১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

পটুয়াখালী সার্কিট হাউস আজও আতঙ্ক


পটুয়াখালী-বরগুনা অঞ্চলে যে ক’টি টর্চার সেল পাকিস্তানী হানাদার সেনারা নরকে পরিণত করেছিল, তার শীর্ষে ছিল পটুয়াখালী সার্কিট হাউজ। একাত্তরের ছাব্বিশ এপ্রিল পাকি সেনারা পটুয়াখালী শহরের দখল নেয়। এরপর আট ডিসেম্বর পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পাকিসেনারা এ ভবনটি টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করে। সার্কিট হাউজকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকে কয়েক মাস প্রথমে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মেজর নাদের পারভেজ ও পরের কয়েক মাস মেজর ইয়ামিনের বাসভবন ছিল। নির্যাতনের নৃশংসতার দিক থেকে মেজর নাদের পারভেজ এতটাই কুখ্যাত ছিল যে, তার নাম শুনলেই মানুষ আঁতকে উঠেছে। সার্কিট হাউজের টর্চার সেলে বীভৎস নির্যাতন সয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছেন, এমন বেশ কয়েকজন এখনও সার্কিট হাউজ ও পাকিস্তানী সেনাদের নাম শুনলে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি সার্কিট হাউজে নারীদের ধর্ষণ করা হয়। পাকিস্তানী সেনাদের লেলিয়ে দেয়া অনুগত রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিকমিটির নেতারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সুন্দরী নারীদের হদিস দিত। পরে তাদের ধরে আনা হতো। অনেক ক্ষেত্রে রাজাকাররাও গ্রামাঞ্চল থেকে সরাসরি নারীদের তুলে নিয়ে আসত। পটুয়াখালী শহরের পার্শ্ববর্তী ইটবাড়িয়া গ্রামের কয়েক বীরাঙ্গনা জানিয়েছেন, তাদের তুলে নিয়ে প্রথমে সার্কিট হাউজের অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এলে তাদের একের পর এক অন্য কক্ষে নেয়া হয়। রাতভর তাদের ওপর চলে পাশবিক নির্যাতন। বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে হয় গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে, নয়ত নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ জখম করা হতো। অল্প বয়সী মেয়েদের ওপর বীভৎসতা হিংস্র হায়েনাদেরও ছাড়িয়ে যায়। কয়েকদিন পর পরই গ্রাম থেকে নতুন নারীদের তুলে আনা হয়েছে। পুরনোদের হত্যা অথবা জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। ভাগ্যক্রমে দু’চারজনকে ছেড়ে দেয়া হতো। জেলখানাতেও নারীদের ওপর পাকিসেনারা নির্যাতন চালিয়েছে।

পুরুষদেরও একইভাবে ধরে এনে প্রথমে সার্কিট হাউজে আটকে রাখা হয়। এর মধ্যে যুব বয়সীদের ওপর নির্যাতন চলে বেশি। পাকিসেনারা সবার আগে ব্যবহার করেছে লিকলিকে চিকন বেত বা ছড়ি। যা তারা সর্বদা হাতে নিয়ে থাকত। চিকন বেত বা ছড়ির পরে শুরু হতো কাঠের মোটা রুল দিয়ে পেটানো। উপুর করে শুইয়ে পায়ের পাতা, গোঁড়ালিসহ শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গে তীব্র কষাঘাত করত পাষ-রা। হাত-পায়ের নখ তুলে ফেলা ছিল সাধারণ বিষয়। এ অবস্থাতেই সুঁই ফোটানো হতো। সুঁইয়ের মাথা মোমের আগুনের ওপর ঠেসে ধরা হতো। পা ওপরে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুলিয়ে বেত মারা ছিল পাকিসেনাদের নির্যাতনের নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে