১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অতীতেও কোন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সহিংসতামুক্ত ছিল না


স্টাফ রিপোর্টার ॥ ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংস ঘটনার জন্ম হলেও বিশ্লেষণে দেখা গেছে অতীতে কোন ইউপি নির্বাচন সহিংসতামুক্ত ছিল না। তবে ওই সময় বর্তমানের মতো এত বিপুলসংখ্যক মিডিয়া না থাকায় সহিংসতার কোন খবর প্রকাশ হতো না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রক্তাক্ত ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। এছাড়া গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা আসার পরও কোন সময়ই এ নির্বাচন সহিংসতামুক্ত ছিল না। ১৯৯৭, ২০০৩ ২০১১ সালেও ইউপি নির্বাচনের আগে পবে সহিংসতার ঘটনায় অনেক প্রাণহানি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সময়ের মতো আগে এত মিডিয়া ছিল না বলে নির্বাচনী সহিংসতার বিষয়টি তখন এত আলোচনার বিষয় হতো না। একমাত্র ইলেক্টনিক মিডিয়া ছিল বিটিভি। তাও ছিল সরকারী নিয়ন্ত্রণে। ফলে কেন্দ্র দখল বা ভোট কারচুপির খবর সামরিক শাসনামলে প্রকাশ পেত না বললেই চলে। তবে বর্তমানে মিডিয়ার কল্যাণে প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার খবর ফলাও করে প্রচারিত হয়ে থাকে। এ কারণে নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে অনেক বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা দেশে নতুন কোন ঘটনা নয়। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পেশীশক্তির ব্যবহার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বেশিই ঘটে থাকে। কারণ এই নির্বাচনে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টিও প্রাধান্য পায়। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে অনেক সংস্থা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় সরকার দলীয় দখলে রাখার বিষয়ে সব সরকারেরই চেষ্টা ছিল। যে কোন উপায়ে তারা স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করতে চান। দু’একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে এই নির্বাচন কখনই সরকারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে অনুষ্ঠিত হয়নি। সবচেয়ে সহিংস এবং রক্তাক্ত উদাহরণটি সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৭ সালে এরশাদের সামরিক শাসনামলে। চর দখল, ভোটকেন্দ্র দখল ও রক্তপাতের জন্য ঐ নির্বাচন এখনও অনেকে ভুলে যাননি। এর পরের নির্বাচনগুলো মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হলেও সরকারী হস্তক্ষেপের অভিযোগ সব সময়ই ছিল। ২০০৩ সালেও ইউপি নির্বাচনে সহিংসতার নজির রয়েছে। ব্যতিক্রম ছিল না ২০১১ সালের নির্বাচনেও।

এমনিতেই তৃণমূলের এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সব সরকারেরই একটি তীক্ষè নজর থাকে। সামরিক সরকারগুলোর ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। ক্ষমতা দখলের পর পরই তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করে। কারণ তাদের রক্ষাকবজ হিসেবে ব্যবহার করেছে ইউপি পরিষদগুলোকে। এ কারণে তারা অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা গ্রহণ করেই ইউপি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে। সামরিক শাসকরা স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের ভিত্তি করে দল গঠন করেছে। জিয়াউর রহমানের জাগদল ও বিএনপির বহুদলীয় গণতন্ত্র ও এরশাদের জনদল ও জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ও এর জনপ্রতিনিধিদের ব্যবহার করা হয়েছে। আর সেখান থেকে উৎপত্তি হয়েছে স্থানীয় নির্বাচনের সহিংসতার সূত্রপাত। যার ধারা এখন অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

সারাদেশে ইউপি নির্র্বাচনের প্রথম দফায় গত মঙ্গলবার ৭১২ ইউপিতে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। অতীতের মতো এ নির্বাচনে ব্যালট পেপার ছিনতাই, জাল ভোট দেয়াসহ বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। যা অতীতের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রেও অতীতের ধারাই অনুসরণ করা হয়েছে। মিডিয়ার কল্যাণে এখন যেভাবে এসব ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে আগের ঘটনাগুলো সেভাবে প্রকাশ করার কোন সুযোগও ছিল না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার প্রভাব পড়ছে অনেক বেশি।

আগের নির্বাচনগুলোর পরিবেশ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এলাকায় যার প্রভাব বেশি সেসব এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে পরিচিত এবারের ইউপি নির্বাচনেও মূলত এলাকায় প্রভাবেই জাল ভোট, কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ ও ব্যালট পেপার ছিনতায়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো দলীয় নির্বাচন হওয়ায় দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীও স্বতন্ত্র হিসেবে অংশ নিয়েছে। নির্বাচনের প্রথম দফায় আওয়ামী লীগের ৬০ জন ও বিএনপির ১১ জন প্রার্থীও নির্বাচনে জয়লাভ করেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিজের এলাকায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত প্রভাব মূলত তাদের নির্বাচন জয়ী হওয়ার পেছনে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া ইউপি নির্বাচনে প্রথম থেকেই দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেকের অভিযোগ টাকার বিনিময়ে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। ফলে যারা দীর্ঘসময় ধরে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে তারা এ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছে। প্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজ এলাকায় প্রভাবের কারণে দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি তারাও জয়লাভ করেছে। এসব বিষষ ছাড়াও যখন যে সরকার ক্ষমতায় থেকেছে সেসব দলের নেতাকর্মীরা সুযোগেরও সদ্ব্যবহার করেছে অনেকটা। এবারও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। ব্যতিক্রম হলো মিডিয়া সচেতন থাকায় প্রচার হয়েছে বেশি। অতীতে সাধারণত স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে মিডিয়ায় প্রচার দেখা যায়নি। আগে ১৯৮৫ সালে ও ’৯০ সালে এরশাদের আমলে দুবার উপজেলা নির্বাচন ও ৮৭ সালে ইউপি অনুষ্ঠিত হয়। ওইসব নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন দলের এতই প্রভাব ছিল যে, নির্বাচনী ফলে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের অধিকাংশ প্রার্থীই নির্বাচনে জয়লাভ করে। কিন্তু তারপরেও ওই দুই নির্বাচনে যে কারচুপি হয়েছে বর্তমানের মতো এত প্রচার পায়নি।

নির্বাচন কমিশন বলছে, ইউপি নির্বাচন দেশের একটি বড় নির্বচন। সুষ্ঠুভাবে এ নির্বাচন সম্পন্ন করা কঠিন একটি বিষয়। অনেক পক্ষ নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে। কমিশনের নিজস্ব লোক না হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কমিশনের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তারপর কমিশনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যাতে কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। এরপর অতীতে সব নির্বাচনের মতো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা থাকে যা রোধ করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে দলীয় ও ব্যক্তি প্রভাবে কারণে প্রতিদিন নির্বাচনী প্রচারে কোথাও না কোথায় সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে এবারের প্রথম দফায় নির্বাচনী প্রচারের সময় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে। তবে দ্বিতীয় দফায় এটা অনেটাই কমে এসেছে। নির্বাচনের আগে পরে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল ২০০৩ সালে। ওইসময় ইউপি নির্বাচনের আগে পরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সে তুলনায় এবার প্রাণহানির ঘটনা অনেক কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনে একটি প্রাণহানির ঘটনাও দুঃখজনক। কাজেই নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে আরও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নির্বাচনের সময় কমিশন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। স্থানীয় প্রশাসনও কমিশনের নির্দেশে পরিচালিত হওয়ার কথা। কাজেই নির্বাচন কমিশন কার্যকর ব্যবস্থা নিলে সংঘাত-সংঘর্ষ অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও আস্থার জায়গা। এখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই নির্বাচন নিয়ে উৎসাহের কোন অন্ত থাকে না। সারা দেশ উৎসবের আমেজে মেতে ওঠে। ভোট প্রদানে অশিতীপর বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নবীন তরুণরাও উন্মুখ হয়ে থাকে। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও এই নির্বাচন মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত। তাই এ নির্বাচন যতটা সহিংসতামুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে ততই জনগণের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: