২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য


নিখিল মানখিন ॥ প্রায় ৫৬ শতাংশ এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ কাজ করছে না। রোগীদের দেহে এ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতা বেড়েছে। জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রথাগত এ্যান্টিবায়োটিক কাজে আসছে না। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের রোগীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। গত বছরের ১৪ নবেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৩ মার্চ পর্যন্ত এ গবেষণার কাজ করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)। দেশের সরকার স্বীকৃত গবেষণাগারে এসব পরীক্ষা করা হয় বলে জানায় পবা। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন হাসপাতালের ওষুধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে যে পরিমাণ এ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হচ্ছে তার অর্ধেকই ব্যবহৃত হয় গবাদিপশু উৎপাদনে, যা মানুষের জন্য ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বয়ে আনছে। এভাবে বিভিন্ন কারণে বিশ্বে ওষুধ প্রতিরোধী জটিল আকার ধারণ করেছে। অনেক সংক্রামক রোগ খুব সহজে ভাল হচ্ছে না। একের পর এক ওষুধ অকেজো হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল করে তোলার পাশাপাশি অকালে মৃত্যু ডেকে আনছে।

পবার সাধারণ সম্পাদক লেনিন চৌধুরী বলেন, মানবদেহে এ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধি মানবসভ্যতার জন্যই বিরাট হুমকি। শরীরে অপরিকল্পিত এ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এর অন্যতম কারণ। এছাড়া মুরগি ও মাছের খামারেও ব্যবহৃত এ্যান্টিবায়োটিকে এসব ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং সব দেশের সরকার ও সমাজকে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বে যে পরিমাণ এ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হচ্ছে তার অর্ধেকেই ব্যবহৃত হয় গবাদিপশু উৎপাদনে, যা মানুষের জন্য ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বয়ে আনছে। ফাস্টফুডের বার্গার, স্টেক বা গরুর দুধ এগুলোর বেশিরভাগই আসে এভাবে উৎপাদিত প্রাণী থেকে। এসব খাবার খাওয়ার ফলে মানুষের সাধারণ শরীরে এ্যান্টিবায়োটিক কাজ করার মাত্রা কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে গবাদিপশু উৎপাদনে এ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কতটা রয়েছে এবং তা মানবদেহের জন্য কী ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারেÑ এ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, সমস্যাটা হলো প্রাণী দেহের জীবাণুর কারণে যে অসুখ হবে তার জন্য প্রাণী দেহের নির্দিষ্ট এ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করতে হবে। কিন্তু এখন যেটা হচ্ছে মানুষের জন্য নির্দিষ্ট এ্যান্টিবায়োটিক সেগুলো দিয়ে প্রাণীর চিকিৎসা করা হচ্ছে। মানবদেহের এন্টিবায়োটিক বেশি মাত্রায় কড়া এবং নতুন ধরনের হয়ে থাকে। বলা আছে মানবদেহের এ্যান্টিবায়োটিক যেন প্রাণীদের না খাওয়ানো হয়। কিন্তু এখন সেটাই করা হচ্ছে।

আ ব ম ফারুক আরও বলেন, অনেক কোম্পানি আছে যারা ফিস ফিড, ক্যাটেল ফিড, পোল্ট্রি ফিড তৈরি করার সময় এ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দিচ্ছে। সেখানে মানুষের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত এ্যান্টিবায়োটিক এবং পশুর চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট এ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে জীবাণুর শরীরে এ্যান্টিবায়োটিক রেজিটেন্স তৈরি হচ্ছে।

খাবারে এ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে পশু মোটাতাজাকরণের সঙ্গে কোন সম্পর্ক আছেÑ এর উত্তরে আ ব ম ফারুক বলেন, কোম্পানিগুলো বলছে সামান্য পরিমাণ এ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দেয়ার ফলে গরু, মুরগি, মাছ রোগমুক্ত থাকবে, তাদের সুস্বাস্থ্য বজায় থাকবেÑ এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক দিক চিন্তা করে এ কাজটা করছে। শুধু আামদের দেশে নয়, সারাবিশ্বেও খামারিরা সরল বিশ্বাসে এগুলো কিনে নিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ্যান্টিবায়োটিকের কোন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। যদি রোগ প্রতিরোধ করতে হয় তাহলে টিকা দিতে হবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করে নিচ্ছে, যার ফলে আমাদের শরীরে এ্যান্টিবায়োটিক রেজিটেন্স তৈরি হচ্ছে। এটা সারা পৃথিবীর সমস্যা কিন্তু বাংলাদেশে এর প্রভাব বেশি সেটাই সমস্যা।

আ ব ম ফারুক বলেন, যেসব পশুকে এ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে সেই পশুর রক্তের সংস্পর্শে, পশুর সংস্পর্শে আমরা সংক্রমিত হতে পারি। আরেকটা বিষয় হলো যেসব পশুর শরীরে এ্যান্টিবায়োটিক রেজিটেন্স জীবাণু তৈরি হয়েছে তারা যে মল ত্যাগ করছে সেগুলো পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এবং সেখান থেকে অন্যান্য জিন ট্রান্সফরমেশন ঘটছে। এভাবে একটা মহামারি ব্যাপার নীরবে ঘটে যাচ্ছে কিন্তু আমরা টের পাচ্ছি না। আমরা সে কারণে বলছিÑ দুধ, মাছ, মাংস যাই খাই না কেন এগুলোর মধ্যে সামান্য পরিমাণে এ্যান্টিবায়োটিক চলে আসছে। এর ফলে প্রধান ঝুঁকিটা হলো আমরা ওই এ্যান্টিবায়োটিক রেজিটেন্স হয়ে যাই। এর ফলে সাধারণ সমস্যাগুলো এ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে আর চিকিৎসা করা সম্ভব হবে না। আমরা আশঙ্কা করছি একটা সময় আসবে আমরা যদি এ সমস্যাগুলো বন্ধ না করি তাহলে অতি সাধারণ সংক্রমণে মানুষ মারা যাবে।

ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞ চিকিৎসকরাও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডাঃ এবিএম আব্দুল্লাহ জানান, এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সমাদৃত এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে যার অবদান অবিস্মরণীয়। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, অপব্যবহারের কারণে এ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ক্ষমতা কোন কোন জীবাণু ধ্বংসের ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশেও এ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কম নয়। মানুষ কোন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেই প্রাথমিকভাবে তার নিকটবর্তী দোকান থেকে ওষুধ কিনে খেতে পারে। ওষুধ কিনতে কোন বাধ্যবাধকতা না থাকায় এবং ডাক্তারের কোন প্রেসক্রিপশন না লাগায় মানুষ সহজেই এ কাজটি করছে। এটি হচ্ছে জনসচেতনতার অভাবে। ফলে অপরিমিত ও মাত্রাহীন ওষুধ খাওয়ার ফলে এর জীবাণুনাশক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা রোধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া দরকার জানিয়ে রুহুল হক বলেন, এ বিষয়ে আইন আছে। কিন্তু আইন প্রয়োগ করাটাই হচ্ছে কঠিন কাজ। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের লোকবল বাড়ানো হলে এ বিষয়ে কিছুটা উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, এ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই বিবেকবান হতে হবে। ফার্মেসিগুলো নিয়ন্ত্রণে না এলে এবং জেনারেল প্র্যাক্টিশনার্স চিকিৎসকরা যতক্ষণ পর্যন্ত বিবেকবান না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে না। মেডিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত না হয়ে অপ্রয়োজনে এ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া ঠিক নয় বলে মনে করেন ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্ত।

ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার সারাবিশ্বকে আজ ভাবিয়ে তুলেছে। এমন অবস্থা মোকাবেলায় জরুরীভিত্তিতে ছয়টি করণীয় তুলে ধরেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সেগুলো হলোÑ প্রতিটি দেশকে সম্মিলিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা উচিত। পর্যবেক্ষণ ও ল্যাবরেটরি ক্যাপাসিটি বাড়ানো দরকার। প্রয়োজনীয় ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধসহ ওষুধের গুণাগুণ নিশ্চিত করতে হবে। ওষুধের ব্যবহার ভালভাবে মনিটরিং করতে হবে। সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। শক্তিশালী গবেষণার পাশাপাশি চিকিৎসার নতুন নতুন ওষুধ ও উপকরণের বিস্তার ঘটাতে হবে।