১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গেইল মানে ব্যাটিং-বিনোদন


গেইল মানে ঝড়, গেইল মানে চার-ছক্কার ফুলঝুরি, গেইল মানে ব্যাটিং-তা-ব, গেইল মানে বিনোদন। টি২০ বিশ্বকাপের শুরুতেই সেটি দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে নিজের জাত চেনালেন জ্যামাইকান উইলোবাজ। ২০০৭ প্রথম টি২০ বিশ্বকাপের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান ক্রিস গেইল। যেন তার হাত থেকে এমন রেকর্ড না হলে মানাত না! এমন কি ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির অনন্য কীর্তিও ৩৬ বছর বয়সী এই ক্যারিবিয়ানের দখলে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে সর্বশেষ আসরে এই নজির গড়েন তিনি। ভারতে চলমান টি২০ বিশ্বকাপেও জ্বলে উঠলেন গেইল। যার দখলে ক্লাব টি২০র দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরি ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান, তার নামের পাশেই এমনটা মানায়।

গেইল মানে যে ব্যাটিং-বিনোদন, সেটি আরও একবার দেখে মুম্বাই, দেখে ক্রিকেট বিশ্ব। উইন্ডিজ উইলোবাজের ম্যারাথন সেঞ্চুরির কাছে উড়ে যায় প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। ৬ উইকেটের দারুণ জয়ে টি২০ বিশ্বকাপ শুরু করে ড্যারেন সামির দল। ১৮৩ রানের লক্ষ্যটাকে ডাল-ভাত বানান ক্রিস্টোফার হেনরি গেইল। ম্যাচের ‘নায়ক’ মাত্র ৪৮ বলে খেলেন অপরাজিত ১০০ রানের ম্যারাথন ইনিংস। ওয়াংখেড়ে ইংলিশ বোলারদের নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলায় মেতে ওঠেন তিনি। ৪৭ বলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টি২০ সেঞ্চুরি পূর্ণ করতে ৫ চারের বিপরীতে ছক্কা ১১টি। অর্থাৎ ট্রিপল ফিগারে পৌঁছাতে বাউন্ডারি এবং ওভার বাউন্ডারি থেকেই তুলে নেন ৮৬ রান! ৪৭ বলে ১০০- আন্তর্জাতিক টি২০তে দ্রুততম সেঞ্চুরির তালিকায় যৌথভাবে যেটি তৃতীয় স্থানে। গেইলের আগে ঠিক ৪৭ বলে টি২০ সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের এ্যারন ফিঞ্চ (২০১৩)।

৪৫ বলে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে রেকর্ডটা অবশ্য রিচার্ড লেভির দখলে। ২০১২ সালে হ্যামিল্টনে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওই রেকর্ড গড়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকান এই ব্যাটসম্যান। ৪৬ বলে ট্রিপল ফিগার ছুঁয়ে দ্বিতীয় স্থানে আরেক প্রোটিয়া ফ্যাফ ডুপ্লেসিস। টি২০ ক্রিকেটের বড় তারকা হিসেবে প্রথমেই যার কথা মনে পড়বে তিনি গেইল। বিতর্কিত সব ঘটনার জন্য ইদানীং যিনি মাঠের চেয়ে বাইরেই বেশি আলোচিত ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ান বিগ ব্যাশ লীগে স্থানীয় প্রমীলা রিপোর্টারের সঙ্গে অশোভন বাক্য বিনিময়ে ৭ হাজার ডলার জরিমানা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। এত কিছুর মাঝে অবশ্য ব্যাট হাতে ঠিকই নিজের স্টাইলটা দেখিয়ে গেছেন ৩৬ বছরে ‘ক্রেজি’ জ্যামাইকান। জানুয়ারিতে মেলবোর্ন রেনেগেডসের হয়ে মাত্র ১২ বলে ৫০ রান করে গড়েন দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ড। ক্লাব টি২০ ইতিহাসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ১৭৫ রানের রেকর্ডটাও তারই দখলে।

চলতি বিশ্বকাপের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জার্সিতে সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন গত বছর মার্চে (ওয়ানডে)। টি২০ তারও আগে, জানুয়ারি-২০১৫ এ। দীর্ঘদিন পর ফিরেই নিজের জাত চেনালেন ধুন্ধুমার উইলোবাজ, সেটিও আবার টি২০ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ম্যাচে! এক নজরে গেইলের রেকর্ড দেখে নেয়া যাকÑ (১) ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে গেইল ১১টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। এর মাধ্যমে ব্রেন্ডন ম্যাককুলামের ৯১টি ছক্কার রেকর্ডকে পেছনে ফেলে এখন টি২০তে সর্বোচ্চ ৯৮টি ছক্কার মালিক তিনি। এ জন্য খেলেছেন ৪৬ ম্যাচ। ম্যাককুলাম ৭০ ম্যাচ খেলেছিলেন। (২) প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে টি২০তে বিশ্ব আসরে দুটি সেঞ্চুরির মালিক কেবল গেইলই। এর আগে ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গে তিনি ১১৭ রানের ইনিংস উপহার দিয়েছিলেন। (৩) ৪৩ রানের বেশি গড় এবং প্রায় ১৫০ স্ট্রাইক রেট নিয়ে টি-টোয়েন্টিতে আট হাজার ৭০০ রান সংগ্রহ করে বাঁ-হাতি এই জ্যামাইকান সর্বোচ্চ রানের মালিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

(৪) গেইল টি২০তে এখন পর্যন্ত করেছেন ১৪টি অর্ধশতক। এটিও যে কোন ব্যাটসম্যানের জন্য সর্বাধিক। ম্যাককুলাম ও বিরাট কোহলি করেছেন ১৩টি করে। (৫) ক্লাব টি২০তে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ডও গেইলের। ২০১৩ সালে ব্যাঙ্গলুরুতে আইপিএলের ম্যাচে পুনে ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালুরুর হয়ে ১৭৫ রানের অতিমানবীয় ইনিংস উপহার দিয়েছিলেন। (৬) একমাত্র ব্যাটসম্যান হিসেবে গেইল দুই-দুইবার এক ম্যাচে ১০টি বা তার বেশি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলেও গেইলের এত সাফল্যের রহস্য কি? চাপ ভুলে খেলাটাকে উপভোগ করাÑ এক সাক্ষাতকারে এমনটাই জানান তিনি, ‘আমি কেন যে ছক্কা হাঁকাই কিংবা বড় বড় শট খেলি, তা নিজেও জানি না! কোন কিছু বেশি চিন্তা না করেই বলে ফেলি বা করে ফেলি। নিজেকে খুশি রাখতে হলে আমাকে মন ও শরীরকে একসঙ্গে পরিচালনা করা শিখতে হবে। দ্বিধা রেখে কোন কাজ করা যাবে না। বাস্তব জীবনে কিংবা মাঠে-সবখানেই চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু সব সময় মাথা ঠা-া রাখতে হবে।’

সুপার গেইল আরও যোগ করেন, ‘আমি সব সময় নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলি। ক্রিকেট মাঠে নিজেকে ভাল করার জন্য পরামর্শ দিই। নিজেকে বোঝাই, সাফল্যের জন্য চাপ না নিয়ে চুপ থাকো। আমি বিশ্বাস করি, সময় নিয়ে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেই যে কোন কঠিন ম্যাচ জেতা যায়। আমার ওপর ক্রিকেট মাঠের চাপ তো থাকেই, সঙ্গে থাকে দর্শকদের প্রত্যাশা। দর্শকেরা ক্রিস গেইলের কাছে শুধু রান বা ছক্কা প্রত্যাশা করেন না, তার কাছে বল আর ফিল্ডিংয়েও দর্শকেরা বিনোদন চান। আমি সৌভাগ্যবান, আনন্দ নিয়ে ক্রিকেট খেলি। দর্শকদের আনন্দ বুঝতে পারি। আমি পয়সা উসুল করে দিই তাদের। কখনও কখনও প্রথম বলেই বল বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে দিই। তখন আমার বোলারের কথা ভাবতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমাদের খেলা দেখার জন্য সাধারণ মানুষ মাঠে আসে। আমাদের সেরা খেলাটাই তাদের দেখানো উচিত। আর সে কারণেই বল মাঠের বাইরে পাঠাতেই আমার যত আনন্দ। পরিস্থিতি যাই হোক মানসিকভাবে নিজেকে শক্ত রাখি। সেই শক্তিতেই সামনে এগিয়ে যাই। বিশ্বাসকরি, আগে মানসিক শক্তির জোর বাড়াতে হবে, তাহলেই কব্জিতে শক্তি আসবে।’