মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

‘চাঁদের শহর’ সোমপুর মহাবিহার ফিরছে পুরনো ঐতিহ্যে

প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৬
‘চাঁদের শহর’ সোমপুর মহাবিহার ফিরছে পুরনো ঐতিহ্যে
  • পুরোদমে চলছে সংস্কার কাজ

বিশ্বজিৎ মনি ॥ ঘটনাটি মাসখানেক আগের। শীতটাও নেই বললেই চলে। মোটরসাইকেলের গতি ঘণ্টায় ৫০/৬০ এ ওঠানামা করছে। দূর থেকে তবু হাল্কা কুয়াশায় আবছা দেখা যেতে লাগল বিহারের চূড়া। নওগাঁ জেলা শহর থেকে রওনা দিয়েছি সকাল ১০টায়। যখন বিহারে পৌঁছলাম তখন ঘড়ির কাঁটা বেলা সাড়ে ১১টায়। নওগাঁ শহর থেকে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের দূরত্ব প্রায় ৩২ কিলোমিটার। নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা চাঁদ নগরী। এটি সোমপুর মহাবিহার নামেই সমধিক পরিচিত। সোম অর্থ চাঁদ আর পুর অর্থ শহর বা নগর। যার অর্থ দাঁড়ায় চাঁদের শহর বা চাঁদের নগর।

প্রায় ১২শ’ বছর আগে রাজা ধর্মপাল (৭৮১-৮২১ খ্রিঃ) নির্মাণ করেছিলেন এই সোমপুর মহাবিহার। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল এই সোমপুর মহাবিহারটি। যুগের পর যুগ মাটির নিচে লুকায়িত ছিল এটি। মাটি আর গাছগাছালিতে ঢেকে থাকা এই বিহার দেখতে ছিল অবিকল পাহাড়ের মতো। তাই ধীরে ধীরে গ্রামের নাম হয়ে যায় পাহাড়পুর। পরবর্তীকালে প্রতœতত্ত্ব উৎখননে বেরিয়ে আসে আজকের বিশ্ব ঐতিহ্য সোমপুর মহাবিহার। প্রথম দেখাতেই একটু যেন থমকে যেতে হয়। এই কি সেই পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার? বিহারের প্রতিটি স্থানে পুরোদমে চলছে সংস্কার কাজ। আদলটা সেই যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। সাউথ এশিয়া ট্যুরিজম ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের অধীনে ১০ কোটি টাকার কাজ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একই প্রকল্পের অধীনে আরও ৮ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক ও সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। এখানে নির্মাণ করা হবে একটি পর্যটন মোটেল। সুদৃশ্য ফুলের বাগান। পর্যটকদের সুবিধার্থে ও চিত্ত আকর্ষণের লক্ষ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে নানা আবকাঠামো। এসব উন্নয়নমূলক কাজের মধ্যদিয়ে হাজার বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বৌদ্ধবিহার আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বিহার এবং এর আশপাশের এলাকাজুড়ে।

তাই ইতিহাস ঐতিহ্যের এই সোমপুর বৌদ্ধবিহারকে আরও দর্শনীয় ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চলেছে পর্যটন মোটেল ও পিকনিক কর্ণার নির্মাণসহ সংস্কার, সংরক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কাজ। এর মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্য বর্ধনশীল ও আকর্ষণীয় মূল প্রবেশদ্বার। প্রবেশ দ্বারের দক্ষিণ পাশের কক্ষে প্রতœসামগ্রীর রেপলিকা ও বইপত্র কিনতে পাওয়া যাবে। উত্তর পাশে থাকবে টিকেট কাউন্টার। চলছে মহিলা ও পুরুষের জন্য পৃথক টয়লেট নির্মাণ কাজ। আরও নির্মাণ করা হয়েছে দর্শনীয় ১টি মসজিদ। অফিসার্স কোয়ার্টার আনসার ব্যাটেলিয়নদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ব্যারাক। বানানো হয়েছে স্টাফ কোয়ার্টার। কাঠ আর টালি দিয়ে বিহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাচীন ডিজাইনে নির্মাণ করা হয়েছে পিকনিক শেড। এই শেডগুলোতে পিকনিকে ও বিহার দর্শনে আসা দর্শনার্থীরা বসে বিশ্রাম নিতে পারবেন। এছাড়া পাথওয়ের মাঝে রয়েছে বসার স্থান। নির্মাণ করা হয়েছে পাথওয়ে। রয়েছে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা। পিকনিক কর্নার থেকে সরাসরি বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশ পথে নির্মাণ করা হচ্ছে ১টি ব্রিজ। বৌদ্ধ মন্দিরের প্রধান ফটকসহ ভিতরে মোট ৩টি ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। পুরনো আদলে মন্দিরের সংস্কার কাজও চলছে। চলমান রয়েছে বৌদ্ধ মন্দিরের চতুর্দিকে ভিক্ষু কক্ষ ও মিনিয়েচার, যার নমুনা ধরে বৌদ্ধ মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে। পঞ্চবেদীসহ সকল স্ট্রাকচার পুরনো আদলে সংস্কার কাজ চলছে। পুরোপুরি কাজ সমাপ্ত হলে মন্দিরের ভিতর আর কখনো বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারবে না। ফলে মন্দিরের সৌন্দর্য ও দেয়াল রক্ষা পাবে। এ বিষয়ে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার জাদুঘরে কর্মরত আবুল কালাম হোসেন জানালেন, বিহারটিকে পুরনো আদলে রেখেই সংস্কার করা হচ্ছে। এতে বিহারের ভিতর আর কখনও বৃষ্টির পানি প্রবেশ করতে পারবে না। ফলে ওয়াল ড্যামেজ হওয়ার কোন আশঙ্কা থাকবে না। সংস্কারের পর দু’এক বছরের মধ্যেই ধীরে ধীরে বৌদ্ধ বিহারটি স্বরূপে প্রস্ফুটিত হবে।

ইতিহাস ॥ ইংরেজ প্রতœতাত্ত্বি¡ক বুকানন হামিলটন যখন পূর্ব ভারতে জরিপ কাজ পরিচালনা করেন (১৮০৭-১৮১২ খ্রিঃ)। তখন তিনি পাহাড়পুরে এসে এই স্তূপটির পাশে লাল ইটের টুকরো দেখে অনুমান করেন, এটি একটি বৌদ্ধবিহার। সমতল ভূমি থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফুট। পাহাড়পুর খননের কাজ শুরু হয় ১৯২৩ সালে। তৎকালীন বলিহারের জমিদারের প্রচ- বাধার মুখেও খনন কাজ চালানো হয়। উৎখনন শেষ হয় ১৯৩৪ সালে। উৎখনন কাজ করার সময় পাওয়া যায় একটি মাটির সীলমোহর। যার থেকে এর নাম ‘সোমপুর বৌদ্ধবিহার’ বলে জানা যায়। ঐতিহাসিক তথ্যসূত্রে জানা যায়, পাল বংশের দ্বিতীয় সম্রাট ধর্মপাল অষ্টম শতকে এই বিহার নির্মাণ করেছিলেন। নবম শতকে চাঁদ নগরীর সেই বিহার পাল সম্রাটদের হাতছাড়া হয়ে যায়। প্রতিহার রাজা মহেন্দ্র পাল এটি দখল করেন। পরে আনুমানিক ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে পাল সম্রাট প্রথম মহীপাল বিহার পুনরুদ্ধার করেন।

যোগাযোগ ॥ পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে যেতে নওগাঁ এবং জয়পুরহাট এই দুই জেলা শহর দিয়েই যাওয়া যায়। নওগাঁ এবং জয়পুরহাটে যাওয়ার জন্য ঢাকার কল্যাণপুর. মহাখালি ও গাবতলী থেকে সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা। নওগাঁ থেকে বদলগাছির ভাড়া ৩০ টাকা। বদলগাছি থেকে ২৫-৩০ টাকায় রিক্সা ভ্যান ও ব্যাটারিচালিত টমটম বা ইজিবাইকযোগে পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার যাওয়া যায়।

প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৬

২২/০৩/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: