১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ভোট দিতে পেরে খুশি ॥ প্রথম দফা ইউপি নির্বাচন


ভোট দিতে পেরে খুশি ॥ প্রথম দফা ইউপি নির্বাচন

শাহীন রহমান ॥ প্রথম দফায় ইউপি নির্বাচন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কয়েকটি জেলার বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটেছে। কমিশনের হস্তক্ষেপের কারণে সেসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখা হয়। সকাল থেকেই ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট প্রদানে অংশ নিয়েছেন। আটটায় ভোটগ্রহণ শুরু হলেও আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে সময়ের অপেক্ষা করেন তারা। যখন ভোটগ্রহণ শুরু হয় তখন লাইন অনেক লম্বা হয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করে ভোট দিতে দেখা গেছে। ইউপি নির্বাচনে মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্য করার মতো। ঘুম থেকে উঠেই সবার আগেই মহিলারা ভোট কেন্দ্র ছুটে যায়। সকাল থেকে প্রায় সব ভোট কেন্দ্রে পুরুষের চেয়ে নারীদের লাইন ছিল সবচেয়ে লম্বা।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে অনিয়মের কারণে সারাদেশের ৭ হাজারের বেশি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে প্রাথমিকভাবে মাত্র ৫৬ কেন্দ্রের ভোট কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ করা হলেও ৭শ’র বেশি ইউপির মধ্যে তারা মাত্র ৫০টি ইউপিতে পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগ অবশ্য দাবি করেছে ইউপি নির্বাচনের প্রথম দফায় ৯৯.৭২ ভাগ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। অতীতের যে কোন নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মহিলা ভোটারা তাদের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে জানান ভোট দেয়ায় কোন সমস্যা হচ্ছে না। সকাল থেকেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ চলছে। সব ভোটার যার যার ইচ্ছেমতো ভোট দিতে পারছেন। এ সময় তারা নিজের ভোট দিতে পেরে সবাই খুশি। পুরুষ ভোটাররা জানান, লাইনে ভোটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। তবে তিনটি ব্যালটে ভোটগ্রহণের কারণে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় অনেক সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। প্রথম চার ঘণ্টায় বেশিরভাগ ভোটারা ভোট কেন্দ্রে ভিড় জমায়। প্রথম চার ঘণ্টার উপস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ এ সময় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের প্রথম চার ঘণ্টায় সামান্য কিছু বিশৃঙ্খলা ছাড়া ভোটগ্রহণ সন্তোষজনক। নোয়াখালী, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল ছাড়া সব জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট রিপোর্টাররা জানান, মঙ্গলবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে নির্বিঘেœ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্রগুলোতে পুরুষদের পাশাপাশি নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো।

এদিকে প্রথম দফায় ৭২১ ইউপিতে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে ৭১২ ইউপিতে। ভোটের দিন মঙ্গলবারও আদালতের আদেশে বেশ কয়েকটি ইউপির ভোটগ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে। সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা ও মেয়াদোত্তীর্ণ না হওয়ায় এসব ইউপিতে ভোটগ্রহণে আদালতের স্থগিতাদেশ দেয়া হয়। ভোটের দিন স্থগিত হওয়া ইউনিয়ন পরিষদগুলো হলো ভোলার লালমোহন উপজেলার বদরপুর ও রমাগঞ্জ, বোরহানউদ্দিনের বড়মানিকা ও পক্ষিয়া এবং চরফ্যাশনের চরমানিকা। এর আগে সোমবারও বোরহানউদ্দিনের রসুলপুর, বাঞ্ছারামপুরের সোনারামপুর, মহেশখালীর কালারমারছড়া ও সারিয়াকান্দির কাজলা ইউপির ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

এদিকে ইউপি নির্বাচনের প্রথম দফায় সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী, কুমিল্লা, কক্সবাজার জেলাসহ বেশ কয়েকটি জেলার বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করে দেয়া হয়। ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর সকালে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে দুই নির্বাচনী কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হন। সাতক্ষীরায় গোলযোগের পর তিন কেন্দ্র বাতিল এবং ১৬টিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও বোমাবাজির খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগ এনে কয়েক চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কোথাও কোথাও পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু করা হয়।

এদিকে ভোট দানে বাধা প্রদান ব্যালট ছিনতাই ও জাল ভোট দেয়াসহ বিভিন্ন নির্বাচনী অনিয়মের কারণে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা। প্রার্থী আটকসহ জালভোট দেয়া, অনিয়মের অভিযোগের কারণে অনেককে আটক, জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভোটগ্রহণের শেষ সময়ে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার পয়রী ইউনিয়নের ইমাদপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ব্যালট ছিনতাই করতে গিয়ে হাতেনাতে আটক হয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী এনামুল কবীর। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে জাল ভোট দেয়ার সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত একজনকে আটক করে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

এদিকে অনিয়মের অভিযোগে একাধিক চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা রয়েছেন। পটুয়াখালীর বাউফলে কনকদিয়া ইউনিয়নে নারায়ণপাশা সরকারী প্রাইমারী স্কুল ও সূর্যমণি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালটভর্তি বাক্স ছিনিয়ে নেয়া ও হামলা এবং সংঘর্ষের পরপরই কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। এছাড়া কনকদিয়া, বগা, কালিশুরী, কেশবপুর, কালাইয়া ইউনিয়নে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে বিএনপি প্রার্থীসহ ৭ চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন ইউপিতে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ৮ প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। ভোলার বোরহানউদ্দিনেও একই অভিযোগে বিএনপি প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

কমিশনের স্বস্তি প্রকাশ ॥ এদিকে ইউপি নির্বাচনের প্রথম দফায় নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করায় নির্বাচন কমিশন খুশি। তারা জানিয়েছে, কয়েকটি জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই চার কমিশনার বিভাগভিত্তিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে নির্বাচনের খোঁজখবর নেন কমিশনার আবু হাফিজ, আবদুল মোবারক রংপুর ও রাজশাহী, জাবেদ আলী সিলেট ও চট্টগ্রাম এবং শাহনেওয়াজ খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ভোট পরিস্থিতি তদারক করেন। সঙ্গে সঙ্গে তা টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে শেয়ার করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশন সচিবালয়ের দ্বিতীয় তলায় এবং বাকি চার কমিশনার নিচতলায় বসে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তারা খোঁজখবর নেন। সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অবহিত করেন। নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ বলেন, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সব জায়গায় উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হচ্ছে। দিন শেষে ভোট পড়ার হার ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তৃণমূলের এ ভোটে উপস্থিতিও ভাল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, এবার নারী ভোটারের উপস্থিতি বেশি থাকার তথ্য পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে নির্বাচন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রথম দফায় সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ঘটনায় যারা আহত বা নিহত হয়েছে তাদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন তিনি। বলেন, দেশব্যাপী বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ইসির নজরে এসেছে। পাশাপাশি এক আনসার সদস্য নিজের গুলিতে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুবরণ করেছেন। নির্বাচনে আহত ও নিহতদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করছি।

তিনি বলেন, সারাদেশের ৫৬টি ভোট কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সার্বিকভাবে এ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল। বিশেষ করে নারীদের উপস্থিতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এ নির্বাচন অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে।

প্রথম দফায় ৭১২ ইউপিতে সকাল ৮টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয় তা বিরতি ছাড়াই বিকেল চারটা পর্যন্ত চলে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরই শুরু হয় ভোটগণনা। সন্ধ্যার পর থেকেই নির্বাচনী ফল ঘোষণা শুরু হয়। ইসির হিসাব অনুযায়ী প্রথম দফায় চেয়ারম্যান, সদস্য ও রক্ষিত সদস্যপদে মোট ৩৬ হাজার ৪৫৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৩ হাজার ৩৪ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রথম দফায় মোট ভোটার ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার ৭৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা রয়েছে ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৬৯ জন। মহিলা ভোটার সংখ্যা রয়েছে ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৯৪ জন। ভোটারদের ভোটগ্রহণের সুবিধার্তে কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে ৭ হাজার ৮৭টি। ভোটের পরিবেশ রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এক লাখ ৮০ হাজারের বেশি সদস্য। প্রতি ভোট কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২০ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার এবং কোস্টগার্ডে সমন্বয়ে গঠিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনী এলাকায় মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনে অংশ নেয় ইসির ১৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। যারা দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: