২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

রিজার্ভ জালিয়াতিতে দায় কার?


রহিম শেখ ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ডলার বা ৮০০ কোটি টাকা চুরি হওয়ার ঘটনার নেপথ্যে ব্যাংকিং ভাষায় কোন তথ্য হ্যাকিং হয়নি, এটি প্রচলিত নিয়মকানুন মেনে লেনদেন হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের নিউইয়র্ক শাখায় থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট নম্বর, গোপন পাসওয়ার্ড ও বার্তা পাঠানোর সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে প্রচলিত নিয়ম মেনে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ লোপাটের ঘটনায় তাদের সিস্টেমের কোন দুর্বলতা ছিল না। এ নির্দেশনার আলোকেই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করেসপন্ডিং ব্যাংক ওয়েলস ফারগো, ব্যাংক অব নিউইয়র্ক মেলন এবং সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপিন্সে অর্থ স্থানান্তর হয়। তারপরও ব্যক্তির এ্যাকাউন্টে ডলার পাঠানোর নির্দেশনার কারণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সন্দেহ হলে তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি বার্তা পাঠায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এতে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি বলে লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট থেকে ফিলিপাইন ও শ্রীলংকায় অর্থ স্থানান্তরে ফেডারেল রিজার্ভ এবং সংশ্লিষ্ট তিন ব্যাংক যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি। তাহলে এ ঘটনায় দায় কার?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার সমান ১০ কোটি ডলার হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক তাদের সিস্টেমে কোনরকম হ্যাকিং এবং জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের কথা অস্বীকার করছে। ব্যাংকের প্রধান উইলিয়াম ডাবলি হ্যাকিংয়ের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। ব্যাংকটিতে ২৫০টির বেশি দেশ এবং বিদেশী প্রতিষ্ঠানের এ্যাকাউন্ট রয়েছে। ফেডারেল ব্যাংকের মুখপাত্র আন্দ্রেয়া পেরিয়েস্ট বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের নিউইয়র্ক শাখায় থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট নম্বর, গোপন পাসওয়ার্ড ও বার্তা পাঠানোর সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে প্রচলিত নিয়ম মেনে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ নির্দেশনার আলোকেই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করেসপন্ডিং ব্যাংক ওয়েলস ফারগো, ব্যাংক অব নিউইয়র্ক মেলন এবং সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপিন্সে অর্থ স্থানান্তর হয়। তারপরও ব্যক্তির এ্যাকাউন্টে ডলার পাঠানোর নির্দেশনার কারণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সন্দেহ হলে তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি বার্তা পাঠায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এতে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি বলে লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, পেমেন্ট ইস্যুতে আমাদের ব্যাংকে আজ পর্যন্ত জালিয়াতির কোন প্রমাণ নেই এবং এ ধরনের কোন ঘটনার সাথে আপোস করা হয়েছে তারও কোন প্রমাণ নেই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জালিয়াতির যে কথা জানিয়েছে সে বিষয়ে ফেডারেল ব্যাংকের মুখপাত্র আন্দ্রেয়া বলেছেন, বাংলাদেশের দাবি মতো এ ঘটনার আগে থেকে তাদের সাথে আমরা কাজ করে আসছি, আগামীতেও করব এবং এ ব্যাপারে আমরা তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা করব।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ লোপাটের ঘটনায় আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) বলছে, তাদের সিস্টেমের কোন দুর্বলতা ছিল না। সারাবিশ্বের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এর সদস্য। এক দেশ থেকে আরেক দেশে সুইফটের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকে। এজন্য সুইফট প্রত্যেকটি সদস্যকে একটি নির্দিষ্ট কোড ও সিস্টেম ব্যবহারের জন্য গোপন নম্বর (পিন) দিয়ে থাকে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম হ্যাক করে সুইফট মেসেজ পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপিন্স এবং শ্রীলঙ্কার দুটি ব্যাংকে ব্যক্তিগত এ্যাকাউন্টে স্থানান্তর হয়।

সম্প্রতি সুইফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) গোটফ্রিড লেব্র্যান্ডট এক চিঠিতে বাংলাদেশে তাদের সদস্যদের বলেছেন, তাদের সিস্টেমে হ্যাকিংয়ের কোন ঘটনা ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকও তাদের সিস্টেম হ্যাক হয়নি বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছে। সম্প্রতি সুইফটের দুই প্রতিনিধি বাংলাদেশ ব্যাংক ঘুরে গেছেন। ওই প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, তদন্তকারী সংস্থাগুলো ও বাংলাদেশের সুইফট ইউজার গ্রুপের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠকে তারা জানিয়েছেন, তাদের সিস্টেমে কোন হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেনি। যার অর্থ এ ঘটনার পুরো দায় বাংলাদেশ ব্যাংককেই নিতে হচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক (এফআরবি) অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট থেকে ফিলিপিন্স ও শ্রীলংকায় অর্থ স্থানান্তরে এফআরবি এবং সংশ্লিষ্ট তিন ব্যাংক যথাযথ নিয়ম মানেনি বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির পর বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে এসব ব্যাংকের কর্তব্যে অবহেলা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি গত ১৩ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, সিআইডি এবং সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি এসব ব্যাংকের দায় আছে কি-না, তা খতিয়ে দেখছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, এফআরবি নিউইয়র্ক এবং এর করেসপন্ডিং ব্যাংক ওয়েলস ফারগো, ব্যাংক অব নিউইয়র্ক মেলন এবং সিটিব্যাংক নিউইয়র্কের অর্থ স্থানান্তরের আইনী দায় সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সে দেশের আইনজ্ঞের পরামর্শ নেয়া হচ্ছে। পরামর্শের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ দাবির মামলা করা হতে পারে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের স্টোলেন এ্যাসেট রিকভারি উদ্যোগের আওতায়ও এ বিষয়ে পরামর্শ নেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, পরিশোধ অর্ডার কার্যকরের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর যথাযথ নিয়ম না মানার বিষয়টি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা এগমন্ট গ্রুপ, এপিজিসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই, দেশটির এ্যান্টি মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাকেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্ধতন এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে বলেন, ৮ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে সরকারের কয়েকটি প্রকল্পের ঋণ ও পরামর্শক ফির নামে। এছাড়া ৩০টি পরিশোধের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃসম্মতি ও ৪টি পরিশোধের বিষয়ে অধিকতর ব্যাখ্যা চেয়ে বার্তা পাঠিয়েছিল এফআরবি। ব্যাখ্যা পাওয়ার আগেই তারা তাদের করেসপন্ডেন্ট তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে ফিলিপিন্স ও শ্রীলংকায় অর্থ স্থানান্তর করে। অর্থ স্থানান্তর বিষয়ে এ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও তার উত্তর পায়নি বাংলাদেশ। এজন্য সম্প্রতি মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে একজন মার্কিন আইনজীবীও নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।