১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

‘ঢাকা আজ এক বিধ্বস্ত আর ভয়ার্ত শহর’


‘ঢাকা আজ এক বিধ্বস্ত আর ভয়ার্ত শহর’

বাংলানিউজ ॥ ঢাকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমান রূপসী বাংলা হোটেল) আস্তানা গাড়া বিদেশী সাংবাদিকদের হঠাৎ করেই বাইরে বের হতে নিষেধ করা হলো। কড়া প্রহরা বসানো হলো হোটেল এলাকায়, যেন কেউ ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে।

তখনই সাংবাদিকরা আঁচ করেছিলেন খারাপ কিছুর। কিছু একটা নিশ্চয় ঘটতে চলেছে।

নেমে এলো রাত। ২৫ মার্চের রাত। এগারোটা বাজতেই ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবরুদ্ধ সেই সাংবাদিকরা নিজ নিজ রুমের জানালা দিয়ে দেখলেন, ঘড়ঘড় আওয়াজে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে জলপাই রংয়ের ট্যাঙ্ক। সাঁজোয়া যানে চেপে রাজধানী জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

তবে তখনও কেউ কল্পনা করতে পারেননি এর তাৎপর্য। এই এক রাতেই যে ঢাকায় ঝরে যাবে সাত হাজারেরও বেশি প্রাণ। আগুনে পুড়ে ছাই হবে অসংখ্য বাড়িঘর। গ্রেফতার হবেন মুক্তিকামী জনতার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তা ছিল ওই সাংবাদিকদের কল্পনারও বাইরে।

তবে সাংবাদিকদের মধ্যে একজন একটু সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। হয়ত ছিলেন একটু বেশি সাহসীও। যুক্তরাজ্যের ডেইলি টেলিগ্রাফের সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। ছাদে উঠে পেছন দিকের দেয়াল টপকে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। আর তাই ২৬ মার্চ সকালে বিদেশী সাংবাদিক হিসেবে তিনিই প্রথম সাক্ষী হলেন পাকিস্তান বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পরবর্তী দৃশ্যের।

পাকিস্তান বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের ঘটনা নিয়ে ডেইলি টেলিগ্রাফ ৩০ মার্চ প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনামে সায়মন ড্রিংয়ের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনের প্রথম প্যারায় তিনি লেখেন, ‘ঢাকা আজ এক বিধ্বস্ত আর ভয়ার্ত শহরের নাম। ঠাণ্ডা মাথায় পাকিস্তান বাহিনীর ২৪ ঘণ্টার নির্মম গোলাবর্ষণে পূর্ব পাকিস্তানে সাত হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ গেছে, বিশাল এলাকা এখন বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে আর স্বাধীনতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের লড়াইয়ের নির্মম পরিণতি ঘটেছে।’

বিশ্ববাসী এরই মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে কি ঘটছে, তার আলামত পেয়ে গেলেও এই প্রতিবেদনেই প্রথম তারা জানতে পারে, ‘সৃষ্টিকর্তা ও যুক্ত-পাকিস্তান’র নামে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কী নিষ্ঠুরতার পথেই না হেঁটেছে সেদিন।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে ৮ পাকিস্তানী সাংবাদিককে দেশটির বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসে। উদ্দেশ্য ছিল, এখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, তার কয়েকটি সরেজমিন প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে ছেপে বিশ্বকে বিভ্রান্ত করা। এই সাংবাদিকদের একজন ছিলেন পাকিস্তানী সংবাদপত্র মর্নিং নিউজের সহকারী সম্পাদক এ্যান্থনি মাসকারেনহাস। ১৯৭১ সালের ১৮ মে তিনি লন্ডন চলে যান। সেখানে তিনি সানডে টাইমস পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ করে পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটেছে, তার সত্যরূপ তুলে ধরার প্রস্তাব করেন। পত্রিকা কর্তৃপক্ষও এতে রাজি হয়ে যায়। এরপর তিনি পাকিস্তান ফিরে যান। সেখান থেকে ১৩ জুন পরিবারসহ নিরাপদে আবারও লন্ডনে পৌঁছলে সানডে টাইমস তার প্রতিবেদন ছাপতে শুরু করে। প্রথম প্রতিবেদনটি যায় ‘গণহত্যা’ শিরোনামে। এ প্রতিবেদনটি সানডে টাইমস তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশ করে। এতে প্রথম প্যারায় মাসকারেনহাস লেখেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের সেনারা মার্চের শেষ দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সরকার মার্চের শেষ সময় থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সংবাদ সংগ্রহের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, এটাই তার পেছনের বাস্তবতা। আর পূর্ব পাকিস্তান থেকে পঞ্চাশ লাখ শরণার্থী কলেরা আর ডায়রিয়ার ঝুঁকি নিয়ে কেন ভারতে আশ্রয় নিল তারও কারণ এটি।

সায়মন ড্রিং বা এ্যান্টনি মাসকারেনহাসের প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্ব প্রথম পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিস্তারিত জানতে পারলেও ২৫ মার্চ কালরাত্রির ঘটনার খবর ২৭ মার্চই তাদের কাছে পৌঁছে যায়। বিশ্বখ্যাত বেশ কিছু পত্রিকা ২৭ মার্চ থেকে প্রতিদিনই পূর্ব-পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে।

এর মধ্যে ডেইলি টেলিগ্রাফ ছিল এগিয়ে। ২৭ মার্চ পত্রিকাটিতে ২৫ ও ২৬ মার্চের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দু’টি সংবাদ ও একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়।

২৯ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে ডেইলি টেলিগ্রাফ একটি সম্পাদকীয় ও চারটি সংবাদ, নিউইয়র্ক টাইমস একটি, দ্য এজ চারটি এবং দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড সম্পাদকীয় ছাপে।

এসব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও তাদের সাংবাদিকদের কল্যাণেই ১৯৭১ সাল জুড়ে বিশ্ববাসী জানতে পারে, পূর্ব-পাকিস্তানে কী ঘটছে, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নির্মম সিদ্ধান্তে এখানে কীভাবে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হচ্ছে। মোট কথা পাকিস্তানীদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কথা অজানা ছিল না আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের। ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতের কাহিনী পুরো বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পত্রিকা।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: