোনভাবে অবদান রেখেছে মুক্তিযুদ্ধে। তদুপরি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম রাতেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ যুদ্ধে ১৫০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য শহীদ হন। যুদ্ধের ৯ মাসে ১১০০ পুলিশ সদস্য শহীদ হন বলে খবর আছে। তবে পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী এই সংখ্যা ৭৫১ জন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পুলিশ সদস্যদের নাম রাজারবাগে নির্মিত স্মৃতিসৌধের চারপাশে উৎকীর্ণ আছে। তবে এটুকুই মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ সদস্যদের স্বীকৃতি হিসেবে যথেষ্ট নয়। যেহেতু বর্বর পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল পুলিশ সদস্যরাই, সেহেতু সঙ্গত কারণেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতিও তাদের প্রাপ্য। বিলম্ব হলেও এই দাবি অসঙ্গত ও অযৌক্তিক নয়। সরকার সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে স্বাধীনতা দিবস পদকে সম্মানিত করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পুলিশ বাহিনীকেও অনুরূপ সম্মান প্রদান করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে দেয়া যেতে পারে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।