২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সাতক্ষীরায় শতাধিক সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা


স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা ॥ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আমাদের মা। আপনার নৌকায় ভোট দেয়ার অপরাধে ওরা আমাদের বাড়িছাড়া ও গ্রামছাড়া করেছে। জীবনের ভয়ে ছেলেরা বাড়ি থাকতে পারছে না। বাড়িতে থাকতে ভয় পাচ্ছে ষোড়শী যুবতী মেয়ে ও গৃহবধূরা। দখল করে নিয়েছে চিংড়ি ঘের। লুট করেছে মাছ। রাতের বেলায় হঠাৎ করে ঘরের দরজায় ধাক্কা দেয়া হচ্ছে। প্রকাশ্যে মেয়েদের ধর্ষণের হুমকি দেয়া হচ্ছে। এখানে থাকলে ছেলেরা হত্যা হবে আর মেয়েরা হারাবে ইজ্জত। এখন আমরা কি করব? আপনি আমাদের বাঁচান। ইউপি নির্বাচন-পরবর্তী বিজয়ী বিদ্রোহী প্রার্থী ও উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতার সন্ত্রাসী বাহিনীর তা-বে গ্রামছাড়া আশাশুনি উপজেলার ৪টি গ্রামের শতাধিক সংখ্যালঘু পরিবার। এ সকল পরিবারের নারী-পুরুষ শিশু সদস্যরা শুক্রবার সকালে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে জীবনের নিরাপত্তাসহ মিলন ও মোস্তাকিম বাহিনীর সন্ত্রাস বন্ধের দাবি জানিয়ে লিখিত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এই সন্ত্রাসে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি এই সন্ত্রাসের তিল পরিমাণ সত্যতা নেই দাবি করে আশাশুনি উপজেলা চেয়ারম্যান এবিএম মোস্তাকিম শুক্রবার বিকেল সোয়া ৪টায় জনকণ্ঠকে বলেন, যারা রামদা ধরছে তারাই আবার এই অভিযোগ করছে। সন্ত্রাসের অভিযোগ অস্বীকার করে আশাশুনি থানার ওসি মুন্সি আসাদুজ্জামান বলেন, গ্রামবাসীর অভিযোগের কোন সত্যতা নেই।

তবে গ্রামবাসীর এই অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আশাশুনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম পিন্টু। তার স্বাক্ষরিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি আশাশুনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মোস্তাকিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, বলাবাড়িয়া, ঠাকুরাবাদ, হাসখালি ও গাইয়াখালি গ্রামের সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাস চলছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মোস্তাকিমের নির্দেশে। একইভাবে মিলনের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ার অভিযোগে মঙ্গলবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নাকতাড়া গ্রামের ২০টিরও বেশি হিন্দু বাড়িতে মারপিট, ভাংচুর ও লুটপাট করেছে। উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুগত ৬নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঙ্গল চন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে সন্ত্রাসে জড়িত আছেন বলাবাড়িয়া গ্রামের সমরেশ সানা, রবীন্দ্র নাথ সানা, কার্তিক সরদার, মনিরুল, আছাদুল, সুকৃতি সানা, প্রিয়ব্রত সানা, বিশ্বজিত সানা, সঞ্জয় ম-ল, তারক চন্দ্র ম-ল, সঞ্জিত সানা, স্বপন সানা, নিমাই ম-ল। হাঁসখালি গ্রামের রমেশ বৈরাগী, ঠাকুর বৈরাগী, দৈব্য ম-ল, সমীরন বাইন, আনন্দ বাইন, নির্মল বাইন। ঠাকুরাবাদ গ্রামের অনুপম সরকার, জগদীশ সরকার, পরিমল সানা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম পিন্টু নির্বাচনে নৌকা প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নেয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিকে দল থেকে বহিষ্কারের জন্য দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

নির্যাতিত এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম পিন্টু। অপরদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাকিমের প্রার্থী হিসেবে চশমা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন স.ম সেলিম রেজা মিলন। নির্বাচনে আশাশুনির বলাবাড়িয়া, গাইয়াখালী, হাঁসখালী ও ঠাকুরাবাদ গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ার কারণে ক্ষিপ্ত হন উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিদ্রোহী প্রার্থী মিলন। নৌকা প্রতীক প্রার্থী পরাজিত হলে ভোটের পরদিন থেকে ওই এলাকার হিন্দু পরিবারগুলোর ওপর বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি প্রদান করতে থাকে মিলন ও মোস্তাকিম বাহিনী।

ঠাকুরাবাদ গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বুধবার রাতে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঙ্গল চন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে অর্জুন সানার ছেলে সমরেশ সানা, জনার্দন সানার ছেলে রবীন্দ্র সানাসহ ২০-২৫ ইউনিয়নের ঠাকুরাবাদ, গায়াখালী, বলাবাড়িয়া, হাঁসখালী গ্রামে রামদাসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে। এসব গ্রামের মানুষগুলো প্রায় বাড়ি ছাড়া।

অপরদিকে একই অভিযোগ বলাবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দাদের। জীবনের ভয়ে ইতোমধ্যে ডাঃ সুশীল চন্দ্র ম-ল ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। বলাবাড়িয়া গ্রামের ঊষা রাণী (৬০), ঋতিশ (৫৫), বল্লব চন্দ্র সরকার (৮০) জানান, রাতের বেলায় রামদা মহড়ায় আমরা সংকিত। তারা যে কোন মুহূর্তে আমাদের ওপর হামলা করতে পারে। আশাশুনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হামলার শিকার গাইয়াখালি গ্রামের গৌরপদ ম-ল (৪০) এর পরিবারের সদস্যরা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা সময় তাকে বেধড়ক পিটিয়ে পরে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়।

শুক্রবার মানববন্ধনে অংশ নেয়া গ্রাম থেকে আসা সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা তাদের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিতে যেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বলাবাড়িয়া গ্রামের হরিদাসি (৬০), ময়নারানি সরকার (৫০), পিন্টুলাল ম-ল (৪০)সহ অনেকই। এরা পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে আতঙ্কিত। সকলে জীবনের নিরাপত্তা ও সহায় সম্বল রক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

মোরেলগঞ্জে ও মোল্লাহাটে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা

স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট থেকে জানান, মোরেলগঞ্জ ও মোল্লাহাটে ইউপি নির্বাচনের জের ধরে সংখ্যালঘুদের মারপিট, বাড়িতে হামলা, লুট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মোরেলগঞ্জের বনগ্রাম ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের সংখ্যালঘু অরুণ সেন, পরিতোষ সেন, শুভঙ্কর সেন ও পুলিন বিহারী সেনের বাড়িতে হামলা, ভাংচুর, লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতাকর্মীকে শুক্রবার আটক করেছে। আটককৃতরা হলো, বনগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুস সত্তার শেখ (৬৫), তার ছেলে নবনির্বাচিত মেম্বার মোঃ বেল্লাল শেখ (৩৫), ছোট ভাই আবুয়াল হোসেন শেখ (৪৫), প্রতিবেশী আজিজুল শেখ (২৫) ও হাফিজুল শেখ (২২)। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, নির্বাচনে জয়ী হওয়ার দু’দিন পরে বেল্লাল শেখ শতাধিক লোক নিয়ে রাতে অরুণ, পরিতোষ, শুভঙ্কর ও পুলিন সেনের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ওই বাড়িগুলো থেকে নগদ টাকা, মোবাইলসেট ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায় ।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারক বিশ্বাস জানান, মোহনপুর গ্রামে নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের জের ধরে কয়েকটি বাড়িতে হামলা ও একটি গোয়ালঘরে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে পাওয়া গেছে। এই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তবে আটক আ’লীগ নেতা সত্তার শেখ বলেন, একটি সাজানো ঘটনা আমলে নিয়ে পুলিশ তাদের হয়রানিমূলক আটক করেছে।

অপরদিকে, মোল্লাহাটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত গাওলা ইউপি চেয়ারম্যান রেজাউল কবির ও তার সমর্থকরা পল্লী বিদ্যুত সমিতির এলাকা পরিচালক বিশিষ্ট সমাজসেবক ডাঃ মনোরঞ্জন হালদারকে মারপিট করেছে। বাবুল বিশ্বাস নামে স্থানীয় এক ব্যক্তিকে বেপরোয়া মারপিটের সময় তার আর্তচিৎকারে এগিয়ে গেলে ডাঃ মনোরঞ্জন হালদারকেও মারপিট করা হয়। এ ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গাওলা ইউপি আ’লীগ সভাপতি নজরুল ইসলাম ওরফে সুখ ফকির ও সাধারণ সম্পাদক মনোজ পালসহ স্থানীয়রা জানান, তৃণমূলে প্রার্থী বাছাই কালে বিরোধিতার ক্ষোভে এ নির্য়াতন করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন, চেয়ারম্যান রেজাউল কবির।

এদিকে, শরণখোলায় নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় এক ইউপি সদস্য ও নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছেন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। আহতদের মধ্যে খোন্তাকাটা ইউনিয়নের রাজৈর ৭ নম্বর রাজৈর ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য মোঃ আঃ রহিম হাওলাদারকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শরণখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৫ জন।

মোরেলগঞ্জের চিংড়াখালী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য পদে মনির শেখ পরাজিত হয়ে স্থানীয় নারিকেলবাড়িয়া বাজারে বিজয়ী প্রার্থীর চার সমর্থক আলীম হাওলাদার, কবির হাওলাদার, কাওসার হাওলাদার ও শামীম বক্সের দোকান ভাংচুর করে। পুঁটিখালী ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডে পরাজিত প্রার্থী মিলন শেখ অভিযোগ করেন, বিজয়ী সদস্য মহসীন খানের নেতৃত্বে একদল সমর্থক হামলা চালিয়েছে। এতে জাকির হোসেন গুরুতর আহত হয়।

এ বিষয়ে বাগেরহাটের পুলিশ সুপার জানান, ‘নির্বাচনের পর বিচ্ছিন্ন কয়েকটি এলাকায় কিছু সহিংসতা হয়েছে। তবে তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশী তৎপরতা অব্যাহত আছে। এখন পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত।’