১১ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আইপিওতে আসার আগেই এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন


অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ আগামী ১১ এপ্রিল থেকে আইপিও আবেদন শুরু করতে যাওয়া একমি ল্যাবরেটরিজ আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশ এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড না মেনে বা লঙ্ঘন করে পুঁজিবাজার থেকে ৪২৬ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) গণনাতেও গরমিল করেছে। এছাড়া কোম্পানিটি প্রাইভেট প্লেসমেন্টে কম দামে ৫২ টাকায় শেয়ার বিক্রি করলেও বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করছে ৮৫ দশমিক ২০ টাকায়। বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়াতে দর প্রস্তাবেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কারসাজিও কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে বিনিয়োগ কতটা যুক্তিযুক্ত না নিয়ে প্রশ্ন করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বাদ দেয়ার আবেদন জানিয়েছেন। বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজানুর রহমান রশীদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে এই আবেদন জানানো হয়। এই আবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছর ধরে পুুঁজিবাজারে দরপতন চলছেই। এই পরিস্থিতিতে একমির মতো কোম্পানিতে এত টাকা প্রিমিয়াম কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির শিকার হবেন। তাই অবিলম্বে কোম্পানির অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বাদ দিয়ে নতুন করে আইপিও অনুমোদন দেয়া উচিত।

অন্যদিকে কোম্পানিটির প্রসপেক্টাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আইপিওতে আসার আগেরই এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড মানেনি কোম্পানিটি। বাংলাদেশ এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (বিএএস)-৩৩ অনুযায়ী, কোন বছরের শেষে যে পরিমাণ শেয়ার থাকবে তার ওয়েটেড দিয়ে ইপিএস গণনা করতে হয়। এ হিসাবে কোম্পানিটির ২০০৯-১০ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয় ২২.৭৮ টাকা। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ইপিএসে ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে ১.৯৬ টাকা ইপিএস দেখিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০০৯-১০ অর্থবছরের শেষে একমির ১ কোটি শেয়ার ছিল।

এরপরে ২০১৩ সালের ২৬ নবেম্বর একমি ল্যাবরেটরিজ একীভূত হয়। আর একটি করতে গিয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকার শেয়ার বাজারে ছাড়ে করে। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ইপিএস গণনায় ৩১ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখ বিবেচনায় নিয়ে ইপিএস গণনা করেছে। ফলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বেশি ইপিএস দেখিয়েছে।

বাংলাদেশ এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (বিএএস)-১৬ অনুযায়ী, ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অবচয়যোগ্য সম্পদ। কিন্তু একমি ল্যাবরেটরিজের এই সম্পদ থাকলেও অবচয় চার্জ করা হয় না। এতে কোম্পানিটি নিয়মিতভাবে সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখিয়ে আসছে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুর রহমান (এফসিএমএ) বলেন, বিএএস-৩৩ অনুযায়ী বছরের শেষে যে শেয়ার থাকে তার ওয়েটেড দিয়ে ইপিএস গণনা করতে হয়। এক্ষেত্রে ২০০৯-১০ অর্থবছরের জন্য ২০১০-১১ অর্থবছরে বোনাস শেয়ার ইস্যু করলেও তা ২০০৯-১০ অর্থবছরের ইপিএস গণনায় বিবেচিত হবে না। তবে রিস্টেট ইপিএস-এর ক্ষেত্রে হয়। কিন্তু বেসিক আর রিস্টেট ইপিএস ভিন্ন। তিনি আরও জানান, বিএএস-১৬ অনুযায়ী ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টের উপর অবচয় চার্জ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি না করে, তাহলে তা এ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন।

এছাড়া কোম্পানি শ্রম আইনের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। কারণ শ্রম আইন অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে একটি কোম্পানির নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক ফান্ড হিসাবে জমা করতে হয়। সেখান দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিবছর শ্রমিকদের মধ্যে সমান হারে বিতরণ করার বিধান রাখা হয়েছে। এমতাবস্থায় আইনটি একমির জন্য ২০০৬ সাল থেকে কার্যকর হলেও ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত তা করা হয়নি।

বিএএস-১২ অনুযায়ী, এ্যাকাউন্টিং বেসিস ও ট্যাক্স বেসিস হিসাবের মধ্যে স্বল্পমেয়াদী পার্থক্য সৃষ্টির কারণে ডেফার্ড ট্যাক্স বা বিলম্বিত কর গণনা করতে হয়। কিন্তু একমি কর্তৃপক্ষ ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত এই বিলম্বিত কর গণনা করেনি। এছাড়া কোম্পানি বোনাস শেয়ার ইস্যু করলেও ৯১ পৃষ্ঠায় নগদে দেখিয়েছে।

শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস বাদ দিয়ে যদিও সম্পদ মূল্যের হিসেবে একমির আইপিও দর মূল্যায়ন করা হয় তবুও প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে বিনিয়োগকারীরা লোকসানে যাবেন। কারণ ৮৫.২০ টাকা দিয়ে প্রতিটি শেয়ার কিনে ১৪.৫৪ টাকা করে লোকসান করবেন তারা। কারণ কোম্পানির ২০১৩-১৪ অর্থবছর শেষে শেয়ারপ্রতি ৬৬.১৬ টাকার সম্পদ আছে। এ ক্ষেত্রে ৮৫.২০ টাকা করে বিনিয়োগ করলে আইপিও পরবর্তীতে কমে হবে ৭০.৬৬ টাকা। তবে উদ্যোক্তা কিন্তু ঠিকই লাভবান হবেন।

একইসঙ্গে কোম্পানি অবচয় কম চার্জ করে মুনাফা বেশি দেখিয়েছে। সাধারণত নতুন বা যোগ হওয়া সম্পদের উপরে ছয় মাস অবচয় চার্জ করতে দেখা যায়। কিন্তু একমি এক মাসের চার্জ করেনি।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোম্পানি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভবনের ক্রয় মূল্যের উপরে ৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকার অবচয় চার্জ করেছে। এর মধ্যে নতুন বা যোগ হওয়া ভবনের উপরে মাত্র ৩১ লাখ টাকা অবচয় চার্জ করা হয়েছে। কিন্তু এই সম্পদের উপরে ১ মাসের অবচয় করলেও ৪৯ লাখ টাকা হয়।

মেশিনারিজের ক্ষেত্রে নতুন সম্পদের উপরে ১২ লাখ টাকা অবচয় চার্জ করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও ১ মাসের কম চার্জ করা হয়েছে। এই সম্পত্তির উপরে ১ মাসে অবচয় হয় ৮১ লাখ টাকা। ইউটিলিটিজের উপরে ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা অবচয় হয়েছে। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে অবচয় হিসাবে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানি ৩ লাখ টাকা অবচয় কম চার্জ করেছে। এ ছাড়া নতুন সম্পদের উপরে অবচয় ধরেনি। এই বিষয়ে কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম ইস্যু মানেজারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের উত্তর ইস্যু ম্যানেজারই দিতে পারবে।

উল্লেখ্য, কোম্পানির ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছে আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। রেজিস্ট্রার ট্যু দা ইস্যু হিসেবে রয়েছে প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল লিমিটেড।