২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ঐতিহাসিক জনতার মঞ্চের বিশ বছর পূর্ণ হলো আজ


তপন বিশ্বাস ॥ জনতার মঞ্চের বিশ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রহসনের নির্বাচনের প্রতিবাদে ২৩ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তৎকালীন ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই মঞ্চ। শুরু হয় আন্দোলন। প্রথমে সাধারণ মানুষ এবং পরে জনতার মঞ্চে শামিল হয় রাজনৈতিক দল, সরকারের আমলাসহ সকল পেশাজীবী সংগঠন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের প্রবল আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার সংসদে তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের বিল পাস করে পদত্যাগে বাধ্য হয়।

১৯৮১ থেকে গণতন্ত্রের দাবিতে দীর্ঘ নয় বছরের ৈ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে? এরশাদ সরকারের পতনের পর সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন? সাহাবুদ্দিন আহমেদের অধীনে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ আনেন। তিনি এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে শপথ গ্রহণ করেন। সেই থেকে পঞ্চম সংসদের যাত্রা শুরু হয়। বিএনপি সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠে। মাগুরার উপনির্বাচনে কারচুপি প্রাতিষ্ঠানিক রূপলাভ করলে ভবিষ্যত জাতীয় নির্বাচনে নিরপেক্ষতা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। দাবি ওঠে তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে। ক্ষমতাসীন বিএনপি এই দাবিকে অসাংবিধানিক আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করলে শুরু হয় আন্দোলন।

সংসদে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ১৯৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে উত্থাপন করে। ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন সংসদ ভবনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে? তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই রূপরেখাকে অসাংবিধানিক ও অবাস্তব বলে ঘোষণা করেন?। বেগম জিয়া বলেন, একমাত্র পাগল ও শিশু ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়। শুরু হয় আন্দোলন। দেশী-বিদেশী নানা উদ্যোগ ব্যর্থ হয় সমঝোতা প্রতিষ্ঠায়।

৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪ আওয়ামী লীগ, জামায়াত আলাদা সমাবেশ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়? সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকায় ২৮ ডিসেম্বর বিরোধী দলের ১৪৭ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগপত্র পেশ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি স্পীকার তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণযোগ্য নয় বলে রুলিং দেন। ১৯৯৫ সালের ১৯ জুন বিরোধী সংসদ সদস্যদের পরপর ৯০ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিতি পূর্ণ হয়। ৩১ জুলাই ১৯৯৫ সংসদ সচিবালয় থেকে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যের আসন শূন্য বলে ঘোষণা করা হয়? নির্বাচন কমিশন ১৪২টি শূন্য আসনে উপ-নির্বাচনের ঘোষণা দিলে বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়? ৬ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা আবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন।

প্রধানমন্ত্রী আবারও এই প্রস্তাব অসাংবিধানকি ও অযৌক্তিক বলে বাতিল করে দেন? তিনি বিরোধী দলগুলোকে আলোচনার আহ্বান জানালে বিরোধী দল প্রত্যাখ্যান করে ? ১৯৯৫ সালের ১৬ নবেম্বর থেকে টানা ৭ দিন হরতাল পালিত হয় ? হরতাল-অবরোধে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চরম দুরবস্থার মুখোমুখি হয়? সরকার উপ-নির্বাচনে না গিয়ে ২৪ নবেম্বর জাতীয় সংসদ ভেঙ্গে দেয় এবং তিনবার পরিবর্তন করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত করে। সকল বিরোধী দল এ নির্বাচন বর্জন করলে দেশে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়? শুরু হয় হরতাল-অসহযোগ। এক চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ৩ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণে খালেদা জিয়া ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল আনার ঘোষণা দেন? প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় ষষ্ঠ সংসদ বাতিল ও পদত্যাগ সম্পর্কে কোন কথা না থাকায় বিরোধী দলগুলো তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে এবং অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে? সারা দেশে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা শুরু হলে সরকার ২১ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল সংসদে উত্থাপন করে?

২৩ মার্চ প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিষ্ঠা হয় জনতার মঞ্চ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ প্রতিষ্ঠা করেন এই মঞ্চ। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা চলে এই অবস্থান। জনতার মঞ্চে একে একে শরিক হয় বিএনপি ছাড়া দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল, আমলা, পেশাজীবী এবং সাধারণ মানুষ। মঞ্চে বক্তৃতার পাশাপাশি চলে বিপ্লবী সঙ্গীত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েক দফা চেষ্টা করা হয় মঞ্চ ভেঙ্গে অবস্থান উঠিয়ে দেয়ার। জনতার প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আর সাহস পায়নি। ২৬ মার্চ সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল জাতীয় সংসদে পাস করে? ২৮ মার্চ সচিবালয়ের ভেতরে ১৪৪ ধারা জারি করে এবং সচিবালয়ের ভেতরে-বাইরে সেনাবাহিনী, পুলিশ মোতায়েন করেও বিক্ষুব্ধ সচিবালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ব্যর্থ হয়? পরে ২৬ মার্চ সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল জাতীয় সংসদে পাস করে? প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয় এবং খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন? রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন?

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: