১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

লাল ফিতায় নিয়োগ আটকা, শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম


বিভাষ বাড়ৈ ॥ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নিয়োগ বন্ধ থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীশূন্য হওয়ার উপক্রম হয়েছে দেশের দুই শতাধিক সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দেশের ৩৩৩ বিদ্যালয়ে দুই হাজারেরও বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য হয়ে পড়ে আছে। খোদ প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৯৬ স্কুল। উপজেলা পর্যায়ের ১৪১ বিদ্যালয় চলছে মাত্র ৩-৪ জন শিক্ষক দিয়ে। ৮২ ডাবল শিফটের স্কুলে অফিস সহকারী ও এমএলএসএস নেই। কর্মচারীর পদ শূন্য আরও কয়েক হাজার। অনেক বিদ্যালয়েই ইংরেজী, গণিত, হিসাববিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়ে কোন শিক্ষক নেই। জোড়াতালি দিয়ে কোনক্রমে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের এই বেহাল চিত্রে উদ্বিগ্ন শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদসহ সকলেই।

সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শূন্যতায় উদ্বিগ্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন। পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, খুবই খারাপ অবস্থা। দুই হাজারের ওপরে শিক্ষক পদ শূন্য। প্রধান শিক্ষকও নেই ৯৬ বিদ্যালয়ে। দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রশাসনের কাজের সঙ্গে জড়িত এ মহাপরিচালক জানান, এখন এমন হয়েছে যে, প্রধান শিক্ষকের জন্য উপযুক্ত সহকারী শিক্ষকও খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ফলে পদোন্নতি দিয়েও শূন্যপদ পূরণ করা সম্ভব হবে না। তবে মহাপরিচালক আশা প্রকাশ করেছেন, শীঘ্রই নিয়োগ বিধিমালা চূড়ান্ত হবে। বিধিমালা হয়ে গেলেই দ্রুত সরকারী কর্ম কমিশন নিয়োগ পরীক্ষায় যেতে পারবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়োগে দেরি হওয়ায় আমরা পিএসসির কাছে সুপারিশ করেছিলাম যাতে বিসিএসে যারা ক্যাডার পদ পায়নি, যাদের নন-ক্যাডারের জন্য বিবেচনা করা হয় তাদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে। সেটা আর হয়নি। তবে এবার বিধিমালা হয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হবে বলে আমরা আশা করছি। এদিকে কেবল শিক্ষক সঙ্কটই নয়, এছাড়াও বিদ্যালয় পরিদর্শক, সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মোট ৯৪৯ পদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৪১৭ কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকি ৫৩২ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে সরকারী হাই স্কুলে একাডেমিক তদারকি ও নজরদারিও প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। স্থবির হয়ে পড়েছে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম।

বাগেরহাটের একটি সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হতাশা প্রকাশ করে বলছিলেন, আমার বিদ্যালয়ে ছাত্রী আছে ৪৮০। কিন্তু ১৮ শিক্ষকের পদের মধ্যে শিক্ষক আছেন মাত্র ১০। ইংরেজী, শারীরিক শিক্ষা, চারুকারু বিষয়ে কোন শিক্ষক নেই। সহকারী প্রধান শিক্ষক ও অফিস সহকারী (দুটি পদ) নেই। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পাঁচ পদের মধ্যে মাত্র একজন কর্মরত আছে। জনবল স্বল্পতার কারণে শ্রেণী কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসনিক কার্যক্রমও কোনক্রমে চলছে। একই কথা জানালেন মাদারীপুর, বরিশাল, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, টাঙ্গাইলসহ ঢাকার বাইরের অধিকাংশ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা।

এ বিষয়ে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক এলিয়াছ হোসেন বলেন, নতুন নিয়োগ বিধিমালা না থাকায় পিএসসি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না। আবার শিক্ষা, অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদিত হলেও নতুন নিয়োগ বিধিমালা সচিব সভায় উত্থাপন হচ্ছে না। কিন্তু শিক্ষকদের এলপিআরে (অবসরকালীন ছুটি) যাওয়াও ঠেকাতে পারছি না। এজন্য শিক্ষকস্বল্পতা খারাপ পর্যায়ে যাচ্ছে। মহাপরিচালকের মতো তারও আশা শীঘ্রই সমস্যার সমাধান হবে। দ্রুত নিয়োগ বিধিমালা চূড়ান্ত হবে। তবে তারা যাই বলুক না কেন, শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কেবল আমলাদের ইচ্ছাকৃত বিলম্বের কারণেই একটি নিয়োগ বিধিমালা করতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে। মাউশি বিধিমালার খসড়া বহু আগে জমা দিলেও এক দফতর থেকে আরেক দফতর, এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে যাওয়া-আসা ছাড়া কিছুই হচ্ছে না।

আমলাদের গাফিলতিতে সমস্যা বুঝতে পারলেও মাউশি তা সমাধান করতে পারছে না। কারণ এক সময় মাউশির হাতে এ নিয়োগের ক্ষমা থাকলেও এ শিক্ষকরা তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদাপ্রাপ্ত হওয়ার পর নিয়োগের ক্ষমতা পেয়েছে পিএসসি। তবে ক্ষমতা পাওয়ার পর নিয়োগ বিধিমালার অভাবে সময় চলে যাচ্ছে বছরের পর বছর।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) জানায়, সর্বশেষ ২০১০ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ২০১২ সালে সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট এক হাজার ৯০৩ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। পরে ২০১২ সালের ১৫ মে সরকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ‘সেকেন্ড ক্লাস গেজেটেড’ মর্যাদা প্রদান করে। আগে সহকারী শিক্ষকরা ‘থার্ড ক্লাস গেজেটেড’ মর্যাদা পেতেন। শিক্ষকদের ‘সেকেন্ড ক্লাস গেজেটেড’ মর্যাদা প্রদানের পর তাদের নিয়োগ এখতিয়ার সরকারী কর্মকমিশনের (পিএসসি) অধীনে চলে যায়। এতে নতুন নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন হয়। পিএসসিতে নিয়োগের জন্য আবেদন করলে সংস্থাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানায়, নতুন বিধিমালা না হলে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যাবে না।