১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কক্সবাজারে গড়ে উঠতে পারে নাপ্পি তৈরির কারখানা


এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ কক্সবাজারে নাপ্পি ব্যবসা হচ্ছে রাখাইনদের জীবিকার একমাত্র ভরসা। শহরে বসবাসকারী রাখাইনরা বার্মিজ মার্কেট ও বিভিন্ন ব্যবসায় ব্যস্ত রয়েছে। তবে টেকনাফ, মহেশখালী ও চৌফলদন্ডীর রাখাইনদের জীবন ধারণের উপায় হচ্ছে নাপ্পি। রাখাইন সম্প্রদায় ছাড়া অন্য জাতির কাছে নাপ্পি শব্দটা অনেকটা নতুন বললে চলে। দেশের বহু জায়গায় নাপ্পি চেনে না অনেকে। সাগরের ছোট ছোট চিংড়ি দ্বারা তৈরি করা হয় নাপ্পি। এটি রাখাইনদের পছন্দনীয় খাবারের তালিকার একটি। এই নাপ্পি রাখাইনরা পেশা হিসেবে নিলেও সরকারী সাহায্য সহযোগিতার অভাবে ঐ ব্যবসার পরিপূর্ণতা পাচ্ছে না বলে জানা গেছে। সরকারী বা এনজিও সংস্থার সহযোগিতা পেলে এখানে নাপ্পি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শিল্প কারখানাও গড়ে উঠতে পারে। সদরের উপকূলীয় চৌফলদন্ডী, মহেশখালী ও টেকনাফে ৫ শতাধিক রাখাইন পরিবার নাপ্পি ব্যবসায় জড়িত রয়েছে। টেকনাফ, চৌধুরীপাড়া, বড় মহেশখালী, হারবাং, চৌফলদন্ডীর উত্তর, মাঝের ও দক্ষিণ পাড়ার তিন এলাকায় তারা বসবাস করে। পেশা হিসেবে নাপ্পি ব্যবসাকে বেছে নিয়েছে রাখাইনরা। এ রাখাইন সম্প্রদায়ের অন্যতম ব্যবসা হিসেবে পরিচিত নাপ্পি খুবই উপাদেয় খাদ্য। তাদের সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই নাপ্পি খাবারের তালিকায় রাখা হয়ে থাকে। শুধু রাখাইন নয়, আদিবাসীদের বহু নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী নাপ্পি পছন্দ করে বেশি। তাই দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ উত্তর বঙ্গের অনেক এলাকা এবং ভারত শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে ঐ সম্প্রদায়ের খাদ্য উপাদান হিসেবে নাপ্পির কদর আকাশ ছোঁয়া বলা যায়। নাপ্পি ব্যবসায় জড়িত হয়ে অনেক অসচ্ছল পরিবার এখন সচ্ছলতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। চৌফলদন্ডীর রাখাইন মহিলা মাছুয়ে রাখাইন, আপ্পুয়ে রাখাইন ও কিমচেং রাখাইন জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের (রাখাইন সম্প্রদায়ের) অন্তত ১৬০টি ফিশিং বোট ছিল। ১৯৯১ সনের ঘূর্ণিঝড়ে তা ল-ভ- হয়ে যায়। এর পর থেকে কষ্টে দিনযাপন করে আসছি। ও সময় ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অনেকে সাহায্য পেলেও শুধু বঞ্চিত হয়েছি আমরা। বিএনপি সরকার রাখাইনদের নৌকা প্রতীকের চিহ্নিত ভোটার বলে দাবি করে কোন ধরনের সরকারী সাহায্য সহযোগিতা দেয়নি। এটি অবশ্যই মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে দাবি করেছেন রাখাইনরা। পরবর্তীতে গ্রামীণ ব্যাংক, আশা ও মুক্তিসহ বিভিন্ন ব্যাংক-সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে নাপ্পি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নাপ্পি দেশের নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা যেতে পারে বলে অনেক রাখাইন নারী-পুরুষ জানিয়েছেন।

কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডীর রাখাইন পল্লীতে গিয়ে দেখা গেছে, নাপ্পি তৈরিতে মশগুল রাখাইন মহিলাদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও। কেউ মাছ শুকিয়ে নাপ্পি তৈরি উপযোগী করছে। কেউ নাপ্পির জন্য ছোট ছোট চিংড়ি নিয়ে আসছে। আবার কেউ তৈরিকৃত নাপ্পি ফের রোদে শুকিয়ে প্রসেসিং করতে ময়লা বাছাই করে নিচ্ছে। সাগর থেকে আহরণকৃত ফিশিং বোটের ছোট ছোট চিংড়িগুলো ঠেলাগাড়ি ভর্তি করে নিয়ে আসছে নাপ্পি শুকানোর স্থলে। সাগর থেকে ওসব চিংড়ির ধরে আনতে দ্বাদনও দিয়ে থাকে রাখাইনরা। জেলেরা সাগর থেকে ধরে চিংড়িগুলো নিয়ে আসে রাখাইন পল্লীতে সরবরাহ দিয়ে চলছে। স্থানীয় অনেক রাখাইন জানান, তাদের বাপদাদার নিশানা হিসেবে রাখাইন পরিবার এ পেশায় জড়িত রয়েছে এখনও। তবে মাছ শুকানোর জন্য ইতোপূর্বে তাদের যেসব জায়গা ছিল, তা দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। উপায়ান্তর না দেখে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের পাশে ও পুকুরপাড়ে তারা বর্তমানে নাপ্পি তৈরিকল্পে চিংড়ি (স্থানীয় ভাষায় মিং) শুকাচ্ছে। তারা আরও জানান, ছোট ছোট চিংড়ি মাছ ক্রয় করে রোদে শুকিয়ে, ঢেঁকিতে চূর্ণ করে নাপ্পি তৈরি করা হয়। ফের রুদে শুকিয়ে একটু শক্ত হলে বাছাই করা হয় ময়লা। ঢেকিতে আবারও চূর্ণ করে এসব নাপ্পি ঝুড়িতে পাতা দিয়ে বেঁধে পোটলা করা হয়ে থাকে পৃথকভাবে। পরে ওসব নাপ্পি পাহাড়ি এলাকা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, দিঘীনালা, বাঙ্গলা খালী, রাজস্থলী, চন্দ্রঘোনা, পানছড়ি ও রংছড়িসহ বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকায় বিক্রয় করা হয়। অনেক সময় কক্সবাজার সৈকতে ভ্রমণে আসা বিদেশী পর্যটকরাও নাপ্পি খেতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। পরে তারা দুয়েকটি নাপ্পির প্যাকেট কিনে নিয়ে যায়। রাখাইন নেতারা জানান, সরকারী সহযোগিতা পেলে এ ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হবে।