২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

১৪৪ গ্লাস প্যানেলে তিন শ’ আলোকচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল


১৪৪ গ্লাস প্যানেলে তিন শ’ আলোকচিত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল

মোরসালিন মিজান ॥ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সুউচ্চ গ্লাস টাওয়ারটি সবার দেখা। বহু মানুষ প্রতিদিন কৌতূহলী চোখ নিয়ে তাকান। স্বাধীনতা স্তম্ভ ও এর আশপাশের এলাকা ঘুরে চলে যান। অথচ এর ঠিক নিচেই একটি জাদুঘর, অনেকে জানেন না। ভূগর্ভস্থ জাদুঘরে বাঙালীর দীর্ঘ সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ধারাবাহিক ইতিহাস। অসংখ্য আলোকচিত্র, স্মারক ইত্যাদির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। তদুপরি, মাটির নিচে হওয়ায় ঘুরে দেখার বাড়তি একটা আনন্দ আছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতায় জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ একইসঙ্গে স্বাধীনতা জাদুঘরটি পরিচালনা করছে। এর সীমিত পরিসর। তবে চমৎকার উপস্থাপনা। এখানে ৩০০ আলোকচিত্র ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১৪৪টি গ্লাস প্যানেলে সরাসরি ডিজিটাল প্রিন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। যতটা সম্ভব ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বর্ণনা করা হয়েছে স্বাধীনতার পূর্বাপর। শুরুতে জাতি গোষ্ঠী হিসেবে বাঙালীর পরিচিতি তুলে ধরার প্রয়াস। বাঙালীর ইতিহাস কত প্রাচীন, সেটি স্মরণ করিয়ে দেয় পু-্রবর্ধন ও ওয়ারি বটেশ্বরের আলোকচিত্র। পু-্রবর্ধনের লিপি ও চর্যাপদের উপস্থাপনা বাঙালীর শেকড়ের সন্ধান দেয়। বাঙালী যে গোড়া থেকেই আসাম্প্রদায়িক, সে কথা বলে প্রাচীন কিছু উপাসনালয়ের আলোকচিত্র। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান ধর্মের উল্লেখযোগ্য উপাসনালয়ের আলোকচিত্র রাখা হয়েছে জাদুঘরে। এর পর বলা বেশ কিছু দুর্লভ ছবি ব্যবহার করে বলা হয়েছে উদ্যানের ইতিহাস। সে অনুযায়ী, আজকের সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের সূচনা মোগল আমলে। তখন এটি ছিল চমৎকার একটি বাগান। নামÑ বাগে বাদশাহ। ব্রিটিশ আমলে এখানে সৈন্যদের থাকার ব্যারেক করা হয়। সেইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হতো ঘোর দৌড়। ব্রিটিশ সৈন্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতো কুচকাওয়াজ। তেমন একটি ছবিতে দেখা যায় লর্ড কার্জনকে। উদ্যানে গাড়িতে চড়ে সালাম গ্রহণ করছিলেন তিনি। নওয়াবদের আমলে এটি আবার বাগানের চেহারা পায়।

এর পর ১৯৪৮ সালের রেসকোর্স। একটি ছবিতে দেখা যায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে। অবিভক্ত পাকিস্তানের এই নেতা এখানে নাগরিক সংবর্ধনা নিতে এসে বলছেন, একমাত্র উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা! এমন ভয়ঙ্কর দুরভিসন্ধির প্রতিবাদও এখান থেকেই শুরু। এ সূত্রে আসে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসটি। বেশ কিছু ছবিতে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়। একে একে আসে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন।

আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আসে সেই উজ্জ্বলতম দিন ৭ মার্চ, ১৯৭১। বিশাল একটি আলোকচিত্রে দৃশ্যমান হন বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আলোকচিত্রটি প্রস্থে ৩০ ফুট। ২০ ফুট উচ্চতা। ফলে অনেক দূরে থেকে দেখা যায়। খুব চেনা এই ছবি। ইতিহাসটি কাউকে বলে দিতে হয় না। হ্যাঁ, স্বাধীনতার ডাক দিচ্ছেন জাতির মহান নেতা। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিচ্ছেন।

একটি দেয়ালে বিশেষভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে একাত্তরের গণহত্যার চিত্র। এ জন্য আলাদা করে তৈরি করা হয়েছে ব্ল্যাকজোন। দেয়ালটি অন্ধকার। কালোয় ঢাকা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যে নিরীহ বাঙালীর ওপর পাকিস্তানী বর্বররা যে আক্রমণ চালিয়েছিল, সেই কালো রাতের কথা বলতেই এমন ব্যবস্থা। সেইসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের গণহত্যার নানা চিত্র। পাশের গোলাকার একটি কক্ষ নজরকাড়ে খুব। এখানে ৩০ লাখ সন্তান হারানোর শোকে কাঁদছে যেন বাংলা মা। তেমন একটি উপস্থাপনা দেয়া হয়েছে।

স্বাধীনতা জাদুঘর যেহেতু, স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাসটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বহুকাল পরও স্বাধীনতার ঘোষক প্রশ্নে যারা বিভ্রান্তি ছড়ান তাদের মুখে ছাই দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট দলিল রাখা হয়েছে। টাইমস, নিউজউক, ফারইস্টসহ বিশ্বের বেশ কিছু সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ বলছে, ২৬ মার্চ স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ মুজিব। লাইট এ্যান্ড সাউন্ড শোর মাধ্যমেও তুলে ধরা হয় ইতিহাসটি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীনসহ জাতীয় চার নেতার ভূমিকাও দেখানো হয়েছে আলোকচিত্রে। পাকিস্তানী হায়েনাদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়ে যাওয়া সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আছে। আছে সেক্টর কমান্ডারদের সবার ছবি।

সব শেষে কাক্সিক্ষত বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বর। এদিনের ইতিহাসটিকেও বিশাল দুটি আলোকচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, আত্মসমর্পণের দলিলে নিজের নাম লিখছেন নিয়াজী। ছবি দুটির নিচে মেঝেতে গ্লাস শোকেস। সেখানে স্থাপন করা হয়েছে আত্মসমর্পণের দলিল সই করা হয় যে টেবিলটিতে, সেটির রেপ্লিকা। সব মিলিয়ে ছোট পরিসরে চমৎকার একটি উপস্থাপনা।

স্বাধীনতা জাদুঘর সাজানোর কাজটি করেছেন বিশিষ্ট জাদুঘরবিদ ড. ফিরোজ মাহমুদ। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ জাদুঘরে বাঙালীর স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসটি তুলে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ ইতিহাস। সরল ও ধারাবাহিক উপস্থাপনা। এর ফলে যে কেউ অল্প সময় পরিদর্শন করেও স্বাধীনতার ইতিহাসটি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন। কেন স্বাধীনতা স্তম্ভ? উদ্যানের ইতিহাসটিই বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার প্রয়াস নেয়া হয়েছে জাদুঘরে। তবে জাদুঘর যেহেতু, বস্তু নিদর্শন বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী অবশ্য আরও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা জানান। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, গত বছরের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এর অউনারশীপ পায়নি জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। এখনও চাবি গণপূর্ত অধিদফতরের কাছে। সরকারের খাতায় এর নাম ওঠেনি। কোন বাজেট নেই। আছে জনবলের সঙ্কট। এই অবস্থায়ও জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। জাতীয় জাদুঘরের অঙ্গিভূত করা হলে এর নিদর্শনের কিছু অংশ স্বাধীনতা জাদুঘরে দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানান মহাপরিচালক। আছে আরও কিছু পরিকল্পনা। সব বাস্তবায়ন করা গেলে জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ হবে বলে জানান তিনি।

স্বাধীনতা জাদুঘর বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে।