১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এখনও সক্রিয়


স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এখনও সক্রিয়

কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এখনও সক্রিয় রয়েছে। এ অপশক্তি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতে চায়। তাই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। শুক্রবার জাতীয় জাদুঘরে ‘স্বাধীনতা উৎসব’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অপরদিকে অতীতের মতো বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছে রাশিয়া, ভারত, নেপাল, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশ।

৪৫তম স্বাধীনতা উৎসব উদ্যাপন জাতীয় কমিটি জাতীয় জাদুঘরে দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, রুশ ফেডারেশনের চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স ড. আনাতোলি ওয়াই ডেভিডকো, নেপালী দূতাবাসের প্রতিনিধি সুশীল কে লাংশান, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আব্দুল আহাদ চৌধুরী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ফকির আলমগীর, সাবেক সচিব আজিজুর রহমান আজিজ, মুক্তিযুদ্ধ একাডেমির উপদেষ্টা ড. শরীফ আশরাফুজ্জামান, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য এম শাহীনুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ একাডেমির চেয়ারম্যান ড. আবুল আজাদ, একাডেমির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সিদ্দিকী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও বিভিন্ন পর্বে বক্তব্য রাখেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম ৪৫টি দেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও ৪২টি দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। এ সময় বিভিন্ন দেশের হাইকমিশনার, রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, মুক্তিযুদ্ধ অনেকেই করে, বিভিন্নভাবে করে। কিন্তু যে সৌভাগ্যটা হয়েছে সেটা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের পরেÑ যে স্বপ্ন দেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করলাম, সেই স্বপ্নটাকে অর্জন করতে অবদান রাখা। আমি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি, এই ৮৩ বছর বয়সেও আমি দেশসেবায় নিযুক্ত আছি। যদিও অবসর গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এটা একটা আনন্দ। দেশসেবা একটা মহা আনন্দের বিষয়। সেই আনন্দের জোরে আমি এখনও সক্ষমভাবে চলতে পারছি। আমার এর চেয়ে বড় পাওয়া হতে পারে না।

তিনি ২৫ মার্চের দিনটিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আজকের দিনটা আমাদের জন্মদিন। দুপুর রাতে আমাদের জন্ম হয়েছে। এই দিনে অনেক কথাই মনে আসে। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি গণতন্ত্রের জন্য শোষণের বিরুদ্ধে। আমরা চেয়েছি আমাদের জীবন যাতে নিজেদের ইচ্ছামতো গড়ে তুলতে পারি। তাতে যখন বাধা এলো, তখনই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা পাওয়ার কথাও অর্থমন্ত্রী স্মরণ করেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের এক কোটি মানুষ সেখানে আশ্রয় পেয়েছে। ভারত আমাদের প্রস্তুতিতে যে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল তার ব্যবস্থা করেছে। অস্ত্রশস্ত্রও সরবরাহ করেছে। সেখানে ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে আমাদের সহায়তা দেন। একাত্তরে মুক্তিকামী বাঙালীর পক্ষে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা স্মরণ করে মুহিত বলেন, তিনি (ইন্দিরা) বলেছেন, এতবড় গণহত্যা হচ্ছে, সেজন্য তোমরা কিছু করো। অক্টোবরে ১১টি দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তখন সাহায্য যখন আসেনিÑ তিনি বললেন, ‘আমার আর কোন উপায় নেই। এই আগ্রাসনকে আমাকে মিট করতেই হবে।’ তারপর শুরু হয় ৩ ডিসেম্বরের যুদ্ধ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (রাশিয়া) সমর্থন না থাকলে ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে এতাদূর অগ্রসর হওয়া সহজ ছিল না বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা মুহিত। তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধে যখন জিতে গেছি, তখন প্রায় হারতে বসেছিলাম; তখন রাশিয়ার উপর্যুপরি তিনটি ভেটো আমাদের রক্ষা করেছে। আমাদের প্রতিবেশী ভারত ছাড়াও মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তখন স্বীকৃতি পাওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। বিশ শতকে এরকম জন্ম আর কোন দেশের হয়নি মন্তব্য করে সুইডেন ও নরওয়ের আলাদা হওয়ার দৃষ্টান্ত টানেন মুহিত। তিনি বলেন, সে সময় সুইডেন ও নরওয়ে সমঝোতা করে স্বাধীন হয়েছিল। একমাত্র বিভক্তি যেখানে যুক্ত হয়েছে, সেটি হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যুদ্ধ করে। সেটাও অদ্ভুত যুদ্ধ, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠরা যুদ্ধ করে ক্ষমতাশালী সংখ্যালঘিষ্টদের বিরুদ্ধে। সেটা করে আমরা আমাদের স্বাধীনতা হাসিল করি। আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময়টি হচ্ছে ১৯৭১ সাল। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে মুহিত বলেন, আমাদেরও দুঃখ গেছে। যেমন অন্য দেশের হয়। যেখানেই কোন বিপ্লব হয়, সেখানে প্রতিবিপ্লব স্বাভাবিক। ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে এতবড় বিপ্লব হয়েছে, চিন্তার জগতে বিরাট বিপ্লব, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিপ্লব। কিন্তু সেই বিপ্লব টিকে নাই। সেই বিপ্লব প্রতিবিপ্লবের কাছে হার মানে। সেই প্রতিবিপ্লব জয়ী থাকে ১৭৯১ সাল থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত। আরেকটি দেশের কথা আমরা চিন্তা করতে পারি, সেটা বাংলাদেশ। আমাদের দেশে ১৯৭৫ সালে প্রতিবিপ্লব হয়। সেই প্রতিবিপ্লবের দিন মাত্র ১৬ বছর ছিল। ১৯৯১ সালে আমরা সেই প্রতিবিপ্লব থেকে মুক্তি পাই। ’৯১ সালের পর থেকেই আমার মনে হয়, আমাদের জাতির জীবনে পরিবর্তনের সূচনা হয়।

অনুষ্ঠানে বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরেও এখনও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি সক্রিয় রয়েছে। এ অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। প্রতিটি বাঙালী যেদিন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ববোধ করবেন, প্রতিটি বাঙালীর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। অনুষ্ঠানে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। সেই বন্ধুত্ব দিনে দিনে আরও গভীর ও বিস্তৃত হচ্ছে। দুই দেশ এখন শক্তিশালী বন্ধুত্বের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভবিষ্যতেও এ বন্ধুত্ব অটুট থাকবে বলে জানান ভারতীয় হাইকমিশনার। ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানান তিনি।

ঢাকায় নিযুক্ত রুশ ফেডারেশনের চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স ড. আনাতোলি ওয়াই ডেভিডকো বলেন, বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। সে কারণেই ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন। উন্নয়ন, শান্তি ও স্থিতিশীলতায় রাশিয়া সব সময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে ‘বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ-রুশ মৈত্রী সম্পর্ক ও সহযোগিতা’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের ডকুমেন্টারি ‘মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র কাব্য’ ও যুদ্ধশিশুদের নিয়ে নির্মিত বিশেষ টেলিফিল্ম ‘চন্দ্রমুখী’র প্রিমিয়াম শো উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।