১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সঙ্কটে গণপরিবহন ॥ লোকসানের কারণে বিনিয়োগে অনীহা


সঙ্কটে গণপরিবহন ॥ লোকসানের কারণে বিনিয়োগে অনীহা

রাজন ভট্টাচার্য ॥ রাজধানীতে চলাচল করছে মাত্র চার হাজার বাস-মিনিবাস অথচ দিনে অন্তত ৬ লাখ মানুষ নানা প্রয়োজনে আসছেন এই শহরে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি। তাই দিনে অন্তত ২১ লাখ পরিবহন ট্রিপের প্রয়োজন। কিন্তু যানজটে ২১ লাখের তিনভাগের একভাগ ট্রিপও হচ্ছে না। পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানীর প্রতি ৩ হাজার যাত্রী যাতায়াতের জন্য বাস ও মিনিবাস আছে মাত্র ১টি। তাছাড়া অটোরিক্সাগুলোর এক-তৃতীয়াংশ অচল। গণপরিবহনের সঙ্কটের বিপরীতে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে।

বিআরটিএ’র হিসাব বলছে, ঢাকায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মোটরসাইকেল, ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৮৭টি প্রাইভেটকার রয়েছে। সব মিলিয়ে যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এর মধ্যে গণপরিবহন আছে নামেমাত্র। লন্ডন শহরে একটি বাস ঘণ্টায় ১৮ কিলোমিটার অতিক্রম করে। ঢাকায় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৭ কিলোমিটার। এই প্রেক্ষাপটে রাজধানীতে গণপরিবহন বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। সেই সঙ্গে যানজট নিরসনের বিষয়টি তো আছেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পরিবহন সঙ্কট সমাধানে গেল আট বছর ধরেই নানা পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। কোনটারই গতি নেই। সঙ্গত কারণেই সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেখানেই রয়েছে। সঙ্কট সমাধানে গতি মন্থর হওয়ায় বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে আছে নানা রকম যুক্তি।

প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর রাজধানী ঢাকা। আয়তন ও আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী রাজধানীতে সোয়া দুই লাখ পরিবহন চলতে পারে। সরকারী হিসাব অনুযায়ী চলছে সাড়ে নয় লাখ যান্ত্রিক পরিবহন। এর মধ্যে গণপরিবহনের সংখ্যা ১৫ হাজারেরও কম। বাস্তবতা উপলব্ধি করেই গণপরিবহন বাড়ানোর উদ্যোগ এক যুগের বেশি সময়েও বাস্তবায়ন হয়নি। এ জন্য সরকারের সদিচ্ছা ও পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে মাফিয়া চক্রকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ট্যাক্সিক্যাব, বাস, অটোরিক্সাসহ কোনকিছুই পর্যাপ্ত নয় অথচ নগরীর প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। তবে পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ বলছেন, যানজটের কারণে পরিবহন খাতে বেসরকারী বিনিয়োগ দিন দিন কমছে। গেল সাত বছরের বেশি সময়ে ৫০টির বেশি পরিবহন কোম্পানি বন্ধ হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, রাজধানীর মানুষের যাতায়াত সমস্যা সমাধানের জন্য ২০১৭ সালের মার্চের মধ্যে তিন হাজার পাবলিক বাস চালু করা হবে। এ অনুয়ায়ী কাজও চলছে। ইতোমধ্যে বাস মালিক সমিতির সঙ্গে কথা হয়েছে। বর্তমানে থাকা ১৯০টি বাস কোম্পানিকে পাঁচটিতে নামিয়ে আনার বিষয়ে ডিএনসিসির সঙ্গে মালিকরা একমত হয়েছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, জনসংখ্যার অনুপাতে রাজধানীতে কমপক্ষে ২০ হাজার বাস প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ট্যাক্সি ও অটোরিক্সার বিকল্প নেই। যানজট, অব্যাহত লোকসান, যন্ত্রপাতিতে মাত্রাতিরিক্ত শুল্কসহ নানা কারণে বাস নামাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, নতুন করে বাস নামানো একেবারেই অনিশ্চিত। বন্ধ হয়ে গেছে এসি বাস সার্ভিসগুলো। তিন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রায় আট হাজার অটোরিক্সা নামানো প্রক্রিয়া আটকে আছে দীর্ঘদিন। ভাড়া বেশি, যানজটসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় নতুন করে প্রায় এক হাজার ট্যাক্সিক্যাব নামানো হচ্ছে না। লোকসানের কারণে যাও নেমেছিল সেগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। সিদ্ধান্তহীনতায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রায় ৪০০ বিআরটিসি বাস কেনার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ পরিবহন মালিক, নগর পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্টদের।

নতুন বাস নামানোর চ্যালেঞ্জ ॥ পরিবহন সঙ্কট সমাধানে রাজধানীতে আরও তিন হাজার বাস নামানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক ও পরিবহন মালিক সমিতির উদ্যোগে এ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, অতিমাত্রায় ব্যাংক লোনের কারণে বেসরকারী খাতের মালিকরা ঢাকার রাস্তায় গাড়ি নামাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরুৎসাহিত ছিলেন।

গণপরিবহন সমস্যা নিরসনে সরকারের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সম্প্রতি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, রাজধানীতে গণপরিবহন সঙ্কট সমাধানে করণীয় প্রসঙ্গে বলেন, ১০০টি এসি বাস ও ২০০টি দোতলা বাস নামানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি কোম্পানিকে বাস নামানোর অনুমতি দেয়ার কথা জানান তিনি।

যানজট মুক্ত, প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ ও শুল্কমুক্ত সুবিধা চান মালিকরা ॥ রাজধানীতে মাত্রাতিরিক্ত যানজট, রাস্তা ও ফুটপাথ দখল, গাড়ি-যন্ত্রাংশ আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক ও প্রাইভেটকারের কারণেই নতুন নতুন বাস নামাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বেসরকারী খাতের পরিবহন মালিকরা। তারা বলছেন, উন্নত দেশগুলোতে নগর সুরক্ষা ও জনস্বার্থে কঠিন কঠিন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিবেচনায় উদ্যোগ নেয়া হয়। তারা বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে যে এলাকার বসবাস করেন সে এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের পড়াশোনা করানো বাধ্যতামূলক। ঢাকায় সব ব্যতিক্রম। নামী-দামী স্কুলগুলোতে ভর্তির প্রতিযোগিতা। প্রতিটি বিত্তবান শিক্ষার্থীর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে একটি প্রাইভেটকার। এক ভিকারুননিসা স্কুলের তিন ক্যাম্পাসে ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন রাজধানীতে নামছে অন্তত ১০ হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ জনকণ্ঠ’কে বলেন, যানজটের কারণে বাস মালিকরা এখন আর গাড়ি চালাতে পারছেন না। নগরীতে প্রায় ২০ হাজার বাসের প্রয়োজন থাকলেও আছে মাত্র চার হাজার অথচ বিআরটিএ থেকে অনুমোদন নেয়া আছে সাত হাজারের। তবে গেল দুই বছরে অনুমোদিত প্রায় ৮০০ নতুন বাস রাস্তায় নেমেছে। বাস নামানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কাউন্টারের জন্য কোন অনুমোদন নেই, পার্কিং সুবিধা নেই, যানজট, পুরনো গাড়ির রুট পারমিট দেয়া বন্ধ, মাত্রাতিরক্ত শুল্ক ধরা হয়েছে। তাই অব্যাহত লোকসানের মুখে গাড়ি ব্যবসা এখন আর ভাল যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, জনস্বার্থে গণপরিবহন বাড়াতে হলে, পার্কিং বে করার পাশাপাশি প্রাইভেটকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে প্রাইভেটকারে সিএনজি সরবরাহ একেবারে বন্ধের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ট্যাক্সি নামানোর সময় মালিকদের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া হয়েছে। নতুন বাস নামানো ও পার্টস আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এসব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে দিন দিন রাজধানীতে চলা বাসের সংখ্যা আরও কমবে। বাড়তে সঙ্কট।

নগর পরিকল্পনাবিদরা যা বলছেন ॥ রাজধানীতে গণপরিবহনের সঙ্কটের জন্য সরকারের ‘উদাসীনতাকে’ দায়ী করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। পরিবহন মালিকদের কণ্ঠেও সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। তারা বলছেন, কর্তৃপক্ষের ‘উদাসীনতার কারণেই’ নগর পরিবহন খাত ধ্বংস হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। সরকারের পরিকল্পনার অভাব, পর্যাপ্ত বাসস্ট্যান্ড না থাকা, যানজট আর যন্ত্রপাতির দাম বাড়ায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। বছর দশেক আগে ঢাকার সড়কে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বাস চলাচল করত বলে বাস মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। এই সময়ে ঢাকায় মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হলেও কমেছে বাসের সংখ্যা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর ১৬৮টি রুটে চলাচলকারী বাসের সংখ্যা ৫ হাজার ৪০৭টি। এর মধ্যে মিনিবাস ৩ হাজার ১২৬টি আর বাস আছে ২ হাজার ২৮১টি। বিআরটিএ এ হিসাব দিলেও পরিবহন মালিকদের হিসেবে, রাজধানীতে চলাচলকারী বাসের সংখ্যা চার হাজারেরও কম।

গণপরিবহন সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বলেন, দেড় কোটির বেশি জনসংখ্যার এ শহরে বাস প্রয়োজন অন্তত ১২ থেকে ১৩ হাজার। এ সংখ্যা বর্তমানে তিন হাজারের মতো। এর প্রধান কারণ সরকার গণপরিবহন নিয়ে মাথা ঘামায় না। ঢাকায় যানজটের কারণে বাস মালিকরাও কাক্সিক্ষত সংখ্যায় ট্রিপ পান না। আর এ কারণে তারাও এ সেবা নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী নন। সড়কে গণপরিবহন হিসেবে বাসের সংখ্যা কমায় ক্রমশ ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে বলেও মনে করেন এ নগর পরিকল্পনাবিদ।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তথ্যানুসারে, এক হাজার ৫২৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঢাকায় সড়ক রয়েছে দুই হাজার ৫৫০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে প্রধান সড়ক ৮৮ কিলোমিটার, যার বেশিরভাগই দখল করে নেয় ব্যক্তিগত যানবাহন। দুই বছর আগের এক হিসাবে দেখা যায়, মোট যানবাহনের মধ্যে ঢাকায় চলাচলকারী মানুষের মাত্র ছয় শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন অথচ এই গাড়িগুলোই সড়কের ৮০ শতাংশ জায়গা জুড়ে থাকে।

নতুন ট্যাক্সি নামানো হচ্ছে না ॥ ২০১৪ সালের ২৩ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয় নতুন ৪৬টি ট্যাক্সিক্যাব। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১৯টি ও ঢাকায় ২৭টি। ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেস প্রাথমিকভাবে টয়োটা ব্র্যান্ডের জাপানে নির্মিত ১৫০০ সিসির ২৭টি ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা করছে। অপর বেসরকারী সংস্থা তমা গ্রুপ একই ব্র্যান্ডের ১৯টি ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা করবে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: