১১ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

২২ আইটি বিশেষজ্ঞ ছাড়াও শতাধিক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ


২২ আইটি বিশেষজ্ঞ ছাড়াও শতাধিক জনকে জিজ্ঞাসাবাদ

গাফফার খান চৌধুরী ॥ হ্যাকিংয়ে রিজার্ভের অর্থ লোপাটের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতির পাশাপাশি কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকার প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। ওসব কর্মকর্তাকে শনাক্ত করার কাজ চলছে। যদিও তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে এক ডেপুটি গবর্নর টাকা চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতি এবং কোন কর্মকর্তার যোগসাজশ নেই বলে দাবি করে আসছেন। তবে ওই ডেপুটি গবর্নর তদন্তকারীদের কাছে এমন দাবির দালিলিক এবং যৌক্তিক কোন প্রমাণ দেখাতে পারেননি। প্রাথমিক তদন্তে ডেপুটি গবর্নরের এমন দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এদিকে টাকা লোপাট বিষয়ে সুইফট ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইও তদন্ত শুরু করেছে। আজ ঢাকার মালিবাগ সিআইডি সদর দফতরে এফবিআই প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিআইডির বৈঠকের কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮শ’ কোটি টাকা চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় গত ১৫ মার্চ রাজধানীর মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। মামলার এজাহারে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ও বাজেট বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে মামলাটি দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরপরই মামলার তদন্ত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়। সিআইডির পাশাপাশি র‌্যাব, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ ও পুলিশের বিশেষ শাখাসহ (এসবি) অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে। এসব তদন্ত সংস্থার পাশাপাশি সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনও (সুইফট) তদন্ত শুরু করেছে।

শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভংকর সাহা জানান, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থেকে টাকা লোপাটের ঘটনায় সুইফটের দুই প্রতিনিধি গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসেন। তারা শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে যান। সেখানে তারা তাদের সিস্টেম পরীক্ষার কাজ করেছেন। সিস্টেমে কোন ত্রুটি আছে কি-না তা পরীক্ষা করেছেন। পাশাপাশি সিস্টেম হালনাগাদ বা আপডেট করার প্রয়োজন আছে কি-না সে বিষয়টিও পরীক্ষা করে দেখেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রিজার্ভের টাকা কিভাবে সরানো হয়েছে বা ওই টাকা সরাতে সুইফট মেসেজ কিভাবে ব্যবহার হয়েছে, সে বিষয়টিও তারা খতিয়ে দেখেছেন। তবে কর্মকর্তারা তদন্তে কী পেয়েছেন তা জানাননি। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব তথ্য অন্যান্য তদন্ত সংস্থা বা বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের কাছে তারা হস্তান্তর করবেন।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যম হচ্ছে সুইফট। সারাবিশ্বের কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এর সদস্য। এক দেশ থেকে আরেক দেশে সুইফটের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকে। এজন্য সুইফট প্রত্যেকটি সদস্যকে একটি নির্দিষ্ট কোড ও সিস্টেম ব্যবহারের জন্য গোপন নম্বর (পিন) দিয়ে থাকে। একাধিক জনের কাছে সেই গোপন পিন নম্বর থাকে। প্রতিটি গোপন নম্বর একত্রিত হলেই কেবল অর্থ ছাড় হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট সার্ভারের গোপন পিন নম্বর ছয়জনের কাছে ছিল বলে জানা গেছে।

গত মাসে সুইফট মেসেজ পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ফিলিপিন্স ও শ্রীলঙ্কায় ১০ কোটি ডলার সরানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম হ্যাক করে অর্থ স্থানান্তরের ওই বার্তা পাঠানো হয়েছিল। সুইফটের প্রতিনিধিরা নিজেদের সিস্টেম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার গঠিত তদন্ত দলের সঙ্গেও পর্যায়ক্রমে বৈঠক করবেন।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংক থেকে বাংলাদেশের অর্থ লোপাটের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারও বিষয়টি তদন্ত করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই বিষয়টির তদন্ত শুরু করেছে। রবিবার এফবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সিআইডির বৈঠকের কথা রয়েছে। এ বিষয়ে এফবিআইয়ের সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ অব্যাহত আছে।

ইতোমধ্যেই সিআইডি আবারও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। নানা আলামত পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে মানি লন্ডারিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা অর্থ লোপাটের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক বা ব্যাংকের কোন কর্মকর্তার যোগসাজশ নেই বলে দাবি করেছেন। তার এমন দাবির পক্ষে তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে বলে তদন্তকারী সংস্থা। যদিও এ ধরনের কোন তথ্যপ্রমাণ তিনি হাজির করতে পারেননি। তার এমন দাবির ভিত্তি সম্পর্কে দফায় দফায় জানতে চাওয়া হয়েছে তদন্ত সংস্থার তরফ থেকে। কোনবারই তিনি দাবির পক্ষে সদুত্তর দিতে পারেননি।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, রিজার্ভ লোপাট ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশসহ বিশ্বের চারটি দেশের অপরাধী চক্র জড়িত। ওসব দেশের এ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্কোয়াড তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত করে যাচ্ছে। ইলেক্ট্রনিক মানি ট্রান্সফারের ঘটনা সঠিকভাবে তদন্ত করা সম্ভব হলে যাবতীয় তথ্য পাওয়া সম্ভব। কারণ ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে টাকা কোথা থেকে কোথায় যায়, তার যাবতীয় তথ্য থেকে যায়। হ্যাকারদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলে টাকা উদ্ধার অসম্ভব কিছু নয়। সেক্ষেত্রে পুরো না উদ্ধার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। কারণ যেসব টাকা বাজারে চলে গেছে তা উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির যদি সেই পরিমাণ অর্থ থাকে, সেক্ষেত্রে টাকা উদ্ধার হওয়া বিচিত্র নয়।

এদিকে, শনিবার পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নেটওয়ার্ক সিস্টেমের আওতায় থাকা সাড়ে চার হাজার কম্পিউটারের মধ্যে সুইফট সার্ভারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কম্পিউটারের মধ্যে ৫০টির হাজার হাজার ডাটা ক্লোন করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব ডাটা পর্যালোচনা চলছে। এছাড়াও সিসি ক্যামেরার শত শত ফুটেজের পর্যালোচনা অব্যাহত আছে। সার্ভার স্টেশনের কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্তদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত শতাধিকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২ আইটি বিশেষজ্ঞ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট অনেক উর্ধতন কর্মকর্তাও রয়েছেন। মামলার বাদী ছাড়াও চাকরিচ্যুত দুই ডেপুটি গবর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর নজরদারির মধ্যে রয়েছেন অনেকেই। তাদের দেশত্যাগের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সব কর্মকর্তাকে যোগদান করতে বলা হয়েছে। এদিকে, সন্দেহভাজন ছয়জনকে আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সংগৃহীত আলামতসহ যাবতীয় কিছু পর্যালোচনা করে অর্থ লোপাটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতি এবং কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকার প্রাথমিক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এসব তথ্য আরও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে কতজন কর্মকর্তা জড়িত এবং তাদের পদ-পদবী সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন তথ্য মেলেনি।

এ বিষয়ে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মীর্জা আব্দুল্লাহেল বাকীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, অনেক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেসব আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সন্দেহভাজনদের আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। অন্যান্য দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। রবিবার অর্থ লোপাটের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকায় সিআইডি সদর দফতরে সিআইডি কর্মকর্তাদের বৈঠকের কথা রয়েছে। বৈঠকে তদন্তের নানা দিক নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা হবে। পুরো তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগবে বলেও তিনি জানান।