২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ॥ পরিচালকরা কিছুই জানলেন না তা কী করে হয়?


বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ডলার রিজার্ভের’ টাকা চুরি হওয়ার ঘটনায় কর্তব্যে অবহেলার জন্য ব্যাংকিং সচিবকে ‘ওএসডি’ করা হয়েছে। একেই বলে ‘উপরওয়ালার বিচার’। যে প্রেসক্রিপশন ব্যাংকিং সচিব ব্যাংকিং বিভাগে থাকাকালে করতেন সেই একই প্রেসক্রিপশনে তিনি শাস্তি পেলেন। কোন ব্যাংকে কোন অনিয়ম হলে তিনি ও তার বিভাগ বলত এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বোর্ডকে দায়িত্ব নিতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে পরিচালকদেরকেও। সেই মর্মে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ ও সই করা শুরু হয়েছে। কোন ব্যাংকে কোন জালিয়াতি, দুর্নীতি হলে বলা হতো পরিচালকরা কিছুই জানে না তা হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনায় তার শাস্তিমূলক ট্রান্সফার হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য পরিচালক যারা ছিলেন তাদের কিছুই হয়নি। তারা সসম্মানে স্বাভাবিক নিয়মে অবসর নিয়েছেন। আশ্চর্য এত বড় ঘটনা ‘মিডিয়া’ও কিছু বলল না। অথচ সাধারণত কোন ব্যাংকে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে মিডিয়া পরিচালকদের দায়ী করে অনেক কথা লিখত। অবশ্য এক্ষেত্রে প্রধান নির্বাহী যিনি আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডের চেয়ারম্যানও বটে সেই গবর্নর ড. আতিউর রহমান নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। দ্বিতীয় কথা যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনায় পরিষ্কার হয় তা হচ্ছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা বা দৈনন্দিন কাজে নিয়োজিত প্রধান নির্বাহী যদি কোন দুর্ঘটনার কথা বোর্ডকে না জানায় তাহলে বোর্ডের পক্ষে তা জানা খুবই কঠিন। বাংলাদেশ ব্যাংকে যা ঘটেছে সেই ঘটনার পর ব্যাংকে বোর্ড সভা হয়েছে, অডিট কমিটির সভা হয়েছে কিন্তু পরিচালকদের কিছুই জানানো হয়নি এ কথা সাবেক ব্যাংকিং সচিব ‘মিডিয়ায়’ বলেছেন। দুঃখের বিষয় তার শাস্তিমূলক ট্রান্সফারের মাধ্যমে তিনি বুঝলেন যে, প্রধান নির্বাহী না জানালে কোন দুর্নীতির বিষয় জানা কঠিন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ জানে মিডিয়ার রিপোর্ট দেখে। উপস্থিত ইস্যুতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের জনগণ এত বড় ঘটনা জেনেছে বিদেশী কাগজের রিপোর্ট দেখে। আমি অবাক হই ভেবে, যে মিডিয়া প্রতিদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর স্টোরি করে, ফ্লোরে ফ্লোরে মিডিয়ার লোকজন ঘুরে তারা আমাদের কিছুই জানাতে পারল না। এটা কী শুধু ‘স্পন্সরড’ স্টোরির প্রতি আমাদের মিডিয়ার একাংশের বন্ধুদের আকর্ষিত থাকার কারণে ঘটল? প্রশ্নটি রাখলাম। আরেকটি ইস্যু এখানে জড়িত। ব্যাংকিং সচিব যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী না জানালে কিছুই না জানেন তাহলে ‘ব্যাংকিং বিভাগ’ রাখার উপযোগিতা কী? বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব আইনেই দেয়া আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ এবং ব্যাংক কোম্পানি এ্যাক্ট ১৯৯১ দ্বারাই ব্যাংকগুলো শাসিত। শাসনের সমস্ত ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের। সেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আরেকটি বিভাগ তৈরির প্রয়োজনীয়তা কী? শত হোক আইনী দায়িত্ব তো প্রশাসনিক অর্ডারের মাধ্যমে নিয়ে নেয়া যায় না। আরও কথা ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই বিভাগটি ছিল না। যদি বা তা করা হলো, বাস্তবে যদি কার্যকর না হয় অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের বিভাগ যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর কর্তৃত্ব খাটাতে ব্যর্থ হয় তাহলে এই বিভাগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিষয়টি সরকার ভেবে দেখবে আশা করি।

ওপরের বিষয়টি যেমন ভেবে দেখা দরকার, তেমনি অভাবনীয় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গবর্নর ফজলে কবির দায়িত্ব নেয়ায় আরও দুয়েকটি কথা বলা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক তার মূল দায়িত্ব পালনে অধিকতর যতœশীল হবে এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। জনসংযোগ তাদের দরকার আছে, কিন্তু তা মাত্রার বাইরে গেলে বাজারে কথা উঠবে। এটা তাদের পরিহার করা উচিত। দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটা, গবর্নরও একজনই। অন্যদিকে ডজন ডজন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে। গবর্নরের ওজন গবর্নরই রাখবেন। অতিকথন তার দরকার নেই, আবার নির্বাক গবর্নরেরও দরকার নেই। তবে গবর্নরের কথা এমন হবে যা নিয়ে মানুষ ভাববে, গবেষকরা পথ পাবে। আর গবর্নর একজন সুলভ মানুষও নন। এসব অনেক কথা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে এই মুহূর্তে অন্যটি। আমি বহুদিন যাবত লিখছি যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত মূল কাজে মনোনিবেশ করা এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে রেহাই নেয়া। অনেক কাজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আছে যা ইচ্ছা করলেই অন্যত্র সরিয়ে দেয়া যায়, এতে কোন অসুবিধে হয় না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোনিবেশ করতে পারে। উদাহরণ দিই। যেমন ‘ক্লিয়ারিং কাজ’ যার মাধ্যমে এক ব্যাংকের চেক অন্য ব্যাংক ক্লিয়ারের ব্যবস্থা করে। এই কাজটি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিজস্ব। এই কাজ কেন্দ্রীয় ব্যাংক না করলেও পারে। এর জন্য একটা আলাদা সংস্থা করা যায়। তার থাকবে আলাদা প্রশাসন। এতে জড়িত থাকবে সকল ব্যাংক। তারাই তার ব্যবস্থাপনায়, নীতি প্রণয়নে অংশগ্রহণ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেখানে উপদেশ, পরামর্শ যোগান দেবে। গাইডলাইন তৈরি করে দেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব মেনেই ওই সংস্থা কাজ করবে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কাজ কমবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার মূল কাজে অধিকতর সময় দিতে পারবে। দ্বিতীয় আরেকটি কাজ আছে যার জন্যও আলাদা ব্যবস্থা করা যায়। যেমন ‘ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো’ (সিআইবি)। এই কাজটিও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুবিধার জন্য। কোন গ্রাহক কোন ব্যাংকের খেলাপী ঋণগ্রহীতা তা জানার বাহন হচ্ছে ‘সিআইবি’। সিআইবির ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোন ব্যাংক ঋণ প্রসেস হয় না। এই কাজটির জন্যও আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। এর মালিকানা, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রণ ব্যাংকগুলোর হাতে থাকতে পারে। তবে তা অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন মোতাবেক চলবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ-আদেশ তারা মানতে বাধ্য থাকবে।

আমি এই সুপারিশগুলো করছি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ কমিয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে তাকে সহায়তা দেয়ার জন্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুহূর্তে অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে শ্রেণী বিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা। এই সমস্যাটি ব্যাংকিং খাতকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। বহু বদনামির ভাগীদার হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও। এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য দুটো জিনিস দরকার। প্রথমত অর্থঋণ আদালতের সংস্কার। এই আইনটিতে বহু বাধা আছে ব্যাংকের জন্য। ব্যাংক দ্রুত কোন সিদ্ধান্ত পায় না আদালতের কাছ থেকে। দ্বিতীয় বাধাটি হচ্ছে ‘রিট পিটিশন’। উচ্চতর আদালতে বড় বড় গ্রাহকের ‘রিটের’ ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের আটকে আছে। এই বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। একটি-দুটি বিশেষ বোর্ড দরকার। বিচারক দরকার। নিয়মিত হিয়ারিং দরকার। গবর্নর মহোদয় মাননীয় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলে বিষয়টিতে তার সাহায্য চাইতে পারেন। এই রিটের কারণে ব্যাংকগুলো অসহায়ের মতো সময় কাটায়। দীর্ঘদিন মামলাগুলো আটকে থাকায়, রিটগুলো পেন্ডিং থাকায় ব্যাংকারদের মধ্যেও এক ধরনের অলসতা দেখা দেয়। এই দুটো বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে গবর্নর মহোদয় ব্যাংকিং খাতের উপকার করতে পারবেন। আর শেষে বলব নিজের ঘরের কথা। অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতা আনা দরকার। ‘এ্যাডমিনিস্ট্রেশন শুড লুক টু বি ফেয়ার’। অনেক সময় প্রশাসনে জঞ্জাল জমে। ‘সিবিএ’ও বাধা হয়। সতর্কতার সঙ্গে এই বিষয়গুলো ফয়সালা করা দরকার। জরুরি ভিত্তিতে ঘরটা গুছিয়ে ফেলতে পারলে নতুন গবর্নরের কাজে গতি আসবে।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক ঢাবি