মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

সোনার ফসলে ভরে গেছে মাঠ কৃষকের মুখে হাসি

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৬
সোনার ফসলে ভরে গেছে মাঠ কৃষকের মুখে হাসি

ফিরোজ মান্না/তাহমিন হক ববী, নীলফামারী থেকে ॥ ’আজি ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলারে ভাই।’ উজান থেকে প্রবাহিত তিস্তাপারের কৃষকদের জীবন এখন আনন্দে ঘেরা। যতদূর চোখ যায় চারদিকে সবুজ আর সবুজ। ধানের ক্ষেতে বাতাসের দোল। সঙ্গে ভুট্টাও কম যায়নি। কৃষকের মুখে একটাই কথা- এবার যে ফসল ফলেছে মাঠে তা যদি ঘরে উঠে তাহলে আর অভাব থাকবে না। মঙ্গা বলে পরিচিত নীলফামারীর দুঃখ ঘুচিয়ে দিয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ সেচপ্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ। শুষ্ক মৌসুমে এবারই প্রথম তিস্তায় এত জল; যার জন্য চারিদিকে কৃষক ও ফসলের হাসি।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরীগঞ্জ, সদর এলাকা ঘুরে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাদের মুখ থেকে সুখমিশ্রিত নানান কথা বেরিয়ে এসেছে। এত দিন যাদের সরকারের দান-অনুদানে ত্রাণের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হতো, আজ আর তাদের সেই পথপানে চেয়ে থাকতে হবে না। তিস্তা জীবন বদলে দিয়েছে তাদের। তিস্তাপারের মানুষ এখন স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। শুধু তিস্তাপারের নয়, তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকা দিনাজপুরের খানসামা, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, রংপুরের গঙ্গাচড়া, গঞ্জিপুর এখন সোনার ফসলে ভরে গেছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী বলেন, মূলত দেশের সর্ববৃহৎ সেচপ্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ খরিপ-২ মৌসুমের জন্য নির্মিত। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির অভাব দেখা দিলে কৃষকরা এ প্রকল্পের মাধ্যমে সেচ পাবেন, যাতে আমন ধান তারা পরিপূর্ণভাবে আবাদ করতে পারেন। তিনি বলেন, এতদিন খরিপ-১ মৌসুমে (রবি) তিস্তা নদীতে পানি সঙ্কটের কারণে কৃষকরা পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু এবার নদীতে পানি সঙ্কট নেই। ফলে নীলফামারী, দিনাজপুর ও রংপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত সেচ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে বোরো ক্ষেতসহ রবিশস্যে।

প্রকল্প এলাকায় প্রধান খাল, দ্বিতীয় খাল, মেজর খাল, শাখা খাল, সব খালেই এখন তিস্তার পানি বইছে। আর সেই পানিতে কৃষক মনের আনন্দে ফসলের জমিতে সেচ দিচ্ছে।

বোরো আবাদের এখন চলছে মুখ্য সময়। বেড়ে উঠছে ধানের সবুজ চারা। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ঘরে উঠবে এ ধান। এবার তিস্তা সেচপ্রকল্পের কমান্ড এলাকার কৃষকরা সুফল ভোগ করছেন। নদীর প্রবাহের সঙ্গে সেচপ্রকল্পের ৭১০ কিলোমিটারজুড়ে সকল সেচ ক্যানেল পানিতে টইটুম্বুর। গত কয়েক বছরে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ ছিল গড়ে ৩শ’ কিউসেক। এবার ঘটেছে ব্যতিক্রম। কোন দিন আড়াই হাজার কিউসেক পর্যন্ত নদীতে পানি এসেছে। তবে গড়ে পানিপ্রবাহ পাওয়া যাচ্ছে দেড় হাজার কিউসেক। কোন কোন সময় এক হাজার কিউসেকের নিচে নদীর পানি নেমে আসেনি। নদীতে পানি পাওয়া যাওয়ায় এবার তিস্তা সেচপ্রকল্পের কমান্ড এলাকার কৃষককুলের মাঝে তাদের চাহিদা মোতাবেক সেচ সরবরাহ করা হচ্ছে। তিস্তা সেচ ক্যানেলের ধারে দুন্দিবাড়ি গ্রামের কৃষক মোমেন আলী (৪৩) বললেন, বোরো আবাদে গত কয়েক বছর তিস্তার পানি চাহিদা মতো পাওয়া যায়নি। এবার সেচের জন্য কোন চিন্তা করতে হয়নি। তিস্তা সেচখাল পানিতে ভরে গেছে। এখন সেচের পানি রাখার জায়গা নেই। তিস্তাপারের ভাসানীর চরের নৌকা মাঝি হারুন (৪৮) বললেন, এবার শুষ্ক মৌসুমে নদীতে উজানের পানিপ্রবাহ থাকায় বড়-ছোট সব ধরনের নৌকা চালানো সম্ভব হচ্ছে।

নীলফামারী কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক গোলাম মোঃ ইদ্রিস বললেন, রংপুর কৃষি অঞ্চলের ৫ জেলা নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে এবার পাঁচ লাখ ২ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। অপরদিকে ভুট্টা আবাদ হয়েছে ৬৮ হাজার ১৬০ হেক্টরে। এছাড়াও গম, মরিচ, পেঁয়াজ, মিষ্টি কুমড়াসহ অন্যান্য ফসলের বাম্পার ফলন হয়েছে।

ভুট্টার ব্যাপক ফলনের বিষয়টি তিনি উল্লেখ করে বলেন, মানুষের খাদ্য ছাড়াও ভুট্টার চূর্ণদানা হাঁস-মুরগির পুষ্টিকর খাবার হিসেবে বহুল ব্যবহৃত খাদ্য। ভুট্টার মোচা সংগ্রহের পর ভুট্টা গাছ কাঁচা অবস্থায় ঘাসের বিকল্প এবং শুকনো অবস্থায় খড় হিসেবে গবাদিপশুর উত্তম খাদ্য। এছাড়াও ভুট্টার শুকনো গাছ, মোচার খোসা ও মোচার দানা ছাড়ানোর পর অবশিষ্টাংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ভুট্টা দেশের সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। উন্নত বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ভুট্টার উৎপাদন বাড়ালে আমাদের খাদ্য যোগান বাড়বে।

উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা শব্দটি মৃত প্রায়

দিন আসে, দিন যায়, তার ফাঁকেই ইতিহাস ঢুকে পড়ে। এক সময়ের মঙ্গাপীড়িত রংপুর অঞ্চলের মঙ্গা এখন ভুলে যাওয়া এক শব্দ। ফসলের বহুমুখীকরণ দিন বদলে দিচ্ছে।

ধানের আবাদ অল্পকিছু কমলেও বেড়েছে সবজি ও মসলা জাতীয় ফসলের আবাদ। আলু এবং ভুট্টায় কৃষক এখন আলোয় উদ্ভাসিত। এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রংপুর কৃষি অঞ্চলের ৫ জেলায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। বাম্পার ফলনের পাশাপাশি বাজারমূল্য ভাল পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। অন্যান্য বছরের মতো বীজ, সার, কীটনাশকের সঙ্কট তো নয়ই, বরং ছিল না কোন রোগবালাই আর ঘনকুয়াশায় ঢাকা প্রকৃতিরও কোন বিরূপতা। এতেই যেন সোনা হয়ে দেখা দিয়েছে সব তরিতরকারির সঙ্গে মিশে যাওয়া এ গোল আলু।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুপ্রধান এ রংপুর অঞ্চলে এবারই প্রথম এমন বাম্পার ফলন হয়েছে। বাজারমূল্য অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশ ভাল থাকায় কৃষকরা এখন বেজায় খুশি। তারা বলছেন, এমন দাম পেলে আগামীতেও তারা আলু আবাদে আরও বেশি উৎসাহিত হবেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, এবারের প্রকৃতিতে শীত-কুয়াশা না থাকার কারণেই উৎপাদন যেমন ভাল হয়েছে, তেমনি ভাল দাম পাচ্ছেন কৃষকরা। সব মিলিয়ে এবার আলু যেন সোনা হয়ে দেখা দিয়েছে কৃষকের ক্ষেতে।

রংপুরের আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় ৯১ হাজার ৯২১ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কৃষকরা নিজেরাই তা বাড়িয়ে নিয়ে যায় ৯৪ হাজার ১৬০ হেক্টরে। এ পরিমাণ জমি থেকে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৮ লাখ ৬ হাজার ২৪৮ মেট্রিক টন।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ রংপুর অঞ্চলের উদ্যান বিশেষজ্ঞ খোন্দকার মোঃ মেসবাহুল ইসলাম জানান, এখনও পুরোপুরি আলু উত্তোলন করা শেষ হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে এবার উৎপাদন ২০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলায় এখনও বেশকিছু জমিতে আলু রয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, কৃষকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে আলু উত্তোলনের উৎসবে মেতে উঠেছে। তারা জানালেন, অন্যান্য বছর ৮০ কেজির আলুর বস্তা জাত ভেদে বিক্রি হতো ৪ থেকে ৬শ’ টাকা দরে। কিন্তু এবার তা বিক্রি হচ্ছে ৭শ’ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। এ কারণে কৃষক ও উৎপাদনকারীরা বেজায় খুশি। তাদের ধারণা দাম আরও বাড়বে। আর এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে আলু আবাদে আরও বেশি উৎসাহিত হবেন তারা। এবার কার্ডিনাল, ডায়মন্ড, গ্রানুলা, এস্টারিক্স জাতের আলু বেশি আবাদ হয়েছে।

রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ৫৮টি উপজেলার কৃষকরা এখন কোন জমি আর পতিত ফেলে রাখছেন না। এক সময় মঙ্গা নামক এক দুঃসহ কাল কাটাতেন তারা। ফসল নেই, কাজ নেই, নেই খাবার। তখন তারা কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যেতেন। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। এ অঞ্চলের কৃষকরা মনে করছেনÑ এমন দিন আসবে এখানেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কাজের সন্ধানে মানুষ আসবেন।

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৬

২৫/০৩/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: