২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

একাত্তরের টর্চার সেল


টর্চার সেল মানে নির্যাতন কেন্দ্র। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা নেত্রকোনার বেশ কয়েকটি সরকারী স্থাপনা ও বাসা-বাড়ি টর্চার সেলে পরিণত করে। মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বনকারী, নিরীহ বাঙালী ও নারীদের ধরে এনে এসব টর্চার সেলে অমানসিক নির্যাতন চালানো হয়। কেড়ে নেয়া হয় নারীদের সম্ভ্রম। প্রতি রাতেই এসব নির্যাতন কেন্দ্র থেকে শোনা গেছে যন্ত্রণাকাতর মানুষের আর্তনাদ।

জানা গেছে, ’৭১-এর ২৯ এপ্রিল নেত্রকোনা শহরে প্রথম পাকবাহিনী ঢোকে। জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ প্রভৃতি দলের পাকিস্তানপন্থী নেতারা তাদের অভ্যর্থনা জানায়। এরপর মোক্তারপাড়া এলাকার সরকারী ডাকবাংলোটিকে পাকবাহিনীর সদর দফতর ও পাকসেনা কর্মকর্তার বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে মূল ক্যাম্প স্থাপন করে ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে। পাকবাহিনী আসার পর পরই গড়ে ওঠে আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী। বড়বাজারে ব্যবসায়ী সর্বমোহন বণিকের দোতলা বাসাটিকে করা হয় আল-বদর বাহিনীর অফিস। আটপাড়ার কুখ্যাত হেদায়েত উল্লাহ বিএসসি ওই বাহিনীর প্রধান ছিল। অন্যদিকে মুজাহিদ বাহিনী অফিস স্থাপন করা হয় পুরাতন কাচারি রোডের দেবোত্তর সম্পত্তির বাড়িটিতে। একইভাবে আখড়া মোড়ের সাহা স্টুডিওতে মিলিশিয়া ক্যাম্প এবং মেছুয়া বাজারের শ্রীশ মোক্তারের বাসা দখল করে গড়ে তোলা হয় জামায়াতের অফিস। অফিস বা ক্যাম্প হলেও কার্যত প্রত্যেকটিই ছিল টর্চার সেল। পাকবাহিনী ও দালাল-রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, মুক্তিকামী মানুষ ও নারীদের ধরে এনে এসব নির্যাতন কেন্দ্রে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন করেছে। নির্যাতনের পর ভাগ্যক্রমে কেউ ছাড়া পেলেও বেশিরভাগ বন্দীকে ত্রিমোহনী ও মোক্তারপাড়া সেতু, সাতপাই মগড়া নদীরপাড় ও চল্লিশা রেলসেতুসহ বিভিন্ন বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়।

মহকুমায় পাকবাহিনীর সদর দফতর খ্যাত সরকারী ডাকবাংলোটি ছিল ভয়াবহ টর্চার সেল। প্রথমদিকে এটি ছিল পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন জায়িদীর অফিস কাম-বাসা। পরবর্তীতে তার বদলে মেজর বাবর এবং কর্নেল রেজ্জাক মীর্জা সেখানে দায়িত্ব পালন করে। আনুকূল্য লাভের আশায় পাকিস্তানের দোসর-দালালরা অনেক মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ ও নারীদের ধরে এনে তুলে দেয় এসব নরপশুর হাতে। এমনি দুই হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধার নাম বদিউজ্জামান মুক্তা ও দবির উদ্দিন আহমেদ। স্কুল শিক্ষক বদিউজ্জামান মুক্তা ও তাঁর সহযোগী আব্দুল মালেক শান্ত কার্তিক মাসে বিরামপুর বাজারে যুদ্ধের রেকি করতে গিয়ে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন। মুক্তাকে প্রথমে পুরাতন ডাকবাংলোয় এবং পরে সন্ধ্যায় ভিটিআই কেন্দ্রে নিয়ে নির্যাতন করে। নির্যাতনের মুখে বার বার ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতে বললেও তিনি বলে ওঠেন ‘জয়বাংলা’। রাতভর নির্যাতনের পর মোক্তারপাড়া সেতুতে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে। মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত ক্রীড়াবিদ দবির উদ্দিন আহমেদকেও ওই টর্চার সেলে ধরে এনে অত্যাচার-নির্যাতনের পর বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়। একইভাবে আশ্বিন মাসে পুরাতন ডাকবাংলোর টর্চার সেলে এনে টানা তিনদিন নির্মম নির্যাতন চালানো হয় চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামিনী চক্রবর্তীকে। তিনদিন কিছু খেতে দেয়া হয়নি তাঁকে। ত্রিমোহনী বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় তাঁকে। ১২ আগস্ট নেত্রকোনা কলেজের দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপক আরজ আলীকে কলেজ হোস্টেল থেকে ধরে ভিটিআই কেন্দ্রের টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে বিরিশিরি বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয় এই শিক্ষাবিদকে। টর্চার সেলে ধরে এনে সম্ভ্রম লুট করা হয়েছে অনেক নারীর। পাশবিক আচরণে করা হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত। স্বাধীনতার পর সেসব বীরাঙ্গনাদের কেউ কেউ লোকলজ্জায় দেশ পর্যন্ত ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এসব টর্চার সেলের কয়েকটি খ-চিত্র মাত্র। এভাবে আরও অগণিত মানুষকে লোমহর্ষক অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে নেত্রকোনার বিভিন্ন টর্চার সেলেÑ যা আজও তাড়িত করে সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা অনেককেই।

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে