২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

উনিশ শতকে নারী জাগরণ-১


উনবিংশ শতাব্দীতে দ্বারকানাথ আধুনিক মানুষ হিসেবে কলকাতা এবং ঠাকুরবাড়ির অঙ্গনকে গৌরবময় করে তোলেন তেমনি এই বাড়ির মহিলারাও নারী স্বাধীনতা কিংবা জাগরণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। আধুনিক কলকাতা শহর বিনির্মাণে বাংলার ঐতিহ্যকে ধারা, পাশ্চাত্য প্রভাব, উপনিবেশিক শাসন সর্বোপরি ঠাকুর বাড়ির বৈষয়কি ও সাংস্কৃতিক বৈভবও বিশেষ অবদান রাখে।

আধুনিক, স্বাধীনতচেতা দ্বারকানাথের মাতা অলকাসুন্দরী এবং স্ত্রী দিগম্বরী দেবী আড়ালে নেপথ্যে স্ত্রী স্বাধীনতার উজ্জল দৃষ্টান্ত এবং পথিকৃৎও বটে। মৃত্যুর পূর্বে অলকাসুন্দরী শয্যাশায়ী হলে তাঁকে অন্তর্জ্বলি যাত্রায় যেতে বাধ্য করা হয়। তিনি একেবরেই যেতে চাননি। তের বছরের পিতৃহীন বালক দ্বারকানাথকে মাতা তাঁর সমস্ত দায়িত্ব, কর্তব্য নিষ্ঠা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে বড় করে তোলেন। মাতার দৃঢ়চিত্ত, স্বাধীন চিন্তার বীজ পুত্রের মধ্যে বালক বয়স থেকেই উপ্ত হয়। পুত্রবধূ দিগম্বরী ছিলেন আরো তেজস্বী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং আপোষহীন ব্যক্তিত্বের ধারক ছিলেন।

দ্বারকানাথ সাহেবদের সাথে এক সাথে পানাহার করতে শুরু করলে স্ত্রী দিগম্বরী তা সানতে পারেননি। শুধু তাই নয়, স্বামীর এই স্বেচ্ছাচারিতা স্বচক্ষে দেখার জন্য ঠাকুর বাড়ির সীমাবদ্ধ মহল থেকে বৈঠকখানা পর্যন্ত যান। তহবিহবল কিন্তু শান্ত এবং স্থির হয়ে তিনি ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের কাছে এর বিধান চেয়ে পাঠান। কিন্তু তৎকালীন অসূর্য স্পশ্যা অন্ত:পুরবাসিনী একজন নারী কিভাবে বৈঠকখানা পর্যন্ত যেতে পারেন কিংবা স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগই বা কি করে তোলেন শাস্তজ্ঞদের কাছে? এতটাই স্বাধীন ছিলেন দিগম্বরী দেবী? এর পেছনে দ্বারকানাথের কি নারী স্বাধীনতার প্রতি নিঃশব্দ সম্মতি ছিল? কিংবা তার আচার আচরপেতা কখনো স্পষ্ট হয়ে উঠে? বার্মহীর, নতুন আলোর নির্ভীক পথিক এই রাজসিক ব্যক্তিত্ব যিনি দেশে বিদেশে ‘প্রিন্স’ নামে অভিহিত, তাঁরই যোগ্য স্ত্রী হিসেবে দিগম্বরীর এত দুঃসাহস ছিল? পতিব্রতা দিগম্বরী স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এতখানি ঔদ্ধত্য হয়তো বা দেখাননি। পন্ডিতদের মত অনুযায়ী তিনি স্বামী সংসর্গ থেকে দূরে সরে গেলেন বটে কিন্তু নিষ্ঠাবান পতœীর দায়িত্ব থেকে চ্যুত হলেন না। স্বামী ও বিনা দ্বিধায় স্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন।

এতখানি সাহস অর্জন করতে ঠাকুরবাড়ির অন্য নারীদের আরো অপেক্ষা করতে হয়। দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী সারদা দেবী পতিব্রতা স্ত্রীর মতো স্বামীর সব আদর্শকে (ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ এবং ঠাকুরবাড়ি থেকে বিগ্র অপসারণ) মেনে নিতে না পারলে ও এর তীব্র বিরোধিতা ও কখনো কারো চোখে পড়েনি। সামান্য লেখাপড়া জানা সারদা দেবী স্বামীর মধ্যে নিবিষ্ট থাকতেন।

বাইপড়া, অভিধান দেখা সবই তাঁর আয়ত্বের মধ্যে ছিল। দেবেন্দ্রনাথও স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্বে কোনরকম অবহেলা করেননি। সসম্মানে স্ত্রীকে সংসারে অধিষ্ঠিত করেছেন। আর্থিকভাবে সারদাদেবীকে কোনদিন যাতে কারো মুখাপেক্ষী হতে না হয় সে ব্যবস্থা ও নিশ্চিত করেছেন। এতে থেকে বুঝা যায় নারীর সম্মান, অধিকার ও স্বাধীনতার ঠাকুর বাড়িতে বরাবরই প্রচলন ছিল। সে ধারারই আধুনিক সংস্করণ জ্ঞানদা নন্দিনী, স্বর্ণকুমারী কিংবা কাদস্বরীর মতো অসাধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন নারী ব্যক্তিত্বের জাগরণ।

দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ কন্যা সৌদামিনী দেবী অবিভক্ত বাংলায় নারী শিক্ষা গ্রহণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বেথুন স্কুলে সৌদামিনী ভর্তি হন ১৮৫১ সালে। মাত্র ৫ বছর বয়সে পিতা তাঁর প্রথম কন্যাকে স্কুলে ভর্তি করেছেন দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। কিন্তু সৌদামিনী গৃহকর্মে যতখানি নৈপুন্য দেখান লেখাপড়ায় ঠিক ততটা হয়নি। কারণ বেথুনের প্রথম দিককার এই ছাত্রীটির পরবর্তীতে তাঁর শিক্ষা সম্পর্কে আর কিছুই যায়না। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথের আর এক কন্যা স্বর্ণকুমারীর নাম বাংলার সাহিত্যাকাশে উজ্জল তারার মতো আবেগ দীপ্তিমান।

শুধু লেখাপড়া জানা নয়, অদ্ভুত সৃষ্টিশীলতায় ঠাকুরবাড়ির এই কন্যাটি বিদগ্ধ মহলে দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহিলা ঔপন্যাসিক এই স্বর্ণকুমারী দেবী সমসাময়িক বানের সাহিত্যিক মহলে প্রচন্ড আলোড়ন তোলেন। (চলবে)