২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

হিমবাহের রং কেন নীল


এন্টার্কটিকার সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্যাবলীর একটি হলো এর নীলবর্ণের বরফ। দেখতে মনে হয় যেন ঢেউ তোলা এক জমাট সাগর! বায়ুপ্রবাহ ও বাষ্পীভবনের যৌথ প্রভাবে যেখানে হিমবাহগুলো তুষারমুক্ত হয়ে পড়ে সেখানে টুকরা টুকরা নীলবর্ণের বরফ দেখা দেয়। দিগন্তের ওপর যখন মেরুসূর্য উঁকি দেয় সেসময় বায়ুর ঘর্ষণে মসৃণ আকার ধারণ করা ইষস্বচ্ছ বরফের পৃষ্ঠদেশ থেকে জ্বলজ্বলে নীলকান্তমণির রং প্রতিফলিত হয়। এন্টার্কটিকাই পৃথিবীর একমাত্র স্থান যেখানে নীল বর্ণের এমনি অবিশ্বাস্য বরফের বিস্তার দেখতে পাওয়া যায়।

নীল বরফ ভয়ঙ্কর রকমের পিচ্ছিল। তার ফলে এর ওপর দিয়ে হাঁটাচলা করা রীতিমতো এক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। তথাপি লোকে ঝুঁকি নিয়ে এই বরফের ওপর দিয়ে চলাচল করেছে কালের গর্ভে বিচরণের জন্য। কারণ নীল বরফ হলো এন্টার্কটিকার প্রাচীনতম বরফগুলোর অন্যতম। এই মহাদেশে বিজ্ঞানীরা বরফ খুঁড়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে নীল বরফ ১০ লাখ বছরের পুরনো। এর চেয়েও পুরনা বরফের অস্তিত্ব আছে কিনা বিজ্ঞানীরা সেটাও সন্ধান করে দেখছেন।

হিমবাহের বরফ প্রথম যখন জমাট বাঁধে তখন তা বাতাসের বুদ্বুদে পূর্ণ থাকে। সেই বরফ যখন উপরিভাগের নতুন বরফের নিচে চাপা পড়ে পিষ্ট হয় তখন সেই পুরনো বরফ নীলবর্ণ ধারণ করতে শুরু করে। বরফের ঘনত্ব মতই বাড়তে থাকে সেই বুদ্বুদগুলো ক্রমশ ছোট থেকে ছোট হয়ে আসতে থাকে। বুদ্বুদগুলো যেহেতু ছড়িয়ে পড়ছে না তাই আলো আরও গভীরভাবে বরফের ভিতর ঢুকে পড়তে পারে। মানুষের চোখে প্রাচীন হিমবাহের বফর ছাকনির মতো কাজ করে। এই বরফ লাল ও হলুদ আলো শুষে নেয় এবং নীল আলো প্রতিফলিত করে। এতে করে হিমবাহ চমৎকার নীল বর্ণ ধারণ করে। পক্ষান্তরে তুষার সাদা রঙের হওয়ার কারণ হলো এটা বাতাসে বুদ্বুদে পরিপূর্ণ। তার ফলে তুষার সাদা আলোর পুরো বর্ণালী প্রতিফলিত করতে পারে। পাত্রের মুখ খোলার সোডা গ্লাসে ঢালার সঙ্গে সঙ্গে যেমন সাদা রঙের ফেনা উপরে ভেসে উঠে এটাও ঠিক তেমনি। এন্টার্কটিকার প্রান্তভাগে যেখানে হিমবাহ সাগরে পড়ে যায় সেখানে কখনও কখনও নীল বরফ জেগে ওঠে। গ্রীষ্মকালে বরফ গলার ফলে হিমবাহের নীল বরফের মসৃণ খ- সৃষ্টি হতে পারে। তবে সংজ্ঞানুযায়ী দেখলে এন্টার্কটিকার পর্বতমালার কাছে প্রায়শই খাঁটি নীল বরফের এলাকা জেগে ওঠে।

মহাদেশের বিশাল বিশাল হিমবাহুগুলো ধীর প্রবাহিনী বরফের নদীর মতো। এই প্রবাহ পর্বতমালার মতো কোন প্রতিবন্ধকতার গায়ে লেগে বাধাপ্রাপ্ত হলে গভীরতর স্তরের বরফ সবেগে উর্ধে ওঠে। অনেকটা নদীর তলদেশে ডুবে থাকা পাথরের ওপর দিয়ে পানি বয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার। পাহাড় পর্বতের তুষার আচ্ছাদিত।

অংশের যে জায়গায় প্রবল বায়ুর তোড়ে তুষার ও বরফ সরে যায় সেখানেও নীল বরফ জেগে উঠতে পারে। কালক্রমে বাষ্পীভবনের মধ্য দিয়ে নীল বরফ উবে গিয়ে এর পুরনো স্তরগুলো অনাকৃত হয়ে পড়ে।

২০১০ সালের এক সমীক্ষায় জানা যায় যে, বর্তমান এন্টার্কটিকার মাত্র প্রায় ১ শতাংশ জায়গা নীল বরফে ঢাকা। নীল বরফের এলাকা সাধারণত যে কোন দিকে কয়েক মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

এন্টার্কটিকার নীল বরফ এক বিরল ঐশ্বর্য ধারণ করে আছে। তাহলো উলকা। এন্টার্কটিকার নীল বরফ এলাকা থেকে ২৫ হাজারেও বেশি উল্কা সংগ্রহ করা হয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে উল্কা পড়ে এই হিমমহাদেশের ছোট যে এলাকাটিতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে হিমবাহের বরফ বাষ্প হয়ে উবে গিয়ে সেই উল্কাগুলো উন্মোচিত হয়ে পড়ে। উল্কা শিকারিরা প্রতিবছর সেøা মোবাইল ক্যারাভানে করে নীল বরফের তল্লাট চষে বেরিয়ে উল্কা সংগ্রহ করে। নীল বরফের এলাকা বিমান অবতরণের রানওয়ে হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইতালী, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র সবাই নীল বরফের রানওয়ে ব্যবহার করে।

সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি