১২ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চারুকলায় চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার ব্যাপক প্রস্তুতি


মনোয়ারুল ইসলাম ॥ চলছে তাপে তপ্ত বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্র। দরজায় কড়া নাড়ছে বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ। আর বৈশাখ মানেই যেন বাঙালিত্বের উদ্যাপন। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে শেকড়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা। পয়লা বৈশাখ দেশবাসী বরণ করবে নতুন বাংলা বছর ১৪২৩ বঙ্গাব্দ। রাজধানীর নানাপ্রান্তে ওদিন ছড়াবে নাগরিকের মনের রঙের ছটা। শহরে দৃশ্যমান নানা আনুষ্ঠানিকতার মাঝে বর্ণিলরূপে ধরা দেবে চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। চারুকলার সবুজ আঙিনায় এখন চোখে পড়ছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রতিবছরই চলমান সময়ের বিবেচনায় একটি বিশেষ বিষয় বা ভাবনা হয়ে ওঠে এ শোভাযাত্রার প্রধান অনুষঙ্গ। প্রাথমিকভাবে এ বছরের শোভাযাত্রার ভাবনায় উঠে এসেছে মা ও শিশুর মমতাময় সম্পর্ক। সামাজিক অবক্ষয়ে মায়ের হাতে সন্তানের মৃত্যু কিংবা সন্তানের প্রতি বাবা-মার অযতœ-অবহেলার প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত হয়েছে এবারের বিষয়। সামাজিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে মা ও সন্তানের মধুর সম্পর্কের বিষয়টি হয়ে উঠেছে নববর্ষের শোভাযাত্রার মূল অনুষঙ্গ। চারুকলার শিক্ষকদের সহায়তা ও শিক্ষার্থীদের নিরলস শ্রমে এগিয়ে চলছে সেই প্রস্তুতি পর্ব। বাংলা বছরের শেষ দিন ১৩ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তি উদ্্যাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ প্রস্তুতি।

এখনও পর্যন্ত এবারের শোভাযাত্রার সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন। সোমবার তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, কত প্রকারের অনুষঙ্গ দিয়ে শোভাযাত্রা সাজানো হবে, বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে এ বছরের শোভাযাত্রার মূল ভাবনা নির্ধারিত হয়েছে মা ও শিশুর সম্পর্ক। এমন ভাবনার কারণ উল্লেখ করে নিসার হোসেন বলেন, মা ও শিশুর মধুর সম্পর্কটি সব সময়ই আমাদের সমাজে ইতিবাচক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে মূল্যবোধের ক্ষয়িষ্ণুতার প্রভাবে এ সম্পর্কটি ঠিক আগের মতো অটুট নেই। কিছু দিন ধরেই দেখছি, মা ও সন্তানের সম্পর্কটা ফিকে হয়ে পড়ছে। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় বন্ধনটি কোথায় যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ক্রমাগত ঘটছে শিশু নির্যাতনের ঘটনা। পত্রিকার পাতায় এসব সংবাদ দেখে আঁতকে উঠি। এসব বিষয় সামনে রেখেই এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি পর্ব চলছে। শোভাযাত্রার অগ্রভাগেই থাকবে মা ও সন্তানের বিশালকায় প্রতিকৃতি। এছাড়া মা ও শিশুভিত্তিক নানা আকৃতির টেপা পুতুলসহ থাকবে নানা অনুষঙ্গ। বরাবরের মতো হাতি, ঘোড়া, ময়ূর, পাখির কাঠামো তো থাকছেই। তবে কী কী থাকবে বা এর আকার কী হবে, সেটা এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু চূড়ান্ত করা হবে।

মঙ্গল শোভাযাত্রার মুখ্য উদ্দেশ্যটি উল্লেখ করে নিসার হোসেন বলেন, চারুশিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিশ্রমে এই শোভাযাত্রা সার্বজনীন রূপ পেয়েছে। সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থানের কথাই প্রকাশ করে এই শোভাযাত্রা। মানুষের মাঝে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান অন্তর্নিহিত আছে এর মাঝে। সেক্যুলারিজম চর্চার পথ ধরেই বেড়ে ওঠা শোভাযাত্রাটি এখন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে সকলের কাছে। যার কারণে ধার্মিক মানুষটিও মনের আনন্দে যোগ দেন এ আনন্দযজ্ঞে। আর এ সার্বজনীনতাকে স্পর্শ করার তাগিদেই আমরা কখনও বিজ্ঞাপনের খপ্পরে পড়তে চাই না। তাই চারুকলার ছাত্র ও শিক্ষকদের সৃজিত শিল্পকর্ম বিক্রির মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের তহবিল গঠন করি।

১৬ মার্চ চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি পর্বের উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত দুই শিল্পী রফিকুন নবী ও মনিরুল ইসলাম। এরপর রবিবার থেকে সমগ্র শোভাযাত্রার মূল কাজ শুরু হয়েছে। এখন মূলত শোভাযাত্রার খরচ তোলার জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জলরঙে আঁকা ছবি বিক্রি। সোমবার থেকে শুরু হয়েছে শোভাযাত্রার অন্যতম আর্কষণ বাহারি মুখোশ ও পেপার ম্যাশের প্রাথমিক কাজ। আজ মঙ্গলবার থেকে পূর্ণাঙ্গরূপে কাজ শুরু হবে।

এ বছরের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য কাজ করছে চারুকলা অনুষদের মাস্টার্স দ্বিতীয় বর্ষের ১৭তম ব্যাচ। এ ব্যাচের তত্ত্বাবধায়নে রয়েছেন খালিদ হাসান রবিন। তার নেতৃত্বে অনুষদের সাবেক ও বর্তমান প্রায় পাঁচ শ’ শিক্ষার্থী বিশাল এ কর্মযজ্ঞে কাজ করছেন।

খালিদ হাসান রবিন বলেন, আমাদের ব্যাচে সর্বমোট ১২০ শিক্ষার্থী। সবাই তো এ কাজে অংশ নিচ্ছেন না। তবে এ কাজে আমাদের জুনিয়র ও সিনিয়ররা সবাই সাহায্য করছেন। ইতোমধ্যেই ছবি আঁকা ও বিক্রি শুরু হয়েছে। শোভাযাত্রার মূল ভাবনা মা ও শিশুর কাঠামো নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। এরপর একে একে অন্যান্য কাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

পয়লা বৈশাখ, ১৪ এপ্রিল সকাল নয়টায় বেরুবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। উদ্বোধন করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বিভিন্ন লোকজ অনুষঙ্গ ও কাঠামো সঙ্গী করে শোভাযাত্রাটি চারুকলার সামনে থেকে বের হয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল (সাবেক রূপসী বাংলা) হোটেল চত্বর ঘুরে আবারও চারুকলার সামনে এসে শেষ হবে।

১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বের করা হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। সে বছরই লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এ আনন্দ শোভাযাত্রা। প্রথম শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া, হাতি। তারপরের বছরে চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। এ শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়। এরপর থেকে এটা বাংলা বর্ষবরণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এ আনন্দ শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম লাভ করে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: