১৯ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সন্ধানে


ছাব্বিশে মার্চ এলেই কেন যেন আমাদের মন খারাপ হয়ে যায়। বিষণœœ হয়ে ওঠে চিত্ত। অথচ এও জানি যে, স্বাধীনতা মানেই তো অপার আনন্দ ও ভালবাসা, নিঃসীম নীল নীলিমায় অবারিত আকাশে ডানা মেলে অফুরন্ত ঘুরে বেড়ানো, সর্বোপরি বুকভরে কেবলই বিশুদ্ধ অক্সিজেন টেনে নেয়া। পাঠক, এই স্বাধীনতাটুকু কিন্তু বায়বীয় কিছু নয়। প্রতিটি মানুষই জীবনের কোন না কোন সময়ে এরকম এক অনির্বচনীয় স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করে থাকেন। এও জানি যে, স্বাধীনতার মানে একেকজনের কাছে একেকরকম। এক্ষেত্রে কেউ ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কথা বলবেন, কেউ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক। কেউ আন্তর্জাতিক আবার কেউবা ধর্মীয় স্বাধীনতার কথাও বলবেন। নারী এবং শিশু-কিশোরদের স্বাধীনতার কথাই বা বাদ থাকে কেন? অথবা, বৃহন্নলা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী- আসলে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্র ও বলয়ে উপভোগ করতে চান স্বাধীনতা। এবং এর সংজ্ঞা ও সীমাও নির্ধারণ করে থাকেন নিজ নিজ শিক্ষা-সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা, চাওয়া-পাওয়া ও কল্পনার সমন্বয়ে। আর তাই স্বাধীনতার মানে তথা সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেকরকম। তারপরও বলতেই হয় যে, স্বাধীনতা মানে স্বাধীনতা। স্বাধীন ও সার্বভৌম। ‘যেখানে আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা’। পরের অংশটুকু, মানে ‘মনে মনে’ বাদ দিয়ে। মানুষের ব্যক্তিসত্তা এবং সামাজিক সত্তা যেখানে সম্পূর্ণ বিকশিত হয়, সেটাই প্রকৃত স্বাধীনতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীনতা পদবন্ধকে নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞায় বাঁধতে গেলেই খর্ব হয় স্বাধীনতা। আধুনিক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বাধীনতাকে সংজ্ঞায়িত করে প্রকৃত অর্থে একে অনেকটা সীমিত ও সীমাবদ্ধ করে ফেলে। নৈরাজ্যবাদীরা তাই নির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো মানতে চান না। অধ্যাত্মবাদী, অঘোর সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা কি তা মানেন? মনে হয় না। কে যেন বলেছিলেন কথাটা, মানুষ জন্মগ্রহণ করে স্বাধীন হয়ে, তবে পরে সর্বত্রই সে হয়ে পড়ে শৃঙ্খলিত।

যা হোক, স্বাধীনতার বায়বীয় অথবা যথোপযুক্ত সংজ্ঞা নিয়ে কাজ নেই আমাদের। আমরা বরং বলি মার্চের কথা, ছাব্বিশ মার্চের কথা, যে মার্চে হয়েছে অমল ধবল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমর ঘোষণা। আর এই অমলিন মার্চই কিনা আমাদের কারও কারও জীবনে আসে সর্বস্বহারানো বেদনা ও বিষণœতা নিয়ে। তবে এও সজ্ঞানে জানি যে, এই স্বাধীনতা আমাদের মতো অনেক পরিবারকে উন্মূল-উদ্বাস্তু করে দিলেও শেষ পর্যন্ত তো তাও স্বাধীনতা! সে ক্ষেত্রে তো বলতেই হয়, স্বাধীনতাহীনতার চেয়ে স্বাধীনতা তো সবসময়ই চির আকাক্সিক্ষত ও কাম্য। আমরা সেই স্বাধীনতার গল্প শুনতে চাই, জানতে চাই, বলতে চাই।

এক্ষণে মনে পড়ছে বাংলাদেশের প্রধান কবি ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার কয়েকটি অবিস্মরণীয় পঙক্তি : ‘স্বাধীনতা তুমি/ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি/স্বাধীনতা তুমি/ রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার/স্বাধীনতা তুমি/ মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিত পেশী।/স্বাধীনতা তুমি/অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।’

সত্যি বলতে কি, এই স্বাধীনতার স্বপ্নই তো আমরা দেখেছি ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ কিংবা তারও আগে সত্তরের নির্বাচন, ঊনসত্তরের ১১ দফা ও গণঅভ্যুত্থান, রক্তলাল-সবুজ আমাদের মার্চের উড্ডীন পতাকায়; ১৯৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন; ১৯৫২’র ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন; এমনকি তারও আগে ১৯৪৮ সালে তথাকথিত দেশবিভাগের প্রায় পরপরই জিন্নাহর চাপিয়ে দেয়া উর্দুর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ প্রতিবাদে; ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ও উদগাতা মুহম্মদ আলী জিন্নাহ সে দেশের ‘জনক’ বা ‘জাতির পিতা’ হতে পারেন। তবে ইতিহাসের বাস্তবতা ও বিচারে এখন একথা একবাক্যে বলতেই হয় যে, তিনি আদৌ কোন বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তা না হলে তিনি কমবেশি বারো শ’ মাইলের ব্যবধানে সুদূর ও বিচ্ছিন্ন দুটো ভূখ-কে ঘিরে নিছক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীগত ভঙ্গুর রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় দুঃস্বপ্ন দেখতেন না। আবার আলোচনার টেবিলে বসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে সৃষ্ট সেই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে একটি মাত্র ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে জোর করে চাপিয়ে দেয়ার দম্ভোক্তিও করতেন না। এর অচিরাৎ প্রমাণ তিনি পেলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সংবলিত সফল আন্দোলনের মাধ্যমে। ইউনিসেফ সম্প্রতি এই মর্মে সরেজমিন সমীক্ষা ও গবেষণা করে রীতিমতো আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে যে, বহু জাতি-গোষ্ঠী ও ভাষাভাষীতে বিভক্ত পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের মাতৃভাষা উর্দু নয় বিধায় সেখানে অনৈক্য ও অবিশ্বাস দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে শোষণ-বঞ্চনাও, যা তার জাতীয় সংহতি ও সার্বভৌমত্বকেই বিপদাপন্ন করে তুলতে পারে। বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান সেই সমূহ সংকটকাল অতিক্রম করছে। উপরন্তু ভয়ঙ্কর জঙ্গীবাদী মৌলবাদী উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী ও ধর্মান্ধতার কবলে পড়ে রাষ্ট্রটি শেষ পর্যন্ত ভূমানচিত্রে তার অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারবে কিনা, সে ব্যাপারেই দেখা দিয়েছে সন্দেহ-সংশয়। পাকিস্তানের এহেন শোচনীয় দুরবস্থার জন্যও দায়ী সে দেশের একশ্রেণীর রাজনীতিবিদ, আমলা, যারা প্রধানত পাঞ্জাব প্রদেশভুক্ত; আর সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। এই ব্যাপারটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট বলা চলে। যে কারণে দেশটিতে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কখনই স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। প্রসঙ্গত আরও একটা কথা মনে পড়ছে, পাকিস্তানের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত ইকবাল যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলেন বলে বলা হয় বিভিন্ন প্রদেশের আদ্যাক্ষর ও অংশবিশেষের সমন্বয়ে, তাও মূলত ভুয়া ও অমূলক। প্রকৃতপক্ষে কোন কবিই এরকম কোন স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন যাই বলি না কেন, কোনটাই দেখেন না। বরং কবি ইকবালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি কবিতা বা গীত ‘সারা জাঁহাসে আচ্ছা হিন্দুস্তা হামারা’ খুবই সাড়ম্বরে ও শ্রদ্ধার সঙ্গে অর্কেস্ট্রা সহযোগে ভারতে সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত হয়ে থাকে প্রায় জাতীয় সঙ্গীতের সমান্তরাল পর্যায়ে। কবিতা বা গানটি প-িত জওহরলাল নেহেরুরও অতিশয় প্রিয় ছিল।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের তথাকথিত অভ্যুদয়ের মধ্যেই যে সুপ্ত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ, এ কথা আগে বলেছি। বাস্তবতা এবং অভিজ্ঞতা বলে, কয়েক হাজার বা কয়েক শ’ মাইলের ব্যবধানে দুই বা ততোধিক ভূখ- মিলে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র একটি অবাস্তব প্রক্রিয়া। এমনকি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রেও তা সম্ভব নয়। যে কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ঔপনিবেশিক ভূখ-গুলো তথাকথিত শাসন ও শোষণের নিগড় ভেঙে ক্রমে ক্রমে স্বাধীন হতে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়ে ওঠে আলোচনার টেবিলেই। যে দু’চারটি বিরল ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রয়োজন অনিবার্য ও অপরিহার্য হয়ে ওঠে, সেসব রণাঙ্গনও কিন্তু বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করেনি। কেননা, মোদ্দাকথা হলো স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন মানুষের জন্মগত ও মজ্জাগত। কোন একটি সংঘবদ্ধ ও সম্মিলিত জাতি সেই আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত করতে চাইলে তাকে ধরে বেঁধে শৃঙ্খলিত করে রাখা অসম্ভব ও অবাস্তবÑ তা সে শক্তি যত পরাক্রমশালী বা পরাশক্তিই হোক না কেন! মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সেই স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রাম শুরু হলেও বাঙালী মনে ও মননে অচিরেই সেই স্বাধীনতার আশা-আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্ন সাফল্যের সঙ্গে বুনে দিতে পেরেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কোন সন্দেহ নেই যে, ভারত আমাদের এই স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রভূত সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত জ্বলজ্বলে হিরন্ময় সত্য হলো : অমল ধবল স্বাধীনতার স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা, যার পুরোভাগে ছিলেন অকুতোভয় ও অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিব। বিবিসির বিশ্বব্যাপী পরিচালিত জরিপে বঙ্গবন্ধু যে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী নেতা, এ বিষয়েও ন্যূনতম সংশয়-সন্দেহ পোষণ না করে বলা চলে যে, তিনি তার অনুপস্থিতিতেও সফল নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিলেন বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে। এটিও ইতিহাসে একটি বিরল ও ব্যতিক্রমী ঘটনা, উপমহাদেশ অথবা বিশ্বের অন্যত্র যা প্রত্যক্ষ করা যায় না। তদুপরি বঙ্গবন্ধুর মধ্যে একই সঙ্গে মহাত্মা গান্ধী ও সুভাষ বসুর চেতনা ও দ্যুতি প্রত্যক্ষ করা যায়। ২৬ মার্চের আগে তিনি একই সঙ্গে সফল অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের মহানায়ক, অন্যদিকে অচিরেই সংঘটিত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদী অধিনায়ক। মনে রাখা আবশ্যক যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদৌ কোন পাতানো খেলা নয়। বরং দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামসহ ত্রিশ লাখ শহীদান, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অগণিত গৃহহীন উদ্বাস্তুর ত্যাগ ও তিতিক্ষার অনিবার্য ও অবধারিত সোনালী ফসল। আর এর জন্যই তো সবার কণ্ঠে সমকণ্ঠে সমোচ্চারিত হিরন্ময় জ্বলজ্বলে অজর অমর দ্বীপ্যমান সেøাগান হলো ‘জয় বাংলা’। জয়তু বাংলাদেশ। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

অবশ্য যত সহজে ও সংক্ষেপে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা গেল, বাস্তবিক ঘটনা পরম্পরা এত একরৈখিক ও সরলরেখ নয়। বরং ইতিহাসের গতিপথ সর্বদাই বহুরৈখিক, উচ্চাবচ বক্ররেখ, ঘটনার ঘনঘটা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে পরিপূর্ণ। একটি দেশ ও জাতির অভ্যুদয় ও বিকাশের পথে অবশ্যম্ভাবীভাবে থাকে বহু উপাদান, বহু মতামত ও অভিমত, একরৈখিক ও বহুবর্ণিল চরিত্র পরম্পরা, সর্বোপরি গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয় অংশগ্রহণ। ব্যক্তি সেই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়ামক উপাদান নিশ্চয়ই; হয়তোবা অপরিহার্যও। তবু চূড়ান্ত গন্তব্য শেষ পর্যন্ত মানুষই, যাকে আমরা বলি বাঙালী জাতি ও জাতিসত্তা। তবে কেন যেন বাঙালীর সেই অদ্বিতীয় ও অবিসংবাদিত ইতিহাস আজও প্রায় অনুচ্চারিত ও অনুল্লিখিত এবং অলিখিত। আমরা সেই ইতিহাসের অপেক্ষায় রইলাম।

বহু বর্ষ আগে ১২৮৭ সালে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’-এর অগ্রহায়ণ সংখ্যায় একটি সারগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘বাঙ্গালার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ শিরোনামে। তাতে তিনি আবেগতাড়িত ভাষায় অনেকটা আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, ‘বাংলার ইতিহাস নাই। নহিলে বাঙালী কখন মানুষ হইবে না।’ ইতিহাস বলতে বঙ্কিম এখানে সন-তারিখ কণ্টকিত অতীতের ঘটনার মর্জিমাফিক বা স্বকপোলকল্পিত বিবরণ বোঝাতে চাননি। বরং ইতিহাস তার অমোঘ নিয়মে কিভাবে আবর্তিত হয় ও বাঁক বদল করে; জাতীয়তাবাদী আবেগ-উদ্দীপনা, স্বজাত্যাভিমান কিভাবে দানাবাঁধে আর কিভাবেই তা একটি জাতিকে আন্দোলন-সংগ্রাম ও সশস্ত্র বিপ্লবের পথে ধাবিত করে থাকে তার বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ বোঝাতে চেয়েছেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গণআন্দোলন, সশস্ত্র সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং তার নেতৃত্ব নিয়ে সেরকম সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ কোন ইতিহাস অদ্যাবধি লিখিত হয়নি।

যতটুকু যা এ পর্যন্ত হয়েছে, সবই প্রায় বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে, যার যার নিজস্ব দষ্টিভঙ্গি, মত ও পথ থেকে, নিজের পক্ষে তথা সপক্ষে ঝোল টেনে টেনে। আর তাই বক্ষ্যমান নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হলো : বাংলাদেশ ও বাঙালীর ইতিহাস চাই। সঠিক, নিরপেক্ষ, সতথ্যনির্ভর, পরিপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস। ব্যষ্টির ও সমষ্টির। প্রশ্নœ হলো : এই ইতিহাস কে লিখবে? উত্তরও বঙ্কিমচন্দ্র থেকে ধার করে বলি : ‘তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙালী তাহাকেই লিখিতে হইবে।’ আর তাহলেই সম্পূর্ণ ও সম্পন্ন হয়ে উঠবে বাংলাদেশ ও বাঙালীর ইতিহাস।

আর যারা লিখতে পারবেন না, তারা মুখে মুখে স্মৃতি হাতড়ে বলবেন মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা ও ইতিহাস, অন্যরা তা লিখে নেবেন। এ থেকে অবশ্যম্ভাবীভাবে তৈরি হবে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবিক শ্রুতিলিখন, তথা ওরাল হিস্ট্রি বা বাচনিক ইতিহাস। আরও একটি কাজ বাকি থেকে গেছে। ডিসকভারি চ্যানেলে সম্প্রচারিত ‘আমেরিকান ডিগারস’ (খননকারী) এখন পর্যন্ত সারা যুক্তরাষ্ট্র হাল্কা ও ভারি যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফেরে মাটির নিচে বহু বছর ধরে লুকিয়ে থাকা গৃহযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নানা স্মৃতি ও স্মারক। অবশ্য এর পেছনে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যও থাকে। তবে দুর্লভ স্মৃতি-স্মারকও তো সংরক্ষিত হয় বটে। অনুরূপ করতে হবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গোটা বাংলাদেশই ছিল প্রায় বধ্যভূমি, রণাঙ্গন, সম্মুখযুদ্ধ এবং গেরিলা যুদ্ধের সুবিস্তৃত প্রেক্ষাপট। আর তাই অনিবার্য যত্রতত্র নিঃসন্দেহে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে নিহত মুক্তিযোদ্ধার হাড়গোড়, মাথার খুলি, গণকবর, ধর্ষিতার নাকের নোলক, হাতের চুড়ি, বাজুবন্ধ, পরিত্যক্ত ধনসম্পদ, গুলি-বেয়নেট-হ্যান্ড গ্রেনেড, কামানের গোলা, বেয়নেট, রাইফেল ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্য এসব অমূল্য নিদর্শন ও স্মারক সংগ্রহ করা জরুরী। জাতীয় দায়িত্বও বটে।