১২ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

কুড়িগ্রামে ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে জবাই


কুড়িগ্রামে ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে জবাই

রাজু মোস্তাফিজ, কুড়িগ্রাম থেকে ॥ কুড়িগ্রামে ধর্মান্তরিত এক মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার সকাল আটটার দিকে বাড়ির সামনে হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে পৌরসভার হাসপাতালপাড়া এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীকে (৬৮) তিন মোটরসাইকেল আরোহী জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। তারা ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে তালতলা হয়ে শহরের ভিতর দিক দিয়ে পালিয়ে যায়। এই অপারেশন ছিল ৪ থেকে ৫ মিনিটের। পরে জেলা প্রশাসক নুরুল আমিন, এসপি মোহাম্মদ তবারক উল্লাহসহ প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করছে পুলিশ। আকস্মিক এ ঘটনায় জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রতিদিনের ন্যায় সকালে প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী। বাড়ি থেকে প্রায় আড়াই শ’ গজ দূরে আশরাফিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন কুড়িগ্রাম-জিগামারি ঘাট পাকা সড়কে হাঁটছিলেন তিনি। এ সময় রাস্তায় লোকসমাগম কম ছিল। হঠাৎ শহরের দাদা মোড় হয়ে একটি মোটরসাইকেল তার পাশে এসে জোরে ব্রেক কষে। মোটরসাইকেলের তিন আরোহীর মধ্যে দুজনের মাথায় ছিল হেলমেট। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হেলমেট পরিহিত এক যুবক মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীর গলায় কোপ মারে। এতে গলার বেশিরভাগ অংশ কেটে যায়। সামনের দিকে রাস্তার ওপর তার নিথর দেহ পড়ে যায়। হত্যাকারীরা মৃত্যু নিশ্চিত করে আশরাফিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে তালতলা হয়ে সরকারী কলেজের পিছনের রাস্তা হয়ে শহরের ভিতর দিয়ে পালিয়ে যায়। হত্যার দৃশ্য দেখে ফেলায় প্রত্যক্ষদর্শী কনফিডেন্স কোচিং সেন্টারের শিক্ষককে লক্ষ্য করে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় তারা। ককটেলের স্পিøন্টারের আঘাতে কোচিং সেন্টারের টিনের বেড়া ঝাঝরা হয়ে গেছে। এ সময় রাস্তায় হৈচৈ শুনে লোকজন ছুটে এলে দুর্বৃত্তরা ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যায়। যাবার সময় তারা পার্শ্ববর্তী কলেজ পাড়ার তালতলায় জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম সাকিবের বাড়ির গেটের সামনে ছাত্রাবাসের ছেলেরা পথরোধ করার চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্য করে আবারও ককটেল ছোড়ে এবং দুটি বড় ছোরা উঁচিয়ে ভয় দেখিয়ে পালিয়ে যায়। দুটি ককটেল অ-বিস্ফোরিত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রত্যক্ষদর্শী আবদার হোসেন ও নয়ন জানান, কালো রঙের ১৩৫সিসি ডিসকভার মোটরসাইকেলে ২৫/৩০ বছরের তিন যুবক ৪/৫ মিনিটের মধ্যে হত্যা মিশন শেষ করে। একটি বাসার গার্ড ফারুক জানায়, ঘটনার ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে ৩ দুর্বৃত্ত দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেলে তালতলা মোড় হয়ে পালিয়ে যায়। কনফিডেন্স কোচিং সেন্টারে দুর্বৃত্তরা ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু জানান, মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী সদর উপজেলার মোগলবাসা ইউনিয়নের চর সিতাইঝাড় এলাকার মরহুম সেফাত উল্লাহর ছেলে। তিনি পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক হিসেবে গত বছর অবসরে যান। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি শহরের গাড়িয়ালপাড়ায় নিজ বাড়িতে থাকতেন। কর্মস্থল, বন্ধুবান্ধব এবং এলাকায় একজন ভাল মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার মাসে মুক্তিযোদ্ধা হত্যার বিষয়টি মেনে নেয়া যায় না। এর বিচার হতে হবে। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার মুক্তিযোদ্ধা সনদ নং-ম-৯৪৭৩৫৫ এবং স্মারক নাম্বার বি/ম/সা/কুড়িগ্রাম/প্রঃ ৩/৪৩/২০০২/২৯৮০।

কুড়িগ্রাম জেলার যাজক রেভারেন্ড ফোরকান আল মসিহ জানান, মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী প্রায় ১৫ বছর আগে ১৯৯৯ সালে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। সম্প্রতি তিনি তার সঙ্গে সহকারী পাস্তর হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। এলাকায় কারও সঙ্গে তার কখনই মনোমালিন্য হয়নি। তার গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার পাঁচগাছী এলাকার নয়ারহাটে।

হোসেন আলীর ছেলে রাহুল আমিন (আজাদ) জানান, তার বাবা কোন দরকার ছাড়া বাড়ি থেকে বের হন না। কারও সঙ্গে তার কোন শত্রুতা নেই। বাড়িতেই ধর্মচর্চা করতেন। ধর্মান্তরিত হওয়া নিয়ে বড় বোন হাসিনা বেগম অসন্তুষ্ট ছিল। সে বিষয়টি মেনে নেয়নি। মা, আমি এবং ছোট বোন নাসিমা বেগম এটা মেনে নিয়ে বাবার সাথে ছিলাম। গ্রামের বাড়িতে জমিজমা নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ আছে। তবে মার্চের প্রথম সপ্তাহে রংপুর জেলার মাহীগঞ্জ এলাকার পরিচয় দিয়ে আবুল বাশির নামে এক যুবক বাড়িতে ভাড়ায় ওঠে। ২৫/২৬ বছর বয়সী এ যুবক আজ মঙ্গলবার পরিবার নিয়ে আসবে বলে গত শনিবার চলে যায়। তার দেয়া ন্যাশনাল আইডি নম্বর ও মোবাইল নম্বরও ভুল। বাসার একটি রুম ভাড়া নেয়ার সময় জানায়, সে নাগেশ^রী উপজেলায় নেক্সসেস ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি করে। রাহুল তার বাবার হত্যাকারীদের শাস্তি চান।

জেলা পুলিশ সুপার তবারকউল্লাহ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তারা হত্যাকা- ঘটিয়ে ককটেল ফাটিয়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করে। এরমধ্যে দু’টি ককটেল অবিস্ফোরিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আমরা রংপুর সেনাবাহিনীর দফতরে খবর পাঠিয়েছি। বিশেষজ্ঞ দল এসে ককটেল দুটো নিস্ক্রিয় করবে। তবে হত্যাকা-ের ঘটনা উগ্রপন্থী কোন জঙ্গীগোষ্ঠীর নাকি পারিবারিক শত্রুতা তা আমরা খতিয়ে দেখছি। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।

মঙ্গলবারই নিজ কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এখন থেকে কুড়িগ্রাম পৌর এলাকায় সকল ভাড়াটিয়ার ছবি, ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ফটোকপিসহ বায়োডাটা পুলিশের কাছে জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া মোটরসাইকেল তল্লাশির কাজ জেলাব্যাপী জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়। এখন পর্যন্ত এ ধরনের বড় অপরাধে দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলকে নিরাপদ বাহন হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। সভায় জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, নিহত মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়টি বড় মেয়ে মেনে নেয়নি। মোগলবাসায় গ্রামের বাড়িতে জমিজমা নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ ছিল। এছাড়া অল্প বয়সের এক ভাড়াটিয়ার প্রতি সন্দেহের তীর সবার। কারণ এখন পর্যন্ত তিনি নিরুদ্দেশ। এছাড়া জঙ্গীদের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রশাসন সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ নিয়ে কেউ যেন আতঙ্ক সৃষ্টি করতে না পারে কিংবা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে না পারে সে দিকেও নজর রাখা হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোঃ রুহানী জানান, এ হত্যাকা-ের ঘটনায় কুড়িগ্রাম সদর থানায় একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। নিহতের পুত্র রাহুল আমিন আজাদ এ হত্যা মামলার বাদী হবেন বলে জানান।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: