১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

তাসকিনকে ফেরাতে লড়াই চলবে


মোঃ মামুন রশীদ ॥ বিশ্বকাপের আগেও অনেকে বলেছিলেন এবার সুপার টেনের গ্রুপ-২’এ সব ল-ভ- করে দেবে টাইগাররা। এমনটা সাবেক বিশ্ব তারকারা, ক্রিকেট বিশ্লেষকরা এবার টি২০ বিশ্বকাপের আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সে কারণেই বাঙ্গালী অধ্যুষিত কলকাতার ইডেন গার্ডেনে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে ভারতের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সার্বভৌমিক এবং সার্বিকক্ষেত্রে পাকিস্তানের চিরশত্রু হওয়া সত্ত্বেও তারা সমর্থন দিয়েছে পাকদের। বিস্ময়করভাবে সমর্থন না পাওয়াতে বিমূঢ় হয়েই যেন বাজে হার দিয়ে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ যাত্রা। ক্রমেই ক্রিকেট পরাশক্তি হয়ে ওঠা বাংলাদেশ দলকে নিয়ে যেন ‘ক্রিকেট মোড়লরা’ নিজেদের টলায়মান সিংহাসন শক্ত করতে ষড়যন্ত্রের পথে হেঁটে চলেছে এমন শঙ্কাই এখন দানা বাঁধছে। প্রাথমিক রাউন্ডে হল্যান্ডের বিরুদ্ধে বোলিং এ্যাকশনে ত্রুটি ধরার পর পেসার তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানিকে নিষিদ্ধও করা হয়েছে। কিন্তু তরুণ তাসকিনকে নিয়ে বিস্ময়টা কাটছে না কারও। কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহে, বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ভিডিও এ্যানালিস্ট সবার দাবি তাসকিনের এ্যাকশনে ত্রুটি নেই। যে কারণে তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে আইসিসির আইনী ধারা অনুসারে শুধু মাঠ আম্পায়াররা সতর্কবাণী দিলেই যথেষ্ট হতো এমন দাবিও করেছেন বিসিবির আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান। আর সবকিছু বিবেচনা করে বিসিবি এবার তাসকিনের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপীলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে বিসিবি পরিচালকরা এ বিষয়ে আলোচনাও করেছেন। রবিবার সেই বৈঠক শেষেই পাপন এসব কথা জানান।

ক্রমেই ক্রিকেট পরাশক্তিদের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে টাইগাররা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তিন মোড়লের (অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও ভারত) সবচেয়ে ‘বড় মোড়ল’ ভারত কি সেটা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল? বেশ আগে থেকেই প্রশ্নটা শুরু হয়েছে পুরনো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান দলের ক্রমাগত পশ্চাদধাবন এবং বাংলাদেশ দলের ঈর্ষণীয় নৈপুণ্য ভারতের অন্যতম প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে টাইগারদের। শুরুটা গত বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপ থেকেই। ১৯ মার্চ, মেলবোর্ন। বিতর্কিত আম্পায়ারিং, সুরেশ রায়নার বিরুদ্ধে দেয়া প্রশ্নবিদ্ধ নো বল পুরো বাংলাদেশকেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তখন থেকেই দুইদেশের মধ্যে ক্রিকেট-যুদ্ধটা অন্য এক মাত্রা পায়। বিশ্বকাপের পরেই ঘরের মাটিতে মহেন্দ্র সিং ধোনিদের ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে চরম প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। ময়দানের চিরশত্রু হিসেবে নতুন পরিচয় ঘটে বাংলাদেশ-ভারতের। এসব কারণেই এখন বাংলাদেশ দলকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়ে, পরাশক্তি হিসেবে মাথাচাড়া দেয়ার আগে গোড়াতেই ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রের গন্ধটা তীব্র হয়েই লাগছে ১৬ কোটি বাংলাদেশী ক্রিকেটপ্রেমীদের বুকে। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে আজ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দারুণ ফর্মে থাকা তাসকিনকে পাবে না বাংলাদেশ। সেই ১৯ মার্চই আসলো আরেকটি নীতিগতভাবে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।

তরুণ তাসকিন সর্বশেষ কয়েকটি ম্যাচে ধারাবাহিকভাবেই প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের চাপে রাখতে পেরেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। এশিয়া কাপ খেলেছেন, কিন্তু এ্যাকশনে ত্রুটি ধরা হয়নি। বিশ্বকাপের মতো বড় একটি আসরের মাঝপথে যখন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য বোলার হয়ে উঠেছেন তখনই তার বোলিংয়ে খুঁত ধরা হলো। তড়িঘড়ি পরীক্ষা নেয়া হলো এবং নিষিদ্ধ করা হলো বিস্ময়করভাবে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যায় বিসিবি আইন পরামর্শক মুস্তাফিজুর বলেন, ‘তাসকিনের স্টক ডেলিভারি ও ইয়র্কারে কোন সমস্যা পায়নি আইসিসি। কিন্তু বাউন্সারে সমস্যা পাওয়া গেছে। অথচ হল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে তাসকিন আহমেদের করা চার ওভারে কোন বাউন্সার ছিল না। কর্তব্যরত দুই আম্পায়ার ভারতের এস রবি ও অস্ট্রেলিয়ার রড টাকার তাসকিনের স্টক ও ইয়র্কার নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পরীক্ষায় এ দুটি নিয়ে ইতিবাচক ফলাফল আসে। সুতরাং পরীক্ষাগারে তাসকিনের বাউন্সারের পরীক্ষা নেয়ার কথা না। কিন্তু চেন্নাইয়ের আইসিসি অনুমোদিত ল্যাবে দ্রুত সময়ের (৩/৪ মিনিট) মধ্যে ৯টি বাউন্সার করতে বলা হয় তাসকিনকে। যার মধ্যে তিনটি অবৈধ প্রমানিত হয়। আইসিসির ২.২.১৩ ধারার নিয়ম অনুযায়ী কোন বোলারের নির্দিষ্ট কোন ডেলিভারি কিংবা স্টক ডেলিভারিতে সমস্যা থাকলে সেই বোলারকে সতর্ক করে দেয়ার নিয়ম আছে। স্টক ডেলিভারি ছাড়া অন্য কোন ডেলিভারিতে কনুই ১৫ ডিগ্রীর বেশি বাঁকা হলেও আইসিসি কোন বোলারের বোলিং নিষিদ্ধ করতে পারে না।’

তিনি বিসিবিকে সুইজারল্যান্ডের ক্রীড়া-সালিশ নিষ্পত্তি আদালতে আপীলের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এবার চেন্নাই পরীক্ষার পুরো রিপোর্ট পর্যালোচনা করে সেদিকেই এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা বিসিবির। কারণ তাসকিন নিজে পরীক্ষা দেয়ার পর যেমন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, তেমনি কোচসহ দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই তাসকিনের শুদ্ধতার বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। বিসিবির ভিডিও এ্যানালিস্ট দিয়ে হল্যান্ড ম্যাচ ছাড়াও তাসকিনের বিভিন্ন সময়ের বোলিং পরীক্ষা করা হয়েছে। আম্পায়ারদের আনা অভিযোগ, রামাচন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে হওয়া তাসকিনের বোলিং এ্যাকশন পরীক্ষা এবং আইসিসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের যথার্থতা বিবেচনা করে দেখছেন আইনজীবীরা। এ বিষয়ে বিসিবি সভাপতি পাপন বলেন, ‘কোন দেশের বোলার নিষিদ্ধ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত যত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, এবারের মত কেউ নেয়নি। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরেও চেষ্টা করছে বিসিবি।’ সাধারণ প্রক্রিয়া হলো বিষয়টি নিয়ে আপীল করা। কিন্তু সেটি শেষ হতে একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিসিবি তাই ক্রিকেটীয় কূটনীতির পথও খোলা রাখছে। বিসিবি সভাপতি এরই মধ্যে আইসিসি চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর ও প্রধান নির্বাহী ডেভ রিচার্ডসনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।’ তবে ক্রিকেট কূটনীতি ব্যর্থ হলে আইনী প্রক্রিয়ায় তাসকিনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সব ব্যবস্থাই গুছিয়ে রাখছে বিসিবি। দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটভক্তও চান তাসকিনের জন্য লড়াই হোক, অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোক বিসিবি।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: