২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বীর মুক্তিযোদ্ধা ॥ তিনি শিখা অনির্বাণ


জুবাইদা গুলশান আরা হেনা

বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্্যাপন উপলক্ষে সাহিত্যপদক প্রদান ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে চলে এলাম। অগ্নিঝরা মার্চের ১৯ তারিখ।

দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের সদস্য হওয়ার। সময় সুযোগ হয়ে ওঠেনি। দেশের বিশিষ্ট গুণীজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অত্যন্ত চমৎকার একটা অনুষ্ঠান। র‌্যাফেল ড্র ছিল। আমি দু’টো কুপন কিনলাম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো গুণীজনদের বক্তব্য শুনছিলাম। এমন মহতী অনুষ্ঠানে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা যায়।

অনেক ভাল লাগল। বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ থেকে পুরুষ লেখককেও সম্মানিত করা হলো।

বিশিষ্টজনদের বক্তব্য থেকে বের হয়ে এলো নারী-পুরুষকে সমান তালে এগিয়ে আসতে হবে। সব ক্ষেত্রেই নারীদের অবদান রয়েছে। আলোচনা শেষে র‌্যাফেল ড্র। তিনটি পুরস্কারের মধ্যে আমি দ্বিতীয় পুরস্কারটি পেয়েছি। খুশিতে পুরস্কার নিতে মঞ্চে গেলাম। অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল আমাকে বললেন, তোমার কুপন আমি তুলেছি বলে আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন। আমার আনন্দের শত সহস্রগুণ বেড়ে গেল।

আমি এর আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিলের যুদ্ধকালীন স্মৃতি কথা শুনছিলাম। মোবাইলে রেকর্ড করছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম এই নারী মুক্তিযোদ্ধাকে আমি কত খুঁজেছি। কতজনের কাছে মোবাইল নম্বর চেয়েছি। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তাঁর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করব। সকল মুক্তিযোদ্ধার (নারী-পুরুষ) প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান। লাখো শহীদের রক্ত আর মুক্তিযোদ্ধাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের অর্জিত স্বাধীনতা। আমি এর মধ্যে বেশ কয়েক নারী মুক্তিযোদ্ধার কথা তাঁদের মুখ থেকে শুনেছি। তাঁদের অনেক হৃদয়বিদরক স্মৃতি আমার মনকে ভারাক্রান্ত করেছে।

শিরিন বানু মিতিলের যুদ্ধে অংশগ্রহণে একটা বৈচিত্র্য ছিল। তিনি নারী হয়েও সামাজিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য পুরুষের পোশাক পরে যুদ্ধ করেছিলেন। যাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন তাঁদের দু’জন ব্যক্তি ছাড়া কেউ জানতেন না মিতিল নারী।

একজন নারী দীর্ঘদিন নিজেকে গোপন করে পুরুষ সেজে যুদ্ধ করা আমি মনে করছি এটাও আরেকটি যুদ্ধ।

মহান মুক্তিযুদ্ধে যে কয়জন অদম্য দেশপ্রেমিক নারী প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের নাম ইতিহাসে সমুজ্জ্বল।

১৯৫০ সালের ২ সেপ্টেম্বর পাবনা শহরের দিলালপুরের মায়ের কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন শিরিন বানু মিতিল। পিতা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। খন্দকার মোহম্মদ শাহজাহান। মা রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও পূর্ব বাংলা আইন সভায় সাবেক সদস্য সেলিনা বানু। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়ন পাবনা জেলা শাখায় সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে ফেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি মস্কো, রাশিয়া থেকে ইতিহাসে এমএ ডিগ্রী সম্পন্ন করে ১৯৮০ সালে দেশে ফিরে আসেন। বাবা-মা দু’জনই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। মাতমহ খান বাহাদুর ওয়াসিম উদ্দিন আহমেদের রাজনৈতিক আদর্শ মিতিলকে প্রভাবিত করে। জেলা ছাত্র ইউনিয়নে সভাপতি পদের কারণে শিরিন বানুকে বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর অনন্য সাধারণ মা সেলিনা বানু বলেছিলেন ‘ঘরে বসে মরার জন্য জন্ম দেইনি তোদের। ঘরের বের হয়ে একটা কিছু কর দেশের জন্য।’ বড় খালা এবং ফুফু বলেছিলেন ‘যুদ্ধে যাচ্ছ যাও তবে তোমাদের পিঠে যেন গুলি না লাগে।’ মামাত ভাই জিদান বলেছিলেন, ‘তুমি প্রীতিলতার মতো শার্ট-প্যান্ট পরে যুদ্ধে যেতে পারো।’ এই সব কথা মিতিলের চেতনায় অমিয়বাণীর মতো ধ্বনিত হয়।

নগরবাড়ীতে যুদ্ধ চলাকালীন কন্ট্রোল রুমে গুরুদায়িত্ব পড়ে শিরিন বানুর ওপর। পাক বাহিনীর প্রচ- আক্রমণ শুরু হতে তিনি কুষ্টিয়া হয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌঁছান। এরপর ভারত অভিমুখে যাত্রা শুরু করে ভারত বাংলাদেশ সহায়ক সমিতিতে পৌঁছান। সেখানে মিতিল খন্দকার নামে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত করেন। অবশেষে পুরুষের ছদ্মবেশে মুক্তিযুদ্ধ করার বিষয়টি প্রকাশিত হয়ে যায়। একজন সাংবাদিক পত্রিকায় বিষয়টি প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে প্রখ্যাত সাংবাদিক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে শিরিন বানু কিংবদন্তি নারী নেত্রী ইলা মিত্রের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরপর মহিলাদের একমাত্র সশস্ত্র ট্রেনিং ক্যাম্প ‘গোবরা ক্যাম্পে’ যুক্ত হন। বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মাতৃভূমির এক সুযোগ্য সন্তান। তিন সন্তানের জননী। মিতিল আজও নারী আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি প্রিপট্রাস্ট নামে একটি এনজিওর পরিচালক পদে কর্মরত আছেন।

আমরা তাঁকে জানাই অফুরন্ত অভিনন্দন। কামনা করি সুস্থ দীর্ঘ পরমায়ু।

নারী কত সাহসী, শক্তিশালী, দৃঢ়প্রত্যয়ী, সঠিক নেতৃত্বদানকারী হতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শিরিন বানু মিতিল।