মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২১ আগস্ট ২০১৭, ৬ ভাদ্র ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

স্বাধীন বাংলা বেতারের বস্তু নিদর্শন, দুর্লভ নথি অন্য রকম শিহরণ

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০১৬
স্বাধীন বাংলা বেতারের বস্তু নিদর্শন, দুর্লভ নথি অন্য রকম শিহরণ
  • বিশেষ প্রদর্শনী কক্ষ জাতীয় জাদুঘরে

মোরসালিন মিজান ॥ বাঙালীর মুক্তিসংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস। এই ইতিহাসের চমকপ্রদ অধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। একাত্তর সালের প্রতিকূল সময়ে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিল রেডিও স্টেশনটি। সেই অবদানের কথা বিবেচনায় রেখে জাতীয় জাদুঘরে প্রতিষ্ঠা করা হলো বিশেষ প্রদর্শনী কক্ষ। বুধবার এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। হঠাৎ উদ্যোগ। তড়িঘড়ি বাস্তবায়ন। এর পরও সীমিত পরিসরে সুন্দর একটি ফিরে দেখা। স্বাধীন বাংলা বেতারে ব্যবহৃত সামান্য নিদর্শন এখানে অসামান্য হয়ে ধরা দিচ্ছে। দুর্লভ নথিগুলো খুঁটিয়ে পড়তে পড়তে মনের ভেতরে, আহা! কত যে অনুভূতির জন্ম হয়।

জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরতেই এমন উদ্যোগ। এর আগে জাতীয় জাদুঘরের চারটি গ্যালারিকে নতুন করে সাজানো হয়েছিল। ইতিহাসের ধারবাহিকতায় সাজানো গ্যালারিগুলোর একটিতে যুক্ত হয়েছে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রদর্শনী কক্ষ’। গ্যালারি নম্বর ২৮। এখানে একটি কোণ্ বেছে নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে । কক্ষের ভেতরের দেয়ালে বিভিন্ন বস্তু নিদর্শন ও নথি। বিশেষ করে নথিগুলো দেখে বাঙালী মাত্রই আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবেন। সেসব খাতা, হাতে লেখা কাগজের পৃষ্ঠা এখনও অবিকল! ফেলে আসা সময়টিকে এই সময়ে দাঁড়িয়ে পড়ে নেয়া যায়! এ এক আশ্চর্য অনুভূতি। উদাহরণ হতে পারে এমআর আক্তার মুকুলের ‘চরমপত্র’। নিজের লেখা নিজেই পাঠ করতেন তিনি। সেই ‘চরমপত্র’র পা-ুলিপি স্থান পেয়েছে প্রদর্শনী কক্ষে। ঢাকাইয়া উচ্চারণে, অত্যন্ত সরস ভঙ্গিতে মুকুল মুক্তিবাহিনীর বিজয় ও পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের কাহিনী লিখেছিলেন। পাঠ করেছিলেন। সেই পা-ুলিপি যেমন রাখা হয়েছে তেমনি ট্যাবে শোনা যাচ্ছে তার সেই কণ্ঠ।

একাত্তরের শব্দসৈনিক ও পথিকৃৎ সাংবাদিক তোয়াব খান লিখতেন ‘পি-ির প্রলাপ’। আবু তোয়াব খান নামে লেখা তীক্ষè বিদ্রƒপাত্মক রম্য কথিকা স্বাধীন বাংলা বেতারে নিয়মিত প্রচার হতো। এর মাধ্যমে পাকিস্তানী গণমাধ্যমের অপপ্রচারের জবাব দেয়া হতো। সেই ‘পি-ির প্রলাপ’র মূল কপি রাখা হয়েছে প্রদর্শনী কক্ষে। সাদা পূর্ণ পৃষ্ঠায় সুন্দর হাতের লেখা! এখনও পড়া যায়। স্বাধীন বাংলা বেতারের আরেক সংগঠক সাংবাদিক কামাল লোহানী। তার নিজ হাতে লেখা সংবাদ বুলেটিনের মূল কপি প্রদর্শন করা হচ্ছে এখানে। আছে বেতারে প্রচার করা বেশ কয়েকটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কপি। একটিতে অর্থমন্ত্রী মনসুর আলীর বার্তা। এতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পাকিস্তানী ষড়যন্ত্র রুখে দাঁড়াতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান। ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীরা উদ্যোগী হয়ে ১ হাজার ১ টাকা চাঁদা সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছিলেন। সেই বার্তা প্রচার করা হয়েছিল বেতার থেকে। আছে সেই কপি। অনেকে টেলিগ্রাম করে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানাতেন। সেই টেলিগ্রামের কপি আছে প্রদর্শনী কক্ষে। কলকাতা বার এ্যাসোসিয়েশনের একটি চিঠি আছে।

প্রদর্শনী কক্ষে আছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিদিনের অনুষ্ঠান সূচীর মূল নথি। নথিতে কোন্ অনুষ্ঠান কোন্ সময়ে প্রচার হবে, তার উল্লেখ। নথি পাঠ করে বহুল প্রশংসিত অনুষ্ঠানগুলোর নাম পাওয়া যায়। ‘চরমপত্র’, ‘জল্লাদের দরবার’, ‘মুক্তিযুদ্ধের গান’, ‘যুদ্ধক্ষেত্রের খবরাখবর’, ‘রণাঙ্গনের সাফল্য কাহিনী’, ‘বজ্রকণ্ঠ’, ‘রক্তের আখরে লিখি’ ইত্যাদি শিরোনাম এখনও কেমন যেন শিহরণ জাগায় মনে। স্বাধীন বাংলা বেতারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নামের তালিকাসমৃদ্ধ একটি রেজিস্ট্রার আছে প্রদর্শনী কক্ষে। তাদের ব্যবহৃত এক সেট চায়ের কাপও ধারণ করে আছে সময়টিকে!

স্বাধীন বাংলা বেতারের গানের কথা বলাই বাহুল্য। সেসব গানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে শিল্পীদের ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র বাঁশি ও জিপসি। ব্যবহৃত নিদর্শনের মধ্যে আরও আছে মুখ্য অনুষ্ঠান সমন্বয়ক শামসুল হুদা চৌধুরীর ডায়েরি। রেক্সিনের কভারযুক্ত ডায়েরির প্রথম পাতাটি ওল্টানো আছে। সেখানে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে ‘১৯৭১’। আছে বেশ কিছু আলোকচিত্র। সাদাকালো আলোকচিত্রে কলকাতায় অবস্থিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঐতিহাসিক ভবন, শিল্পীদের পরিবেশনা। স্বাধীন বাংলা বেতারের ওপর লেখা কয়েকটি বইও রাখা হয়েছে একটি ওয়াল শোকেসে। দেয়ালে চমৎকারভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে ৬টি ট্যাব। এসব ট্যাবের স্ক্রিনে ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র, সাক্ষাতকার ইত্যাদি প্রচার হচ্ছে। সব মিলিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রদর্শনী কক্ষ।

এর আগে বিকেলে প্রদর্শনী কক্ষের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব বেগম আকতারী মমতাজ, শব্দসৈনিক ফকির আলমগীর ও প্রদর্শনী কক্ষ নির্মাণে সহায়তাদানকারী টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি এম আজিজুর রহমান।

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০১৬

২৪/০৩/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: