১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

লঙ্কান এনজিওর ৬ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা


রহিম শেখ ॥ রিজার্ভের টাকা লোপাট হওয়ার পর সে টাকা কোথায় এবং কার কাছে গেছে সেই তথ্য খুঁজছে গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ফিলিপিন্স, হংকং ও শ্রীলঙ্কার যেসব প্রতিষ্ঠানে ফেডারেল রিজার্ভ থেকে টাকা গেছে সেসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা। গোয়েন্দাদের বলছেন, টাকার উৎস ধরে এগুলো দেশী বা বিদেশী কারা জড়িত সেটা যেমন বের হয়ে আসবে, পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতাও খুঁজে পাওয়া যাবে। রিজার্ভ থেকে টাকা হ্যাকিংয়ের ঘটনা বাংলাদেশসহ বিশ্বের চারটি দেশের অপরাধী চক্র জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা। এই অবস্থায় রিজার্ভ চুরির বিষয়ে চলমান তদন্তে শুধু অগ্রগতি নয়, ‘যথেষ্ট’ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ এ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় শ্রীলঙ্কার একটি এনজিওর ৬ পরিচালকের বিরুদ্ধে দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন দেশটির আদালত। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরির পুরো বিষয়টি দেশটির তদন্ত কমিটির শুনানিতে অংশ নিয়ে সব কিছু খুলে জানাতে চান মূল হোতা বলে অভিযুক্ত চীনা বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী কিম অং।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কম্পিউটারের ডাটা ক্লোন করে নিয়েছেন সিআইডি কর্মকর্তারা। তাতে হাজার হাজার ডাটা রয়েছে। বৃহস্পতিবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন সিআইডি কর্মকর্তারা। সূত্র বলছে, ঘটনাটির সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিশ্বের চারটি দেশের অপরাধী চক্র জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পাশাপাশি অপর যে তিনটি দেশের লোক জড়িত, সেই দেশ তিনটিতেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন সিআইডি কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে চার দেশে আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, রিজার্ভের টাকা চুরি হওয়ার পর সে টাকা কোথায় এবং কার কাছে গেছে, সেটা থেকেই দেশী-বিদেশী অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে সিআইডি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির এক উর্ধতন কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, টাকার উৎসব ধরেই দেশী বা বিদেশী কারা জড়িত সেটা যেমন বের হয়ে আসবে একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা এ ঘটনায় জড়িত কি-না তাও বেরিয়ে আসবে। এদিকে রিজার্ভের টাকা চুরির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গঠিত সাবেক গবর্নর ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত দল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অফিস করেছেন। প্রাথমিকভাবে ১০টি ইস্যুকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনা তদন্তে প্রয়োজনে ফিলিপিন্স এবং যুক্তরাষ্ট্রেও যাবেন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। শুধু তাই নয়, তথ্যগত সহায়তার জন্য এ ঘটনার তদন্তকারী অন্য সংস্থা সিআইডি এবং এফবিআই প্রতিনিধির সঙ্গেও কথা বলবেন ড. ফরাসউদ্দিন।

তদন্তে ‘যথেষ্ট’ অগ্রগতি বলছে- বাংলাদেশ ব্যাংক ॥ রিজার্ভ চুরির বিষয়ে চলমান তদন্তে শুধু অগ্রগতি নয়,‘যথেষ্ট’ অগ্রগতি আছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ কথা জানান। রিজার্ভ চুরির তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে শুভঙ্কর সাহা বলেন, তদন্ত চলমান আছে। তদন্তের স্বার্থে এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না। তবে অগ্রগতি আছে এবং যথেষ্ট অগ্রগতি আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য কোন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে কি-না সে বিষয়ে তিনি বলেন, আইনানুগ বিষয়গুলোকে এ্যাসেস করার জন্য আমাদের তালিকাভুক্ত একজন আইনজীবীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আলাদা কোন আইনজীবী নিয়োগ বা মামলা করার কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। সাংবাদিকদের প্রবেশে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমদের তদন্ত ও নিরাপত্তার স্বার্থে গত দুদিন আমরা সব মিডিয়াকে এন্টারটেইন করতে পারিনি। যে কোন সময়ে সব বিভাগে যাওয়ার যে সুযোগ ছিল সেটা দিতে পারিনি। আমাদের চিন্তা আছে যে নিচতলায় একটি কমিউনিকেশন সেন্টার করব। তার আগ পর্যন্ত প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড প্রদর্শন করে এবং নির্দিষ্ট রেজিস্টারে ডিটেইলস জানিয়ে যেতে পারবে। তবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া কর্মীরা ক্যামেরা নিয়ে আগাম অনুমোদন ব্যতিরেকে যেতে পারবেন না। অবশ্য সাংবাদিক ক্যামেরা রেখে যেতে পারবেন্। ব্যাংকের মুখপাত্র বা ঊর্ধতন কারও বক্তব্যের প্রয়োজন হলে পূর্বানুমতি লাগবে, তখন ক্যামেরা নিয়ে যেতে পারবে। সিকিউরিটি কনসার্নের ওপরে ক্যামেরাকে আমরা আলাদা রাখতে চাচ্ছি।

শ্রীলঙ্কার ৬ নাগরিকের ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ এ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় শ্রীলঙ্কার একটি এনজিওর ৬ পরিচালকের বিরুদ্ধে দেশ ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন দেশটির আদালত। দেশটির পুলিশের ধারণা, চুরি যাওয়া অর্থের কিছু অংশ ওই ছয় জনের কাছে গেছে। আদালতের নির্দেশনাটি শ্রীলঙ্কার ইমিগ্রেশন বিভাগ কার্যকর করবে বলে জানিয়েছেন বিভাগের মুখপাত্র লাকশান জয়সা। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশের পরিচালিত তদন্তের ওপর ভিত্তি করে রাজধানী কলম্বোর চীফ ম্যাজিস্ট্রেট গিহান পিলাপিটিয়া সোমবার নিষেধাজ্ঞাটি জারি করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ আদালতকে জানায়, শালিকা ফাউন্ডেশন নামের ওই সংস্থাটি গত ২৮ জুন কলম্বোর একটি বেসরকারী ব্যাংকে এ্যাকাউন্ট খোলে। এর মাত্র ৬ দিন পরই প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ এ্যাকাউন্ট থেকে ওই এ্যাকাউন্টটিতে জমা হয়। ওই ঘটনায় ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক করে এবং অর্থ ফেরত পাঠায়। শ্রীলঙ্কা পুলিশ জানায়, স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার উদ্দেশ্যে শালিকা ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়েছিল। এনজিওটির অফিস কলম্বোর একটি ভাড়া বাড়িতে অবস্থিত। এ ছাড়া ওই এনজিও সম্পর্কে আর কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ব্যাংকটি থেকে অর্থ ফেরত পাওয়া গেলেও বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার সহজেই বাংলাদেশ ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট থেকে ফিলিপিন্সের বিভিন্ন ব্যক্তিগত এ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিতে সফল হয় জালিয়াতরা।

রিজার্ভ জালিয়াতি নিয়ে কথা বলবেন মূল হোতা কিম অং ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরিতে মূল হোতা বলে অভিযুক্ত চীনা বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী কিম অং তদন্ত কমিটির শুনানিতে অংশ নিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি ঘটনা সম্পর্কে যতটুকু জানি তার কোন কিছ্বুই লুকাব না। রিজার্ভ চুরির ঘটনা তদন্তে ফিলিপিন্সে গঠিত সিনেটের ব্লু রিবন কমিটির শুনানিতে আগামী ২৯ মার্চ সকাল ১১টায় তিনি অংশগ্রহণ করবেন। বৃহস্পতিবার কিম অংয়ের উদ্বৃতি দিয়ে ফিলিপিন্সের পত্রিকা ইনকোয়্যার ডট নেটে এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে কিম অং বলেন, আমি কোথাও লুকায়নি। মেডিক্যাল চেকআপ শেষ করে গত রবিবার আমি সিঙ্গাপুর থেকে বেলা ৪টায় ফিলিপিন্সে পৌঁছেছি। তিনি আরসিবিসির শাখা ব্যবস্থাপকের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ধরে নিলাম, আরসিবিসির ‘উইলিয়াম গো’ এ্যাকাউন্ট থেকে পাচারকৃত অর্থের একটি অংশ উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু এত বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি শাখা ব্যবস্থাপক কেন এ্যান্টি মানিলন্ডারিং কাউন্সিলকে অবহিত করেননি? কিম অং জানান, ফিলিপিন্সের স্থানীয় মুদ্রায় ১.৩৭৪ বিলিয়ন পেসো সোলিয়ার ক্যাসিনোতে চলে যায়। চীনের এক বড় জুয়াড়ি এবং তার গ্রাহক এ অর্থ নিয়ে এসেছিল। বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে চুরি হয়ে যাওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলারের এটি একটি অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ১ বিলিয়ন পেসো তারই মালিকানাধীন ইস্টার্ন হাওয়াই লেইজার কোম্পানি লিমিটেডের এ্যাকাউন্টে জমা হয় এবং এ অর্থ ম্যানিলার মাইডাস হোটেল ক্যাসিনোতে শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তারই মালিকানাধীন হাওয়াই লেজার কোম্পানিতে এ অর্থ জমা হওয়ার বিষয়ে তার কোন কিছু করার ছিল না। কারণ এ অর্থ নিয়ে এসেছিল চীনের এক জুয়াড়ি।