১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আত্মসমর্পণের পূর্ব মুহূর্তগুলো


একাত্তরের সাতই ডিসেম্বর নাগাদ ঢাকায় পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টারে বিষাদের ছায়া নেমে এলো। রণাঙ্গনগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ঝানু পাকিস্তানী জেনারেলরা প্রমাদ গুনলেন। তাঁরা বুঝতে পারলেন যে, ‘হলুদ’ বা ‘সাদা’ কোন বন্ধুই আর সাহায্যের জন্য আসবেন না। এদিকে যশোর সেক্টরে নবম ডিভিশনের ৫৭ ব্রিগেড পর্যুদস্ত অবস্থায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ অতিক্রম করেছে। উত্তরবঙ্গ সেক্টরের ১৬ ডিভিশন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। ১৪ ডিভিশন সিলেট ও ভৈরব বাজার থেকে বেরোতে পারছে না। ৩৯ ডিভিশনের আর অস্তিত্ব নেই এবং ৩৬ ডিভিশনকে মুক্তিবাহিনী পশ্চাদ্ধাবন করে চলেছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, রাজধানী ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা। এই দায়িত্বে নিয়োজিত ব্রিগেডিয়ার বাকের কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে বার্তা পাঠালেন ঢাকায় চলে আসার জন্য। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার আতিক সুরক্ষিত কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে আসতে অস্বীকার করলেন। ভৈরববাজার থেকে ঢাকায় ফিরে আসার জন্য মেজর জেনারেল কাজীকে ‘মেসেজ’ পাঠানো হলো। কিন্তু প্রয়োজনীয় নৌযান না থাকায় তিনি অপারগতার কথা জানালেন। উত্তরবঙ্গের রংপুরে অবস্থানরত মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহের কাছে সাহায্যের অনুরোধ জানানো হলো। তিনি একটা ব্যাটালিয়ন ঢাকার দিকে পাঠালে, যমুনা নদী অতিক্রম করার আগে তা’ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ময়মনসিংহ থেকে আস্তানা গুটিয়ে মেজর জেনারেল জমশেদের ৯৩ ব্রিগেডকে ঢাকায় চলে আসার নির্দেশ দিলেন। তখন ৯৩ ব্রিগেড বিপর্যস্ত অবস্থায় পলায়নরত। এঁদের অধিকাংশই ঢাকায় ফিরে আসার পথে টাঙ্গাইল ও কালিয়াকৈর এলাকায় কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। মেজর জেনারেল জমশেদ, ব্রিগেডিয়ার বাকের, ব্রিগেডিয়ার কাসিম, ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুর এবং ব্রিগেডিয়ার বশির এই অবস্থার মোকাবেলায় রাজধানী ঢাকায় প্রতিরক্ষার জন্য বারো কোম্পানি সৈন্য, দেড় হাজার ‘ইপকাফ’, আঠারো শ’ পুলিশ এবং কয়েক হাজার রাজাকার ও আল-বদরকে পুনর্গঠিত করলেন। ব্রিগেডিয়ার বাকের ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় খ-যুদ্ধের প্রস্তাব দিলে বলা হলো যে, জনসমর্থন ছাড়া তা সম্ভব নয়। যা হোক টঙ্গী থেকে ডেমরা পর্যন্ত প্রতিরক্ষা সুরক্ষিত করা হলো। এরকম এক নাজুক পরিস্থিতিতে গবর্নর ডাঃ এ এম মালেক যুদ্ধের অবস্থা জানার জন্য সাতই ডিসেম্বর লে. জেনারেল নিয়াজীকে গবর্নর হাউসে (বর্তমানে বঙ্গভবন) ডেকে পাঠালেন। জেনারেল নিয়াজীর চীফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার বাকের সিদ্দিকী প্রতিদিনই গবর্নরকে পাকিস্তানী সৈন্যদের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কথা বলছেন। অথচ জেলা সদর থেকে সরকারী কর্মচারীরা তাঁকে ফোনে জানাচ্ছেন যে, পাকিস্তানী সৈন্যরা একটার পর একটা ঘাঁটি পরিত্যাগ করছে এবং পাকিস্তানী বাহিনী প্রচ-ভাবে মার খাচ্ছে। ঢাকায় গবর্নর হাউসে ৭ ডিসেম্বর বাদ মাগরেব ডাঃ মালেক ও জেনারেল নিয়াজীর বৈঠক শুরু হলো। মিনিট খানেক নিঃশব্দ থাকার পর গবর্নর মালেকই কথাবার্তা শুরু করলেন। একজন অধ্যাপকের মতো তিনি বললেন, ‘ঘটনাপ্রবাহ কখনও একইভাবে প্রবাহিত হয় না। ভালো পরিস্থিতি খারাপের দিকে মোড় নেয়। আবার মন্দ অবস্থা থেকে ভালো অবস্থায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব। একইভাবে একজন জেনারেলের কর্মজীবনেরও উত্থান-পতন হওয়া স্বাভাবিক। কোন সময় সাফল্য তাঁর জীবনকে মহিমান্বিত করে। আবার কখনও পরাজয় তাঁর অতীতের সমস্ত সাফল্যকে ম্লান ও ধূলিসাৎ করে দেয়।’

ডাঃ মালেকের এই কথার পরই জেনারেল নিয়াজীর বিরাট দেহটা বার কয়েক কেঁপে উঠল। আর তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। দুই হাত দিয়ে তিনি মুখ ঢেকে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন। গবর্নর মালেক উঠে এসে জেনারেল নিয়াজীর পিঠে হাত রেখে সান্ত¡না দিয়ে বললেন, ‘জেনারেল সাহেব আমি জানি যে, একজন জেনারেলের জীবনেও কঠিন সময় এসে হাজির হয়। ভেঙ্গে পড়বেন না। আল্লাহ সব সময়েই মহান।’

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গবর্নর ও এককালীন শান্তি নিকেতনের আশ্রমিক সংঘের’ অন্যতম সদস্য ডাঃ আবদুল মোতালেব মালেক এভাবে জানতে পারলেন, রণাঙ্গনের সর্বশেষ বিপর্যস্ত অবস্থা সম্পর্কে। ধীর গম্ভীরভাবে তিনি জেনারেল নিয়াজীকে বললেন, ‘পরিস্থিতি যখন এতোই খারাপ, তখন যুদ্ধ বিরতির ব্যবস্থার জন্য অনুরোধ করে আমার পক্ষে প্রেসিডেন্টকে একটা বার্তা পাঠানো সমীচীন মনে করি।’

লেঃ জেনারেল আমীর আবদুল্লা নিয়াজী কান্না থামিয়ে উদাসভাবে গবর্নরের দিকে মিনিটখানেক তাকিয়ে রইলেন। তারপর মাথাটা নিচু করে বললেন, ‘আমি পালন করবো’। এরপর ন’দিনের ঘটনা আরও চাঞ্চল্যে ভরপুর। ১৬ ডিসেম্বর হলো আত্মসমর্পণ।

১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন রণাঙ্গনের যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিম্নে একটা সংক্ষিপ্তসার উপস্থাপিত করা হলো :

১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর। ঢাকায় পাকিস্তানী সামরিক কর্তৃপক্ষের নিকট অনেক দুঃসংবাদ এসে পৌঁছালো। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বরিশালের দায়িত্বে নিয়োজিত নবম ডিভিশন বিপর্যস্ত অবস্থায় পশ্চাদপসরণ করেছে। নবম ডিভিশনের কমা-ার মেজর জেনারেল আনসারী মধুমতি নদী অতিক্রম করে ফরিদপুরে এসে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে রয়েছে শুধু প্রায় বিধ্বস্ত ৩৮ ফ্রন্টিয়ার এবং ৫০ পাঞ্জাব। নবম ডিভিশনের অধীন খুলনায় অবস্থানকারী ব্রিগেড এবং খুলনা নেভাল বেসের অধিনায়ক কমান্ডার গুল জরীন যশোর পতনের সংবাদে ৬ ডিসেম্বর রাতেই ঢাকার দিকে দ্রুত পশ্চাদপসরণ করেছে। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, দর্শনা, ঝিনাইদহ, যশোর, সাতক্ষীরা, মাগুরা, কালীগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা তখন মুক্ত। সর্বত্র হাজার হাজার মুক্তিবাহিনী ঘুরে বেড়াচ্ছে। উত্তরবঙ্গ সেক্টর

১৬ ডিভিশন দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলার দায়িত্বে নিয়োজিত মেজর জেনারেল নজর শাহের অবস্থা তখন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। হিলি সীমান্ত দিয়ে বালুরঘাট অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে বগুড়া থেকে ব্রিগেডিয়ার তাজাম্মুমের ২০৫ ব্রিগেড ও ৪ ফন্টিয়ার ফোর্স, নওগাঁ থেকে ১৩ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স ও ২৯ ক্যাভেলরীর ট্যাঙ্ক বাহিনী ৩৪ পাঞ্জাবের আর এ্যান্ড এস ব্যাটালিয়ন এবং অসংখ্য রাজাকার ও ইসকাপকে এই অভিযানে পাঠানো হয়েছিল। বালুরঘাট এলাকার একাংশ দখল করে সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি করা এই আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় মিত্রবাহিনী হিলির চিরাই-এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়লাভ করলে এক মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয়।

হিলি এলাকা থেকে পলায়নরত পাকিস্তানী সৈন্যদের মাত্র একাংশ জীবিত অবস্থায় বগুড়ায় ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিল। বাকি অংশ জনসাধারণ ও মুক্তিবাহিনীর হামলায় পথিমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মিত্রবাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়ে পীরগঞ্জের কাছে রংপুর-বগুড়া রোডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলে ১৬ ডিভিশন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। রংপুরে অবস্থানরত জেনারেল নজর তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তেঁতুলিয়া, পঁচাগড়, বোদা, ঠাকুরগাঁ, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সৈয়দপুর, মগুলপাড়া প্রভৃতি এলাকা থেকে পাকিস্তানী সৈন্যরা তখন বিতাড়িত।

সিলেট সেক্টর : ১৪ ডিভিশন

কুমিল্লার উত্তরে শালদা নদী থেকে শুরু করে সমগ্র সিলেট জেলা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা পর্যন্ত এলাকা নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়েছিল। মেজর জেনারেল আবদুল মজিদ কাজীর নেতৃত্বে ১৪ ডিভিশন এই সেক্টরের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। এই ১৪ ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লার অধীনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরববাজারে ২৭ ব্রিগেড, ব্রিগেডিয়ার সলিমুল্লাহর অধীনে সিলেটে ২০২ ব্রিগেড এবং ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার রানার অধীনে মৌলভীবাজারে ৩১৩ ব্রিগেড মোতায়েন করা হয়েছিল।

কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ৭ ডিসেম্বর নাগাদ এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হলো। মুজিব বাহিনীর বিরতিহীন চোরাগোপ্তা হামলা আর মিত্রবাহিনীর আক্রমণে ১৪ ডিভিশন দ্রুত পশ্চাদপসরণ করলো। ২৩ ব্রিগেড আশুগঞ্জে সঠিকভাবে আস্তানা স্থাপন করার পূর্বেই মেজর জেনারেল মজিদ কাজীর নির্দেশে ভৈরব ব্রিজের একাংশ উড়িয়ে দেয়া হলো। ফলে ভারি সমরাস্ত্র আশুগঞ্জে রেখে পরদিন ২৭ ব্রিগেড ভৈরব বাজারে এসে হাজির হলো। যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত এরা আর কোন সংঘর্ষে অংশ নেয়নি। অথচ এদের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী ঢাকার দিকে এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে যথাক্রমে ২০২ এবং ৩১৩ ব্রিগেডের একেবারে ছিন্নভিন্ন অবস্থা। আখাউড়া দুলাই, কলোরা জুরি, লাতু, আটগ্রাম, জয়ন্তিয়াপুর, রাধানগর, ফেঞ্চুগঞ্জ, ছাতক, চারঘাট, শ্রীমঙ্গল, শমসেরনগর, মৌলভীবাজার, শেরপুর, সাদিপুর প্রভৃতি স্থান থেকে পাকিস্তানী বাহিনী পশ্চাদপসরণ করছে। এ সময় হতাহতের সংখ্যা কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। সিলেট শহর এবং রানওয়ে ছাড়া বিস্তীর্ণ এলাকা তখন মুক্তিবাহিনীর দখলে।

চাঁদপুর সেক্টর : ৩৯ ডিভিশন

কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দখলদার বাহিনীর চাঁদপুর সেক্টর গঠন করা হয়েছিল। এর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল ইয়াহিয়া সরকারের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ কমান্ডার ও উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল রহিম খান। ঢাকার প্রতিরক্ষার প্রতি লক্ষ্য রেখে ৩৯ ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয়েছিল চাঁদপুরের উপকণ্ঠে। এর অধীনে ছিল ৪৩ ব্রিগেড।

কুমিল্লার ব্রিগেডিয়ার আতিফের ১১৭ ব্রিগেড এবং চট্টগ্রামে ব্রিগেডিয়ার আতাউল্লার ৯৭ ব্রিগেড। এছাড়া কাপ্তাই-এ দুই নম্বর কমান্ডো ব্যাটালিয়ন, চট্টগ্রামে ২৪ ফ্রন্টিয়ার এবং ২১ আজাদ কাশ্মীর এই ডিভিশনের অধীনে নিয়োজিত ছিল।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লালমাইয়ের পাহাড় অঞ্চল এবং চৌদ্দগ্রামে ২৫ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স ও ২৩ পাঞ্জাব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। মুদাফফরগঞ্জ-চাঁদপুর রোডের যোগাযোগ মুক্তিবাহিনীর হামলায় বিচ্ছিন্ন হওয়ায় চাঁদপুরের ২৯ ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে এক বিপর্যস্ত অবস্থা। ফেনী-বিলোনিয়া অঞ্চল থেকে ব্রিগেডিয়ার আসলাম নিয়াজী পশ্চাদপসরণ করে লাকসাম চলে এসেছে। কিন্তু লাকসাম থেকে ডিভিশন হেডকোয়ার্টার চাঁদপুরে আর যোগাযোগ সম্ভব হলো না। শেষ পর্যন্ত লাকসামে ভারি সমরাস্ত্র রেখে এবং গোলাবারুদ বিনষ্ট করে ব্রিগেডিয়ার নিয়াজী তাঁর সৈন্যদের দুটি দলে কুমিল্লা রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দিলেন। একটি দলের ২৭ পাঞ্জাব ও ২১ আজাদ কাশ্মীর মুদাফফরগঞ্জের কাছে আত্মসমর্পণ করল আর মুক্তিবাহিনীর হামলায় ১৫ বালুচ ও ২৩ পাঞ্জাব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এদিকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সুরক্ষিত এলাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার আতিক চাঁদপুর থেকে ডিভিশন হেডকোয়ার্টারকে উদ্ধারের জন্য কোন অপারেশনের ঝুঁকি নিতে সাহসী হলো না। মেজর জেনারেল রহিম খান বিশাল মেঘনা নদীর পাড়ে আটকে পড়ে রইলেন। কক্সবাজার, রামু, চকোরিয়া, রাঙ্গামাটি, রামগড়, ফেনী, বিলোনিয়া, মাইজদী এমন কি দাউদকান্দি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ।

ঢাকা সেক্টর : ৩৬ ডিভিশন

ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও জামালপুর এলাকা নিয়ে এই ঢাকা সেক্টরকে গঠন করে হয়। এর দায়িত্বে ছিলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিলিটারি ক্রস বিজয়ী মেজর জেনারেল জমশেদ। ইনি ময়মনসিংহে তাঁর ৩৬ ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার স্থাপন করেছিলেন। পাকিস্তান সৈন্য বাহিনীর সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ৯৩ ব্রিগেডকে এই ডিভিশনের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছিল। এই ব্রিগেডের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার কাদির। তিনি ৩৩ পাঞ্জাব ইনফ্যানট্রিকে পূর্ব দিকে এবং ৩১ বালুচকে উত্তর-পশ্চিম দিকে মোতায়েন করে ময়মনসিংহে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে আস্তানা করে লড়াই শুরু করলেন। এই সেক্টরের স্ট্র্যাটেজি ছিল প্রথমে সীমান্তে বকশীগঞ্জ কামালপুর নকশি এবং বারমারী পোস্টগুলোকে দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে তৈরি করে মরণপণ লড়াই করা। এরপর জামালপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে দ্বিতীয় লাইন অব ডিফেন্স তৈরি করা এবং সর্বশেষ পর্যায়ে রাজধানী ঢাকা নগরীর প্রতিরক্ষার জন্য লড়াই করা।

মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে এই অঞ্চলে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী লড়াই বকশীগঞ্জ-কামালপুর অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়। ৩৩ পাঞ্জাব এখানে পাঁচটি কামান বসিয়ে সুরক্ষিত ঘাঁটি বানিয়েছিল। ২২ অক্টোবর মুক্তিবাহিনীর প্রচ- হামলায় কামালপুর সীমান্ত ঘাঁটি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে নিকটবর্তী নকশি, বারমারী ও বকশীগঞ্জ ঘাঁটি থেকে পাকিস্তান বাহিনী দ্রুত পশ্চাদপসরণ করে শেরপুর-জামালপুরে আস্তানা স্থাপনে সচেষ্ট হয়। অবশ্য ২৩ নবেম্বর পর্যন্ত কামালপুরের ঘাঁটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একদল পাকিস্তানী সৈন্য লড়াই অব্যাহত রেখেছিল। এদের উদ্ধারের কয়েক দফা প্রচেষ্টা মুক্তিবাহিনীর প্রচ- পাল্টা হামলায় ব্যর্থ হয় এবং এসব সৈন্যের আর কোন খবর পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এদিকে মিত্রবাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী জামালপুর-ময়মনসিংহের ডিফেন্স লাইনের ওপর অবিলম্বে প্রচ- চাপের সৃষ্টি করে পাশাপাশি টাঙ্গাইল এলাকায় কাদেরিয়া বাহিনীর তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলে পাকিস্তানী বাহিনীর মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ডিভিশন কমান্ডার মেজর জেনারেল জমসেদ ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আস্তানা স্থানান্তরিত করলে সাতই ডিসেম্বরে ব্রিগেডিয়ার কাদির শেরপুর-ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পথিমধ্যে ৯৩ ব্রিগেড প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং ব্রিগেডিয়ার কাদের বন্দী হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই পথ দিয়েই মিত্র বাহিনী মিরপুর ব্রিজ অতিক্রম করে সর্বপ্রথম রাজধানী ঢাকা নগরীতে প্রবেশ করেছিল।

সহায়ক পুস্তকাবলী : ১ বাংলাদেশ ডকুমেন্টস (১ম খ-) ২ বাংলাদেশ ডকুমেন্টস (২য় খ-) ৩ উটনেস টু সারেন্ডার; সিদ্দিক সালিক।