২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

৮৮ হাজার কোটিতে নামছে এডিপি


হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (এডিপি)। চলতি অর্থবছরের মূল এডিপি ৯৭ হাজার কোটি টাকা থেকে নামিয়ে আনা হচ্ছে ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। ফলে কমে যাচ্ছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর কারণে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন খাত, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিদ্যুত এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে শিক্ষা ও ধর্ম খাত। বাস্তবায়নে গতি না আসায় এত বড় অঙ্ক ছেঁটে ফেলা হচ্ছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে। সংশোধিত এডিপি (আরএডিপি) খসড়া চূড়ান্ত করতে আজ মঙ্গলবার পরিকল্পনা কমিশনে বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এই খসড়া আরএডিপি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আগামী ২৯ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।

অন্যদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো সংশোধিত এডিপিতে এক লাখ কোটি টাকা চেয়ে চাহিদাপত্র জমা দিলেও সেটি আমলে নিচ্ছে না পরিকল্পনা কমিশন। কেননা চলতি অর্থবছরের আর মাত্র তিন মাস বাকি রয়েছে। এর মধ্যে বরাদ্দ বাড়িয়ে দিলে খুব বেশি সুবিধা করতে পারবে না মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। এ বিবেচনায় চাহিদার প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছিল চাহিদা বিবেচনায় বরাদ্দ বাড়ানো বা কমানো যাবে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা সচিব তারিক-উল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যেই দশ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত এডিপি তৈরির নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। তবে এক্ষেত্রে বলা হয়েছে কোন কোন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চাহিদার প্রেক্ষিতে কাটছাটকৃত অর্থের পরিমাণ এর কম বা বেশি হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই আরএডিপির খসড়া তৈরির কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। এখন চূড়ান্ত করা হবে। তিনি বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আহরণের ওপর ভিত্তি করে সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়। এবারও একইভাবে সংশোধিত এডিপি আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে মূল এডিপির আকার ৯৭ হাজার কোটি টাকা ছিল। যা প্রায় সাড়ে নয় শতাংশ কমিয়ে সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা করার সুপারিশ করে অর্থ বিভাগ। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের নিজস্ব তহবিল অংশে ৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা কমিয়ে ৫৮ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা করা হচ্ছে। বিদেশী সাহায্য প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা কাঁটছাঁট করে ২৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা করা হচ্ছে।

সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন খাত। পদ্মা সেতুতে বড় অঙ্কের অর্থের চাহিদার কারণে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে। পরিবহন খাতে সংশোধিত এডিপির ২২ শতাংশ বা ১৯ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে বিদ্যুত খাত। মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র, ঘোড়াশালের দুটি ইউনিটের রিপাওয়ারিং, পল্লী বিদ্যুতের ১৫ লাখ গ্রাহককে সংযোগ প্রদানসহ বড় কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নে এ খাতে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা দেয়ার প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ। তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে শিক্ষা ও ধর্ম খাত। শিক্ষার প্রসার ও গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে নয় হাজার ৮৮২ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনা ও অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে ৮ হাজার ২১০ কোটি টাকা দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষি খাতে ৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছে পরিকল্পনা কমিশন।

এডিপি ব্যাপক কমিয়ে আনার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আহরণ এবং উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে গতিহীনতার কারণে সংশোধিত এডিপির আকার ছোট করা হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেও তেমন কাজে আসেনি। তবে অর্থবছর শেষে পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হবে। উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে অর্থ ছাড়ের বিষয়ে কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করারও কারণেও কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) ৮০ হাজার ৩১৫ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে কাঁটছাঁট নিয়ে অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যাপকভাবে এডিপি আকার কমাতে চাইলেও তাতে রাজি হয়নি পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল। পরবর্তীতে এনইসি বৈঠকে ৭৫ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি অনুমোদন দেয়। এতে মূল এডিপি থেকে বরাদ্দ কমে যায় ৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ হিসাবে চলতি অর্থ বছরে কাঁটছাঁটের মূল কারণ এডিপি বাস্তবায়নে গতিহীনতা। প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৩৪ শতাংশ অর্থ বা ৩৩ হাজার ২০৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত অর্থবছরে একই বাস্তবায়নের হার ছিল ৩৮ শতাংশ। এর আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ৩২ শতাংশ।

শুরু থেকেই এডিপি বাস্তবায়নের হতাশাজনক চিত্র বিরাজ করায় গত বছরেই শুরু করা হয় সংশোধিত এডিপি তৈরির কাজ। বৈদেশিক সহায়তা অংশের বিষয়ে ৩০-৩১ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি-২ সম্মেলন কক্ষে দু’দিনের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ ডিসেম্বর যেসব খাতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সেগুলো হচ্ছে, কৃষি খাত, পল্লী উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠান খাত, পানি সম্পদ খাত, শিল্প খাত, তৈল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাত, পরিবহন, যোগাযোগ, ভৌত-পরিকল্পনা-পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাত, শিক্ষা ও ধর্ম এবং ক্রীড়া ও সংস্কৃতি। ৩১ ডিসেম্বর যেসব খাত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করা হয় সেগুলো হচ্ছে, স্বাস্থ্য-পুষ্টি-জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাত, গণসংযোগ, সমাজকল্যাণ মহিলা বিষয়ক ও যুব উন্নয়ন, জনপ্রশাসন, বিজ্ঞান-তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান খাত।