মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ আগস্ট ২০১৭, ৫ ভাদ্র ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

জাগে না ডানা ভাঙ্গা ফিনিক্স পাখি

প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৬
  • জাফর ওয়াজেদ

গ্রীক উপকথার সেই ফিনিক্স পাখির মতো ভগ্নস্তূপ থেকেই আপন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে নতুন উদ্যমে জেগে ওঠার পরাবাস্তব ভরসা নিয়ে বিএনপি তাদের কাউন্সিল সম্পন্ন করেছে। কিন্তু এই আয়োজন থেকে সুস্পষ্ট এমন কোন অবস্থান দৃশ্যমান হয়নি, যাতে দুর্নীতিবাজ, জঙ্গীবাদের পৃষ্ঠপোষক ও পালক এবং যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকার পুনর্বাসনকারী-রক্ষাকারীর মধ্যে গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনাটুকু পরিষ্কার বোঝা যায়। ভারতবিরোধিতাই যাদের রাজনীতির মূলমন্ত্র, ভারতের পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল যারা তৎপর, সেই অবস্থান থেকে সরে এসে ভারত তোষামোদ করার ধারায় ফিরে এসেছে তারা। ভারত তোষণের মাজেজায় তারা এত উদগ্রীব হয়ে পড়েছে যে, ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছে, বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে অন্য দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা চালাতে দেবে না। ভারতের পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থী সংগঠনগুলো তৎপরতা চালিয়ে আসছিল নব্বই দশক থেকে, পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় বিএনপি ক্ষমতায় এসে তাতে সার্বিক সহায়তা করেছে। এমনকি সংসদে দাঁড়িয়ে ৭ রাজ্যের ‘স্বাধীনতাকামী’দের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বক্তব্যও রেখেছেন। অসমের উলফা গেরিলাদের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করেছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শীর্ষ মন্ত্রী ও নেতা এবং বিশেষ সংস্থার সহায়তায় অস্ত্র সরবরাহকালে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ার পর, বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বিএনপি কিভাবে উলফাদের সহায়তা করে আসছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ঘাঁটি গেড়েছিল। এখনও মাঝে মধ্যে সীমান্ত এলাকায় বাঙ্কার খুঁড়ে অস্ত্র পাওয়ার তথ্য আসে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটিগুলো নিশ্চিহ্ন করে দেন। তারই ধারাবাহিকতায় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশের মাটি ছেড়ে যেতে শুধু বাধ্য নয়, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাও বন্ধ করে ভারত সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছে। ৭ রাজ্যে ফিরে এসেছে স্থিতিশীলতা। তাই দেখা যায়, বিএনপির বর্তমান রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা হচ্ছে ভারতবিরোধিতা পরিত্যাগ করে ভারতভক্তি প্রদর্শন। সে কারণেই ভারতের সশস্ত্র জঙ্গী, উগ্রপন্থীদের লালন-পালন না করার অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন স্বয়ং বেগম জিয়া। আরও এক ধাপ এগিয়ে বিএনপি তার ভারতপ্রীতি প্রমাণ করার জন্য এই প্রথম পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পদ ভাগাভাগি ও আটকেপড়া পাকিস্তানীদের ফেরত নেয়াসহ অমীমাংসিত বিষয়ের দ্রুত সমাধান চেয়েছে, যা তারা ক্ষমতায় থাকাকালে কখনও চায়নি। এমনকি এসব প্রসঙ্গ উত্থাপনও করেনি। ভারতকে সন্তুষ্ট করার জন্যই যে আজ ভগ্নস্তূপে পড়ে থাকা পাখিটি এমন কথা বলছে, এটা বুঝতে বেশি ভাবতে হয় না। বিএনপির কাউন্সিলে ভারতের কোন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি আসেননি। তবে বিজেপির গবর্নিং বডি রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সিনিয়র এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য ইন্দেশা কুমার ভিডিও বাণীতে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে বিজেপি/আরএসএস এবং বিএনপি তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও উন্নত করবে।’ কট্টর সাম্প্রদায়িক সংগঠন আরএসএস ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা বাণী পাঠানো হয়নি। কট্টর হিন্দুবাদী দলের সঙ্গে বিএনপির সখ্য গড়ে ওঠা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে বিএনপিও একটি সাম্প্রদায়িক দল।

কাউন্সিলে বিএনপি নেত্রী যে ভাষণ দিয়েছেন তা নির্বাচনী ইশতেহারও বলা যায়। যা আবার আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর অনুুরূপ। ভিশন-২০৩০ বলে যে কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে তা আসলে আওয়ামী লীগ ঘোষিত ভিশন-২০২১ ও ভিশন-২০৪১ থেকেই অনুকরণ করা। এই ঘোষণার মাধ্যমে তারা পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তাদের রাজনৈতিকভাবে নতুন কিছু করার ক্ষমতা নেই। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রূপরেখা অনুসরণ করে নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকে সামনে এনেছেন। ‘আওয়ামী ফোবিয়া’ তাদের মধ্যে ভালভাবেই প্রোথিত হয়েছে বলা যায়। বেগম জিয়া দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন অথচ বর্তমান সরকার দেশকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করেছেন, যা অচিরেই মধ্যম আয়ের দেশের পরিণত করবে। সেই লক্ষ্যেই সরকার জোরেশোরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ বৈশ্বিক উন্নয়ন বাস্তবতার আলোকেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার রূপরেখা অনেক আগেই ঘোষণা করেছে। এ জন্য বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে কর্মকা-ও শুরু করেছে। সে হিসেবে, বিএনপির ভিশন-২০৩০কে এক ধরনের ফাঁকা বুলি এবং রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি হিসেবেই মূল্যায়ন করা যায়। এই ভিশনের মধ্যে বাস্তবতার ছোঁয়া মেলে না। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনকালে তিন জোটের রূপরেখায় অনেক কিছুই সন্নিবেশিত ছিল, যা খালেদা আবার নতুন করে ঘোষণা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সুশাসন, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন, কালাকানুন বাতিল, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয় ক্ষমতায় বসে বেগম জিয়া নিজেই প্রথম উল্টে দেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার পথেও অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু গণমানুষের চাপে সে অবস্থান থেকে ফিরে এলেও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে বার বার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন তিনিই। এমনকি মাগুরা, মিরপুরের উপ-নির্বাচন করে নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার ক্ষেত্রে বিরোধিতা করে বলেছিলেন, কেবল শিশু আর পাগলরাই নিরপেক্ষ। কিন্তু গণ-আন্দোলনের চাপে সেই দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। ২০০১ সালে ক্ষমতায় বসে তিনি রাজনীতি ও সুশাসন বিদায় করে হাওয়া ভবনকে দুর্নীতির আস্তানায় পরিণত করেন। মাতা-পুত্র মিলে দুর্নীতির নহর বইয়ে দেন। ২০০৬ সালে এসে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে নোংরা খেলায় তিনি মেতে উঠেছিলেন, সেই নোংরামির বিপরীতে এক-এগারোর আবির্ভাব ঘটে। সেনাসমর্থিত সরকারকে আর নিয়ন্ত্রণে নিতে না পেরে বেগম জিয়া ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু দুর্নীতি অপশাসনের জন্য মাতা-পুত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেল খাটেন। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বেগম জিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য গলা টিপে মেরে ফেলেছেন, সেই তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে তিনি গত তিন বছর ধরে দেশে সন্ত্রাস, নাশকতা, মানুষ হত্যাসহ হেন অপকর্ম নেই যা করেননি। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেও সুবিধা করতে পারেননি। আর কাউন্সিলে দাঁড়িয়ে বেগম জিয়া এখন বলছেন, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি করবেন না। বরং এসবের বিপরীতে নতুন ধারার রাজনীতি ও সরকার প্রতিষ্ঠা করবেন। জঙ্গীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে যিনি মানুষ হত্যা করিয়েছেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রাণহরণ করেছেন, তিনি দ্রুত বদলে যাবেনÑ এমনটা ভাবা দুষ্কর। তাই দেখা যায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে, জঙ্গীবাদ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা করেননি বেগম জিয়া। যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে কোন বক্তব্য না দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি স্বাধীনতাবিরোধীদের পক্ষে আছেন এবং তাদের পক্ষেই থাকবেন। বিএনপির পক্ষে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির তোষামোদী রাজনৈতিক ধারা পরিত্যাগ করা সহজসাধ্য নয়। কারণ তারা তো বলেছেনই, জামায়াত তাদের পরিবারভুক্ত। বিএনপিকে তাই আগের মতোই অপরাজনীতি এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে জোট করেই চলতে হবে। কাউন্সিলে এসব বিষয় প্রবলভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসিতে দ-প্রাপ্তের জন্য বিএনপি শোক প্রকাশও করেছে শোক প্রস্তাবে। বেগম জিয়া নানা পরিকল্পনা তুলে ধরলেও স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক আঁতাত করার বিতর্কিত অবস্থান থেকে সরে আসার কোন পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেননি। সুতরাং তার রাজনৈতিক অবস্থানে তেমন কোন দৃশ্যগত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

বেগম জিয়া ২০১৩ সালের ৫ মে কেন হেফাজতের নাশকতামূলক কর্মকা-কে পৃষ্ঠপোষক, সহায়তা দানসহ সমর্থন করে নেতাকর্মীদের তাদের পাশে দাঁড়াতে বলেছিলেন, সে প্রসঙ্গে কিছুই বলেননি। সেদিন তিনি কোন্ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে উগ্রপন্থী হেফাজতকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও অরাজক অবস্থা তৈরির জন্য প্রণোদনা দিয়েছিলেন, তাও খোলাসা করেননি। ২০১৩ থেকে ২০১৫ সময়কালে অবরোধের নামে বোমায় মানুষ ও পুলিশ হত্যা, সম্পদহানিসহ যেসব নাশকতা, নৃশংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়েছেন, সে বিষয়ে মুখ খোলেননি। বোমায় দগ্ধদের এবং নিহতদের পরিবারের কাউকে কাউন্সিলে আমন্ত্রণ জানানো দূরে থাক, শোক প্রস্তাবে তাদের নামোল্লেখও করেননি। আজও তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করেননি। এমনকি নাশকতা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে সরকার হটাতে কেন ব্যর্থ হলেন সে বিষয়ও এড়িয়ে গেছেন। অথচ এসব বিষয় সম্পর্কে মূল্যায়ন না করেই তিনি ঘটনার জন্য ঢালাওভাবে সরকারকে দায়ী করে আসছেন।

দুর্নীতির একাধিক মামলায় অভিযুক্ত খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আমরা দুর্নীতির সঙ্গে আপোস করব না, নিজেরাও দুর্নীতি করব না।’ মাতা-পুত্রের দুর্নীতির কাহিনী এতই প্রচারিত ও প্রমাণিত যে, সেসব মামলার নিষ্পত্তি হয়নি আজও। মামলায় হাজিরাও দেন না। মামলা মাথায় রেখে তিনি যে আর দুর্নীতি না করার অঙ্গীকার করেছেন, তা সাধুবাদ জানানোর মতো। অবশ্য আবারও হাওয়া ভবন তৈরি করিয়ে টাকা আদায়ের কেন্দ্রস্থল গড়ে তুলবেন না, তেমন কোন অঙ্গীকার করেননি।

বিএনপির কাউন্সিলের পর এখন কথিত সুশীলরা আবার মাঠে নামবেন। ‘দুই নেত্রীর সংলাপ চাই’ বলে গলা ফাটাবেন। মানুষ হত্যা ও দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্তের সঙ্গে সরকারী দল সংলাপ করবে না বলে আগেই বলে দিয়েছে। দেশে এমন কোন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেনি যে, সংলাপের প্রয়োজন হবে। ইতিবাচক রাজনীতি করতে না পারা বিএনপির ইতিহাস নেতিবাচক রাজনীতির। আবার আন্দোলন করার মতো শক্তিমত্তা জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের পদতলে দলিত হয়ে গেছে। তাই ফিনিক্স পাখির মতো আবার ডানা মেলে ওড়ার দিন তাদের আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভিশন-২০৩০ সাল পর্যন্ত পৌঁছার পথ তাদের জন্য খোলা নেই।

প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৬

২১/০৩/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: