১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

‘বাংলাদেশকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না’


আবেগপ্রবণ জাতি বাংলাদেশ। যে কোন সাফল্যে দেশটির আপামর জনসাধারণ ভাসেন আনন্দের আতিশয্যে। আর খেলাধুলা হলে তো কথাই নেই। নির্দিষ্ট করে বললে ক্রিকেট। ব্যাট-বলের এই খেলা এখন বাংলাদেশের মানুষের আত্মার সঙ্গী। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্বদর্ভ বিচরণের কারণে লাল-সবুজের দেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়ার হিসাবও অন্যরকম। গত কয়েক বছর ধারাবাহিক নজরকাড়া সাফল্যের কারণে প্রত্যাশার পারদও উর্ধমুখী। নিজ দেশে এশিয়া কাপ টি২০ তে ফাইনালে খেলার পর ভারতে টি২০ বিশ্বকাপেও প্রত্যাশার চাপ বেড়েছে গোটা জাতির। প্রত্যাশিতভাবে বাছাইপর্ব পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে খেলার ছাড়পত্রও পায় টাইগাররা। কিন্তু মূল লড়াইয়ে বাংলাদেশের দুই বোলার তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানিকে আইসিসি অবৈধভাবে নিষিদ্ধ করলে ফুঁসে ওঠে গোটা দেশ। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে টিম বাংলাদেশের পারফরমেন্সেও। বিশেষ করে তাসকিনকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কেউ মানতে পারছেন না। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ সবক্ষেত্রে এ নিয়ে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় বইয়ে গেছে। সামিউর রহমান নামের এক ক্রিকেটপাগল বলেন, ‘যত ষড়যন্ত্রই হোক না কেন কেউ বাংলাদেশকে দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। বাঙালী জাতির ক্রিকেট মোড়লদের কাছ থেকে ন্যায্য দাবি আদায় করে নেয়ার মিশন এখন। আইসিসি ও ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্ষতি করতে উঠেপড়ে লেগেছে তাতে সবাই সোচ্চার। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) চেষ্টা করে যাচ্ছে এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে। ‘১৯ মার্চ’ তারিখটিই যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কলঙ্কিত। এই দিনটি বিতর্কিত হয়ে থাকল ক্রিকেট ইতিহাসে। যা আইসিসির জন্যই কলঙ্কের। ঠিক একবছর পর সংস্থাটি হতাশা, গ্লানির মেলবোর্নকে ফিরিয়ে আনে ভারতে চলমান টি২০ বিশ্বকাপে। ২০১৫ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপে বিতর্কিত সেই ‘নো’ বলের পর এবার সরাসরি বোলারকে ‘অবৈধ পন্থায়’ নিষিদ্ধ করেছে আইসিসি। আইসিসির আইনই এর পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছে। গত বছর অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মেলবোর্নে আম্পায়ারদের বিতর্কিত ‘নো বল’ সিদ্ধান্তের কারণে সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্নভঙ্গ হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। ওইদিন প্রতিপক্ষ ছিল ক্রিকেটের এক ‘মোড়ল’ ভারত। দেশ-বিদেশের কোটি টাইগারভক্তের চোখে সেদিন ঝরেছিল অশ্রু। সমালোচনার ঝড় বয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

মেলবোর্নে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচে প্রযুক্তির যথাযথভাবে ব্যবহার করেনি আইসিসি। এসব কারণ থেকে সৃষ্ট অসন্তোষে শেষ পর্যন্ত আইসিসি সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন বাংলাদেশের আ হ ম মুস্তফা কামাল। সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ক্ষত এখনও পোড়ায় ১৬ কোটি বাংলাদেশীকে। ১৯ মার্চের বিতর্কিত সে ম্যাচের ক্ষত না শুকাতেই আইসিসি যেন একইভাবে ‘এক বছর পূর্তি উদযাপন’ করল। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ এলো বিতর্কিত আরেক দুঃসংবাদ। এবার ম্যাচে হার নয়, টাইগারদের বিশ্বকাপ দল হারিয়েছে ইনফর্ম বোলার তাসকিন ও সানিকে। আইসিসির হঠকারী সিদ্ধান্তে তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিষিদ্ধ!

এই সিদ্ধান্তকে হঠকারী বলার যথেষ্ট কারণ আছে। তাসকিনের রিপোর্টের সঙ্গে আইসিসির সিদ্ধান্তের কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে ম্যাচে তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন নিয়ে আম্পায়াররা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সেই ম্যাচে তাসকিনের কোন নির্দিষ্ট ডেলিভারির কথা তারা সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করেননি। কিন্তু তাকে অবৈধ বলা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট ডেলিভারির জন্য। রিপোর্টে বলা আছে, তাসকিনের শুধু বাউন্সারে সমস্যা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, যে ম্যাচে তাসকিনের বোলিং নিয়ে সন্দেহ করা হয়েছিল সেই ম্যাচে তিনি কোন বাউন্সারই দেননি! চেন্নাইতে মাত্র ৩ মিনিটে ৯টি বাউন্স দিতে বলা হয় বাংলাদেশী পেসারকে। যেখানে তিনটিতে সমস্যা ধরা পড়ে বলের গতি কম হয়ে যাওয়ার কারণে।

তাসকিনের দেয়া স্পট ডেলিভারি ও ইয়র্কারেও কোন সমস্যা পাননি বায়োমেকানিক্যাল পরীক্ষকরা। বোলিং এ্যাকশন ইস্যুতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আইনজীবী হিসেবে কাজ করা মুস্তাফিজুর রহমান খানের মতে, পরীক্ষার রিপোর্ট ও আইসিসির ধারা অনুযায়ী তাসকিনকে সর্বোচ্চ সতর্ক করা যেত, কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা মেনে নেয়া যায় না। ঘটনার পর ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন, যে ম্যাচে তাসকিন রিপোর্টেড হন, সে ম্যাচে তিনি কোন বাউন্সার দেননি। এ কারণে প্রটোকল অনুযায়ী ল্যাবে তার এই ধরনের বলের পরীক্ষা করার কথা নয়। তবু তা করা হয়েছে। তাছাড়া, অফিসিয়ালরা তাসকিনের যে লেংথ বল আর ইয়র্কারের এ্যাকশন নিয়ে রিপোর্ট করেছেন, ল্যাবে সেটা স্পষ্টই বৈধ প্রমাণ হয়েছে।

এছাড়া কোন বিশেষ ডেলিভারিতে সন্দেহজনক কিছু থাকলে আইসিসির ধারা অনুযায়ীই সেই নির্দিষ্ট ডেলিভারির (স্টক ডেলিভারি ছাড়া) ব্যাপারে বোলারকে সতর্ক করা হতে পারে, ওই ডেলিভারি দিলে দ্বিতীয়বার রিপোর্টের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। সুতরাং তাসকিনের যেহেতু স্টক ডেলিভারি বৈধ প্রমাণ হয়েছে এবং তার ৯টি বাউন্সারের মধ্যে ৩টি বাউন্ডার ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়েছে, সেক্ষেত্রে আইসিসিরই নিয়ম অনুযায়ী তাকে সর্বোচ্চ সতর্ক করা যেত, কিন্তু কোনভাবেই সাসপেন্ড নয়। এর মাধ্যমে আইসিসি নিজের আইনই ভেঙ্গেছে। বিসিবির এ আইনজীবী স্পষ্ট করে বলেন, তাসকিন অবিচারের শিকার। আমি বিসিবিকে ধারাগুলো নির্দিষ্ট করে এর আওতায় সংশ্লিষ্ট কোর্টে রিভিউ করার পরামর্শ দিয়েছি।

বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশের দুই বোলারকে ছেঁটে ফেলাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবেই দেখছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। তাদের প্রশ্ন, বাংলাদেশের মাটিতে এসে ক্রিকেটের ‘মোড়লরা’ রীতিমতো নাকানিচুবানি খাওয়ার পর নিজ দেশের মাটিতেও টাইগারদের নিরাপদ ভাবতে পারছে না। তাই এ ‘ষড়যন্ত্র’। তবে সব ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙ্গা জবাব টাইগাররা মাঠেই দেবেন এমন আশা ১৬ কোটি বাঙালীর।