১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গাইবান্ধার ঝিনুকের তৈরী চুন উৎপাদনকারি পেশাজীবি যুগি পরিবারগুলো এখন বিপাকে


গাইবান্ধার ঝিনুকের তৈরী চুন উৎপাদনকারি পেশাজীবি যুগি পরিবারগুলো এখন বিপাকে

নিজস্ব সংবাদদাতা, গাইবান্ধা ॥ পান সুপারি এখনও এদেশের গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। বিয়ে-সাদী এমনকি যে কোন খানাপিনা ও মেহেমানদারীতেও পান সুপারী পরিবেশন একান্ত অপরিহার্য একটি উপাদান। এই পান খেয়ে মুখ লাল করতে এবং পান সুপারীর ঝাল এবং কষ্টা ভাবটা দুর করে একে মুখরোচক করতে যে উপাদানটি কার্যকর ভূমিকা রাখে তা হচ্ছে ঝিনুকের চুন। এই চুন ছাড়া পান খাওয়ার কথা ভাবাই যায় না।

খাল, বিল, নদী থেকে ঝিনুক কুড়িয়ে, নানা পদ্ধতিতে যারা চুন তৈরী করে তারা হলো যুগি সম্প্রদায় বা চুনারু নামে আখ্যায়িত। এ কারণে পান খাওয়ার এই ঝিনুক চুনকে যুগির চুনও বলা হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের কতিপয় যুগি পরিবার এখনও গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় তাদের আদি পেশাকে আঁকড়ে তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে।

গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্যাপুর ও সদর উপজেলার ঝিনুক থেকে চুন উৎপাদনকারি প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পেশাজীবি পরিবার এখনও নানা সমস্যা সংকট নিরসন করেও পৈত্রিক পেশাকে আঁকড়ে ধরে তাদের জীবিন জীবিকা নির্বাহ করে চলেছে। কিন্তু নদ-নদী ও খাল-বিলে ঝিনুকের সংখ্যা কমে যাওয়া, চুনা পাথর থেকে তৈরী চুনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় যুগিদের তৈরী যুগির চুনের চাহিদা হ্রাস পাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া, আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে পেশাদার যুগিরা জীবিন জীবিকার তাগিদে পৈত্রিক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের বালুয়ার বাজার সংলগ্ন যুগিপাড়া গ্রামটি এই ঝিনুকের চুনের কারিগরদের কারণে ইতোমধ্যে চুনের গ্রাম নামেই সর্বাধিক পরিচিত অর্জন করেছে। এই যুগিপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে স্বাধীনতা পূর্বকালে প্রায় ২শ’ ৩০টি পরিবারের বসতি ছিল। যারা ঝিনুকের চুন তৈরী করে খুব স্বচ্ছল জীবন যাপন করতো। কেননা, সে সময় চারদিকে নদী বেষ্টিত এ জেলায় ঝিনুক পাওয়া যেত অনেক বেশী। সে জন্য চুনও উৎপাদিত পরিমাণও ছিল নেহায়েত কম নয়। উৎপাদিত চুন এখান থেকে যেতো পার্শ্ববর্তী জেলায়। ফলে দাম বেশী পাওয়া যেতো বলে তখন চুনের কারবার ছিল রমরমা। কিন্তু এখন সে অবস্থা আর নেই।

সম্প্রতি রামচন্দ্রপুরের যুগিপাড়ায় মাত্র ৫৫টি পরিবার তাদের পুরাতন এই চুন তৈরীর পেশাকে আঁকড়ে রেখেছে। পরিবারের নারী-পুরুষ মিলে এই চুন তৈরীতে নিয়োজিত থাকে। যুগিরা ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী বালাসীঘাট, কামারজানি, করতোয়া নদীর বড়দহ ঘাটসহ বিভিন্ন এলাকার জেলেদের কাছ থেকে নদীর ঝিনুক কেনে। মাছ ধরার সময় জালে যে ঝিনুক ওঠে, স্থানীয় ভাষায় সেগুলোকে বলা হয় ‘সিপি’ বা ‘টোকরাই’। জেলেরা তা জমা করে রাখে যুগিদের জন্যই। তারপর এগুলোকে তারা গরম পানিতে সিদ্ধ করে, যাতে সেগুলো মরে যায় এবং এতে সহজেই খোলসা দুটো ফাঁক হয়ে খুলে যায়। এরপর যুুুুগি পরিবারের মেয়েরা প্রতিটি ঝিনুক থেকে ভেতরের নরম অংশগুলো বের করে নেয়। যা হাঁস-মুরগীর অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং প্রিয় খাবার হিসেবে হাঁস-মুরগী খামারীদের কাছে বিক্রি হয়।

এ অবস্থায় ঝিনুক এর খোলসাগুলো পানিতে ধুয়ে পরিস্কার করে রোদে শুকানো হয়। সবশেষে চুনের ভাটিতে আগুনে পুড়িয়ে তা ছাঁই করা হয়।

ইদানিং সমুদ্রের সাদা শংখ এবং সাদা রঙ্গের ঝিনুক থেকেও চুন তৈরী হচ্ছে পার্শ্ববর্তী বগুড়াসহ অন্যান্য জেলায়। যে চুনে এসিড মিশিয়ে সাদা ধব্ধবে করা হয়। আর যুগিদের চুনে কোন কেমিকেল মেশানো হয় না বলে তার রং হয় একটু কালচে। ফলে সংগত কারণে ধব্ধবে এই সাদা শংখের চুনের দাম বেশী হলেও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না যুগিদের বানানো চুন।

আদি চুন শিল্পী কান্তেশ্বর, বিষ্ণু, গোবিন্দ যুগিদের দাবী, আর্থিক কারণে তারা আদি এই গ্রামীণ শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারছে না। এ জন্য সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা দেয়া হলে তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে এবং এই ঝিনুকের চুন শিল্পও বিকশিত হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: