১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি, আমরাই দেশ গড়ব


মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি, আমরাই দেশ গড়ব

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার ৪৫ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশকে বিশ্বে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে সব নাগরিককে অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, চলুন সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশটাকে গড়ে তুলি। বিশ্বে কেউ যেন বাংলাদেশকে অবহেলা করতে না পারে, সেভাবে দেশকে গড়ে তুলি। স্বাধীনতার ৪৫ বছর আজ। আমরা আর পিছিয়ে থাকব না, আমরা এগিয়ে যাব। আমরা উন্নয়নের কোন ক্ষেত্রেই আর পিছিয়ে থাকতে পারি না। বিশ্বে যেন আমাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়, আত্মমর্যাদাশীল হয়- সেভাবে আমরা দেশকে গড়ে তুলব।

বাংলাদেশ যে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে তা ধরে রাখতে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবসময় মনে রাখতে হবে আমরা বিজয়ী জাতি। মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। আমরাই এ দেশকে গড়ে তুলব। আমরা ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হবো। তাই আজকে যারা শিশু তোমরাও সেভাবে নিজেদের গড়ে তুলবে। আগামী দিনে তোমরাই তো এদেশের কর্ণধার হবে। তোমরাই তো এদেশ পরিচালনা করবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে নিজেদের আত্মবিশ্বাসী পথচলা ভবিষ্যত প্রজন্মেও সঞ্চারিত হবে এমন কামনাও করেন প্রধানমন্ত্রী।

শনিবার সকালে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শিশু-কিশোর ও তরুণদের আগামীর বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেয়ার জন্য নিজেদের যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তোমরাই তো একদিন দেশ পরিচালনা করবে। আমাদের মতো মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী হবে। সেজন্য নিজেদের এখন থেকেই তৈরি করতে হবে।

আগামীর যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার জন্য শিশু-কিশোরদের গুরুজনকে শ্রদ্ধা ও মান্য করা এবং লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা নিজেদের আগামীর দেশ পরিচালনার যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোল। যাতে বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে যে স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন তাঁকে আমরা বিশ্বে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারি। তিনি বলেন, আমরা এগিয়ে যাব। আমরা বিশ্বে নিজেদের এমন অবস্থানে নিয়ে যাব, যাতে করে আর কেউ কোনদিন আমাদের অবহেলা করতে না পারে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সময় আমরা সবসময় বৈষম্যের স্বীকার হয়েছি। এ দেশের মানুষের শিক্ষার সুযোগ ছিল না, তারা চিকিৎসা পেত না, তাদের খাবার ছিল না, আশ্রয় ছিল না। আমাদের অর্থ-সম্পদ লুট করে নিয়ে যেত পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী সব সময় শোষণ করত। এমনকি আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার পর্যন্তও তারা কেড়ে নিতে চেয়েছিল।

২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। এজন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ২৩ বছরের সংগ্রাম-নির্যাতন, জেল-জুলুম সহ্য করতে হয়েছে। ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন তিনিই প্রথম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এরপর ছয় দফা, সত্তরের নির্বাচন ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি দেশকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।

শেখ হাসিনা বলেন, সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী শাসন ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। সে সময় ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্সের ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে সমগ্র বাঙালী জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। লাখো জনতার সমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমগ্র জাতি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে। তাঁর ডাকে পূর্ব বাংলায় শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ২৫ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী অতর্কিতে নিরস্ত্র-নিরীহ বাঙালীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরসহ শিশু-কিশোর-নারী-বৃদ্ধ, কাউকেই রেহাই দেয়নি তারা। ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যায় মেতে ওঠে পাক সামরিক বাহিনী। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এরপরই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর আহ্বানে মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করি।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। আর ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা নিজেদের দক্ষিণ এশিয়ার একটি সুখী ও সমৃদ্ধ, উন্নত দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবো ইনশাল্লাহ। কোনদিক থেকেই পিছিয়ে থাকবে না বাংলাদেশ। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে আমরা এগিয়ে যাব। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিটি ছেলেমেয়ে এখন স্কুলে যেতে পারে। বিনা পয়সায় বই দেয়া হচ্ছে, উচ্চশিক্ষায়ও বৃত্তি দেয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী সমাবেশস্থলে আসেন সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে। তিনি স্টেডিয়ামে এসে শুরুতেই ‘টাইগার ক্যারাভ্যান’ এ প্রবেশ করে ঘুরে দেখেন। এরপর তিনি মঞ্চে ওঠেন। মঞ্চে ওঠে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সঙ্গীতের তালে তালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় প্যারেড কমান্ডার ইসরাত জাহান মিলির নেতৃত্বে সালাম ও জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে এ সমাবেশের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর পায়রা অবমুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে মাঠের দুই দিক থেকে কয়েকশ পায়রা মুক্ত করে দেয়া হয়। পরে হেঁটে কুচকাওয়াজস্থল পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সমাবেশ পরিদর্শনের জন্য খোলা জিপের ব্যবস্থা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী হেঁটে সমাবেশ পরিদর্শন করেন। সমাবেশ পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী ভিআইপি গ্যালারিতে গেলে কুচকাওয়াজ শুরু হয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিশু সংগঠন কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কুচকাওয়াজ অভিবাদন গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

শিশু-কিশোরদের কুচকাওয়াজ শেষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ঘোড় সওয়ার দল মার্চপাস্ট করেন। এরপর সুসজ্জিত গাড়িবহরের মাধ্যমে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রতিকৃতি, গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, নৌকা, ডিজিটাল বাংলাদেশে কৃষক ল্যাপটপ ব্যবহার করছে ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয়। শিশু-কিশোরদের মনোজ্ঞ ডিসপ্লে সমাবেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন ছিল। প্রথমে মনোজ্ঞ ডিসপ্লের আয়োজন করে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতেশ্বরী হোমস। তাদের ডিসপ্লের নাম ছিল ‘বিজয় নিশান’।

এরপর ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ এই শিরোনামে সরকারী শিশু পরিবার তেজগাঁওয়ের আয়োজন সবার নজরকাড়ে। ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের মনোমুগ্ধকর প্রদর্শনীতে দর্শক গ্যালারি মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রত্যন্ত অঞ্চল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের শিবগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় আয়োজনের নাম ছিল ‘ভাষা আন্দোলন’। ‘শান্তিময় বাংলাদেশ’ শিরোনামে কেরানীগঞ্জের চড়াইল নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সুখ-শান্তির কথা তুলে ধরে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও উপজাতির সংস্কৃতি তুলে ধরে। সবশেষে মনোজ্ঞ ডিসপ্লেতে অংশ নেয় রাজধানীর বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থীরা। সব দলের অংশগ্রহণে সম্মিলিত প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শেষ হয় জাতীয় শিশু কিশোর সমাবেশ।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক উপস্থিত ছিলেন। ঢাকার জেলা প্রশাসক মোঃ সালাউদ্দিন অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারি এদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের প্রতিকৃতি, ছবি এবং দেশের নানা প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দিয়ে সাজানো হয়।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: