১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

নিরাপদ ভেবে জঙ্গীরা বেছে নিয়েছে উত্তরাঞ্চলকে


নিরাপদ ভেবে জঙ্গীরা বেছে নিয়েছে উত্তরাঞ্চলকে

শংকর কুমার দে ॥ দেশের উত্তরাঞ্চল জোন তৈরি করে ফের তৎপরতা শুরু করেছে বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের জঙ্গীরা। জঙ্গী তৎপরতা চালাতে তৈরি করেছে জঙ্গী কমান্ড। রাজধানী ঢাকার চেয়ে অধিকতর নিরাপদ ভেবে উত্তরাঞ্চলকেই বেছে নিয়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালাচ্ছে জঙ্গীরা। উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রামে গাড়িয়ালপাড়ায় বাড়ির সামনের সড়কে ধর্মান্তরিত খ্রীস্টান হোসেন আলীকে কুপিয়ে হত্যা করে আবারও জঙ্গী তৎপরতার জানান দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছে জঙ্গী গোষ্ঠী। যদিও ইসলামিক স্টেট বা আইএসের নামে কোন জঙ্গী সংগঠনের তৎপরতা নেই তথাপি মঙ্গলবার ধর্মান্তরিত খ্রীস্টানকে হত্যার পরের দিনই বুধবার এই হত্যার দায় স্বীকার করে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের নামে বিবৃতি পাঠিয়ে উত্তরাঞ্চলভিত্তিক জঙ্গী গোষ্ঠীর তৎপরতার ইঙ্গিত স্পষ্ট করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানান, মঙ্গলবার সকালে কুড়িগ্রাম শহরের গাড়িয়ালপাড়ায় বাড়ির সামনের সড়কে হোসেন আলীকে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগে পুলিশ পাঁচজনকে আটক করেছে। মোটরসাইকেলে করে আসা তিন দুর্বৃত্ত ঘটনার পর ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পালিয়ে যায়। ধর্মান্তরিত খ্রীস্টান হোসেন আলীকে যেভাবে মোটরসাইকেলযোগে এসে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ঠিক একই কায়দায় মোটরসাইকেলযোগে এসে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ঢাকায় ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা, রংপুরে জাপানী নাগরিক হোশি কুনিও ও পঞ্চগড়ে দেবীগঞ্জ উপজেলায় মঠপ্রধান যজ্ঞেশ্বরকে হত্যা এবং দিনাজপুরে খ্রীস্টান ধর্মযাজককে হত্যার চেষ্টা করে। প্রতিটি ঘটনায় একটি মোটরসাইকেলে তিনজন করে দুর্বৃত্ত অংশ নেয়।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রের তথ্যানুযায়ী গত ছয় মাস ধরে উত্তরাঞ্চলকে ঘিরে অন্তত এক ডজন ভিন্নমতাবলম্বীর ধর্মীয় উপাসনালয়, মন্দির, মসজিদ, গির্জায় যেসব হামলা করেছে জঙ্গী গোষ্ঠী। এতে ছয়জন নিহত ও দেড় শতাধিক নিরীহ নির্দোষ মানুষজনকে আহত করেছে তারা। এর মধ্যে হামলার শিকারে পরিণত হয়েছে, কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের আহমদিয়া মসজিদ, হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের গির্জাগুলোতে হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চল বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর গ্রামে গত ২৬ নবেম্বর শিয়া মুসলিমদের আল মোস্তফা মসজিদে দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে মসজিদের মুয়াজ্জিন নিহত ও তিনজন আহত হন। দিনাজপুরের কাহারোলে হিন্দু সম্প্রদায়ের কান্তজিউ মন্দিরে হামলা হয়েছে গত ৪ ডিসেম্বর এবং গত ১০ ডিসেম্বর দিনাজপুরে ইসকন মন্দিরে হামলা হয়। রাজশাহী জেলার বাগমারার শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের সৈয়দপুর চকপড়া আহমাদিয়া জামে (কাদিয়ানি) মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে অজ্ঞাত এক যুবক নিহত এবং আহত হন ১০ জন। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার রোমান ক্যাথলিক গির্জার যাজক কার্লুস বাবু টপ্প্যর মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নামে হত্যার হুমকি দেয়া হয় গত ডিসেম্বরে। এসএমএস পাঠানোর পরের দিন ডাকযোগে চিঠি পাঠিয়ে রংপুরের রাধাবল্লভ এলাকার ব্যাপ্টিস্ট চার্চের ফাদার রেভারেন্ড বার্নাবাসসহ রংপুরের বিভিন্ন গির্জায় কর্মরত ১২ যাজককে হত্যার হুমকি দেয়া হয়।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলজুড়ে ধারাবাহিকভাবে এ রকম হত্যা, হত্যাচেষ্টা বা হুমকি দেয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রায় প্রতিটি হামলার ধরন এক। জঙ্গীরা মোটরসাইকেলে করে এসে টার্গেট করা ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালিয়ে পালিয়ে গেছে। পরে আইএসের নামে দায় স্বীকার করা হয়েছে। একের পর এক এ রকম ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশী নাগরিক এবং ভিন্নমত ও ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিদের ওপর হামলা হচ্ছে। এসব ঘটনার নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, মাঝে কিছুদিন চুপচাপ থাকলেও উত্তরাঞ্চল ঘিরে আবারও সংগঠিত হয়েছে জঙ্গীরা। তারাই একের পর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, লোকজনকে হুমকি দিচ্ছে।

পুলিশের রেকর্ড থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুর এসপির কার্যালয়ে গ্রেনেড বিস্ফোরণের পর গ্রেফতার জেএমবি সদস্য নাসরিন আক্তার, মাসুদ রানা, আতিকুর রহমান ও জাহিদ হাসান উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা। তাদের বাড়ি গাইবান্ধা, বগুড়া ও দিনাজপুরে। এর আগে গ্রেফতার মামুনুর রশীদের বাড়িও গাইবান্ধার সাঘাটায়। ২০০৫ সালের আগে ২০০৩ সালের ১৪ আগস্ট জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর মহেশপুর গ্রামে জঙ্গীদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ হয় পুলিশের। সে সময় তিন পুলিশ সদস্যকে জখম করে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়েছিল জঙ্গীরা। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে বোমা ফাটিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল জেএমবি। রাজশাহীর বাগমারায় ঘাঁটি গেড়ে পুলিশের উপস্থিতিতে জঙ্গীদের নিয়ে ট্রাকযোগে মিছিল করেছিল ছিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই। ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ ছয়জনকে ফাঁসি দেয়া হয়। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে অনেকবার বলা হয়েছে, জেএমবি দুর্বল হয়ে গেছে। তারা আর মাথা তুলতে পারবে না। তবে ১০ বছর পর সেই জেএমবি নিয়েই এখন আবার ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে আইএস নেই। মূলত দেশীয় বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন হামলার ঘটনা ঘটিয়ে আইএসের নামে চালানোর চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে সম্প্রতি বেশিরভাগ ঘটনাতেই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের যোগসূত্র রয়েছে। উত্তরাঞ্চলকে নিরাপদ হিসেবে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার জন্য বেছে নিয়েছে জঙ্গী সংগঠনগুলো বিশেষ করে জামা‘আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। উত্তরাঞ্চলের লোকজন তুলনামূলক সহজ-সরল, দরিদ্র ও ধর্মভীরু হওয়ায় জঙ্গীরা এসব এলাকায় নাশকতা চালিয়ে আত্মগোপন করে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। এখানকার বিভিন্ন দুর্গম এলাকা ঘিরে তাদের সদস্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ দেয়ার সুযোগ নিচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে তৎপর হয়ে ওঠা জঙ্গী সংগঠনের শতাধিক আত্মঘাতী সদস্য পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি এড়াতে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে আছে। বয়সে তরুণ হওয়ায় তাদের শনাক্ত করা গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন স্থানে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গী সদস্যদের বাড়িও উত্তরাঞ্চলে। পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে হামলা, গাবতলীতে চেকপোস্টে হামলাকারীরাও এই অঞ্চলের। ইতোমধ্যে পাবনা, বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় জঙ্গী হামলা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালানো হয়েছে। দেশী-বিদেশী অর্থায়নে চলছে জেএমবির কর্মকা-। উত্তরাঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের ক্যাডার রয়েছে। তাদের একজন নিহত হলে আরেকজন সংগঠনের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কর্মকা-ই প্রমাণ করছে যে জঙ্গী সংগঠনটি ফের পুনর্গঠিত হচ্ছে।