১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কালরাত স্মরণে রাজধানীতে নানা অনুষ্ঠানমালা


কালরাত স্মরণে রাজধানীতে নানা অনুষ্ঠানমালা

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ মশাল প্রজ্বলন, আলোর মিছিল, বিভীষিকাময় সেই কালরাতের স্মৃতিচারণ আর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে শুক্রবার ঢাকাসহ সারাদেশে পালিত হয়েছে ২৫ মার্চ ভয়াল কালরাত স্মরণে নানা অনুষ্ঠানমালা। রাতে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও নতুন প্রজন্মের হাতের মশাল আর হাজারও প্রজ্বলিত মোম থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোতে আলোকিত হয়ে উঠেছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। আলোর মিছিল করে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মানিক মিয়া এ্যাভিনিউ ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনের সামনেও কৃতজ্ঞ বাঙালী আলোর মিছিলের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বীর শহীদদের, ঘৃণা-ধিক্কার জানিয়েছে পাকি হন্তারকদের। কালরাতের স্মরণে প্রতিটি অনুষ্ঠানেই এবার সোচ্চার দাবি ওঠে ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার। প্রতিটি অনুষ্ঠানেই সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে যে কোন মূল্যে রুখে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

২৫ মার্চ কালরাত স্মরণে জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে দেশে এই প্রথম অভিনব আয়োজন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। সন্ধ্যা সাতটা। ২৫ মার্চ কালরাত স্মরণে জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে শুক্রবার রাতে প্রদর্শিত হয় ‘আলো-আঁধারির খেলা’। সেই খেলায় সংসদের দেয়ালে ভেসে ওঠে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি, একে একে ভেসে ওঠে আরও অনেকের মুখ, দেশের জন্য যারা দিয়ে গেছেন প্রাণ ভেসে ওঠে তাদের, আরও অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্বের। আলোর প্রক্ষেপণে থ্রিডি ভিডিও ম্যাপিংয়ে ভেসে ওঠে লাখো শহীদের রক্তস্নাত লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বজ্রনির্ঘোষ ভাষণ, আরও কত কিছু। ‘সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ সেøাগানে বাংলাদেশকেই তুলে ধরা হয় ‘শোকেস বাংলাদেশ’ শিরোনামে।

আলো-আঁধারির খেলা আর নামীদামী সঙ্গীত শিল্পীদের কণ্ঠে স্বাধীনতার গান শুনতে পুরো মানিক মিয়া এ্যাভিনিউতেই নেমেছিল লাখো মানুষের ঢল। দেশের বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও খ্যাতনামা শিল্পী রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, আবদুল হাদীর মতো প্রায় অর্ধশতাধিক সঙ্গীত শিল্পীর গানে গানে মুখরিত হয়ে ওঠে সংসদ ভবন চত্বর। স্বাধীনতা অর্জন আর তার জন্য লাখো প্রাণের বিসর্জনকে সাধারণ মানুষের কাছে ঐতিহ্যম-িত করতেই এই অভিনব আয়োজনটি করা হয়।

২৫ মার্চ স্মরণে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। অনুষ্ঠানা আসা মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তরের রণাঙ্গনের সেক্টর কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রাজনীতিক, শহীদ পরিবারের সদস্য ও নতুন প্রজন্মের প্রতিটি সদস্যদের মুখে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী ও প্রগতিবিরোধী অপশক্তির বিষদাঁত ভেঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের আলো সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার অঙ্গীকার।

ভয়াল কালরাত স্মরণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুক্রবার স্বাধীনতা ও গণহত্যার ৪৫তম বার্ষিকীতে ৪৫টি মশাল প্রজ্বলন করা হয়। কণ্ঠশিল্পী জান্নাতুল ফেরদৌসীর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে এ সময় সবার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ ‘মুক্তির মন্দিরে সোপান তলে’ গান দুটি। দৃপ্ত উচ্চারণে গানের পরিবেশনা শেষে বের হয় আলোর মিছিল, এতে নেতৃত্ব দেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়করা। আলোর মিছিলের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের স্মরণে এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক কামাল লোহানীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভার শুরুতেই সূচনা বক্তব্য রাখেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী এ কে এম মোজাম্মেল হক, বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, ন্যাপ নেতা পার্থ সারথী চক্রবর্তী, সমাজতান্ত্রিক দলের ড. শাহাদাত হোসেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তাহমিনা খানসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এ সময় বক্তব্য রাখেন। আলোচনা সভায় নেতারা ‘২৫ মার্চ হোক আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’-এর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আশ্বাস ব্যক্ত করেন। সূচনা বক্তব্যে শাহরিয়ার কবির সরকারীভাবে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান। তিনি বলেন, ২৫ মার্চকে সরকারীভাবে গণহত্যার স্বীকৃতি দিতে হবে। আগামী ৩১ মার্চ সুইডেনে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে, সেখানেও মূল দাবি গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বাংলাদেশে সরকারীভাবে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দিতে হবে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আমি মশালটা হাতে নিয়ে এসেছি, আলো হাতে অন্ধকার দূর করতে এসেছি। কোন বক্তৃতা দিতে নয়। আলো জ্বালিয়ে অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছি। অন্ধকারের শত্রুদের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী তাদের এখানে থাকার কোন অধিকার নেই। যারা পাকিস্তানপ্রেমী তাদের বাংলাদেশে থাকার কোন সুযোগ নেই।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসিরকাষ্ঠেও ঝুলতে হচ্ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের সংখ্যা বিতর্কিত করতে চায় তাদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা বিষয়কমন্ত্রী এ কে এম মোজাম্মেল হক বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের বাতাসে আজ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বিরাজ করছে। এই বিষবাষ্প প্রতিরোধে জামায়াত নিষিদ্ধের কোন বিকল্প নেই। সংসদের আগামী সেশনে জামায়াত নিষিদ্ধ ও তাদের সম্পদ বাজেয়াফত করা হবে। ইতিহাসের বিপক্ষে যারা কথা বলছে তাদের বিষদাঁত উপড়ে ফেলা হবে।

বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, পাকিস্তানীদের সঙ্গেও ১৯৫ পাকিসেনার বিচারের বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু তারা চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি। দেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে সঙ্গে ১৯৫ পাকিসেনারও বিচার করতে হবে। ২৫ মার্চকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্বীকৃতি দিতে হবে।

আলোচনা শেষে স্বাধীনতার ৪৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে ৪৫ বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা মশাল জ্বালিয়ে আলোর মিছিলের সূচনা করেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে আলো হাতে মিছিল নিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ ঢাকা জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে গিয়ে ওই ভয়াল কালরাতে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। শুধু এই অনুষ্ঠানই নয়, বিভিন্ন সংগঠন কালরাত স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে যে কোন মূল্যে রুখে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

প্রতিবছরের মতো এবারেও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১ বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানী গণহত্যা শুরুর ভয়াল রাত ও কালরাত শেষে স্বাধীনতার পথে আলোকযাত্রার মুহূর্তকে স্মরণ করে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। শুক্রবার রাত এগারোটায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘শিখা চিরন্তন’ সংলগ্ন বেদিতে মোমবাতি প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানমালার শুরু হয়। দেশাত্মবোধক নাচ, গান ও কবিতা আবৃত্তির ঘণ্টাব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে প্রথম প্রহর অর্থাৎ রাত বারোটায় এক মিনিটের নীরবতা ও নিষ্প্রদীপ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। রাত এগারোটা ৫৮ মিনিট থেকে বারোটা পর্যন্ত সব ধরনের আলো নিভিয়ে দুই মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়। এর পর বারোটা ১ মিনিটে স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে নতুন প্রজন্মের হাতে মশাল ও জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করেন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাগণ। এবারই প্রথম অনুষ্ঠানে সর্বপ্রথম কয়েক নারী মুক্তিযোদ্ধা নতুন প্রজন্মের হাতে জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করেন। এর মাধ্যমে জাতির জীবনে অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরার প্রতীকী চিত্রও তুলে ধরা হয়। এর পর সমবেত জনতা সাম্প্রদায়িকতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেন। শপথবাক্য পাঠ করান সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান লে. কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী। এ সময় সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত সর্বাত্মক সংগ্রাম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে ফোরামের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল কেএম সফিউল্লাহ, ভাইস চেয়ারম্যান লে. কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী ও লেখক সাংবাদিক হারুন হাবীব বক্তব্য রাখেন। এ সময় সংগঠনের ফোরামের নেতারাও ২৫ মার্চ ভয়াল কালরাতের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করেন। তারা সরকারীভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে গণহত্যা দিবস পালনের দাবি জানিয়েছেন। স্বাধীনতার এত বছর পরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শেষ হয়নি উল্লেখ করে দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্নের দাবি করেন তারা। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে ফোরাম আয়োজিত অনুষ্ঠানের সমাপ্ত হয়।

কালরাত স্মরণে শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ সময় গণহত্যায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের স্মৃতিসৌধে প্রদীপ প্রজ্বলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রজ্বলিত মোমবাতি নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা জগন্নাথ হল স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে বিকেলে কালরাতের শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যাতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার মোঃ ফজলে রাব্বী মিয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার ও সমাজসেবক এরোমা দত্ত। সভাপতিত্ব করেন শিশু একাডেমির পরিচালক মোশাররফ হোসেন। একইভাবে ঢাকাসহ সারাদেশেই ২৫ মার্চ ভয়াল কালরাত বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে স্মরণ করা হয়।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: