২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ব্যাংকিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা চ্যালেঞ্জিং


রহিম শেখ ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে যক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা লোপাটের ঘটনায় নৈতিক দায় নিয়ে ড. আতিউরের পদত্যাগের পর নতুন গবর্নর হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবির। তিনি আজ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে জানা গেছে। তার দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পাবে নতুন গবর্নর। ইতোমধ্যেই নতুন গবর্নরকে বরণের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নরের দায়িত্ব নেয়ার আগে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করার কথা রয়েছে তার। বিশ্লেষকরা বলছেন, দায়িত্ব বুঝে নেয়ার পর নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে নতুন গবর্নর ফজলে কবিরকে। রিজার্ভ চুরি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অচলাবস্থা নিরসন, তদন্তের মাধ্যমে রিজার্ভ চুরির প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে শক্তিশালী প্রযুুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের রেখে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখা, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা ও ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগমুখী করা, বিশেষ করে অলস পড়ে থাকা অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে আনার মতো নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে নতুন গবর্নরকে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কার্যকর পলিসি প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ জোরদার করা এবং পর্যবেক্ষণ কাজগুলো শক্তহাতে দমন করাও তার জন্য চ্যালেঞ্জ হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডালের রিজার্ভ ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন ডলার অর্থ চুরির ঘটনা সরকারীর মহলে যথাসময়ে না জানানোয় চাপের মধ্যেই মঙ্গলবার গবর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. আতিউর রহমান। ওইদিনই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নতুন গবর্নর হিসেবে ফজলে কবিরের নাম ঘোষণা করেন। পরদিন বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর হিসেবে ফজলে কবিরকে নিয়োগের আদেশ জারি করা হয়।

নতুন গবর্নর হিসেবে প্রধান মিশন কি হবে এমন প্রশ্নের জবাবে বৃহস্পতিবার ফজলে কবির সাংবাদিকদের বলেন, রিজার্ভ চুরির ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের চলমান সঙ্কট সমাধানই হবে তার প্রথম লক্ষ্য। সরকার তার ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছে তা সফলভাবে সমাধানের চেষ্টার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে যে বিপর্যয় হয়ে গেছে, সেজন্য কোন ড্যামেজ রিপেয়ার করার দরকার আছে কি না সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, রিজার্ভ চুরির প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও এ ঘটনায় দায়ীদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া খুবই জরুরী। পাশাপাশি ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এ টাকা উদ্ধারের সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে বিষয়ে আগেভাগেই প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে হবে। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক খাতেই একই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, নতুন গবর্নর হিসেবে তার প্রধান কাজ হবে রিজার্ভ থেকে অর্থচুরির ঘটনা তদন্ত সাফল্যের সঙ্গে শেষ করা। কারা এটা করেছে, কেন এটা করেছে, তাদের নেটওয়ার্কটা কী তা খুঁজে বের করা। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যে গলদ রয়ে গেছে সেগুলো সংস্কার করাও নতুন গবর্নরের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে। বিনিয়োগ স্থবিরতায় দেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। কয়েক বছর ধরেই এই উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকগুলো অতি সাবধানতার নামে বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। আবার উদ্যোক্তাদের থেকেও তেমন ঋণ চাহিদা আসছে না। এতে বেসরকারী খাতের ঋণ নেয়ার হার তুলনামূলক কম রয়েছে। দেশে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান হচ্ছে না। অন্যদিকে, উৎপাদন না বাড়ায় প্রবৃদ্ধিও ৬ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়ন তথা টেকসই অর্থনীতির জন্য এসব অব্যবহৃত অর্থের সঠিকভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। এজন্য ব্যাংকগুলো যাতে বিনিয়োগমুখী হয়, সেদিকেও গবর্নরকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে এসব অর্থ যাতে উৎপাদনমুখী খাতে যায় সে বিষয়টি লক্ষ্য রাখাও জরুরী। যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং প্রবৃদ্ধি জোরালো হয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস বিদ্যুত ও অবকাঠামো সমস্যা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, ঋণ ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি, ঘন ঘন ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়াসহ নানা করণেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপিঋণ বেড়েছে। বর্তমানে এ খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপী ঋণ রয়েছে। এর বাইরে রাইট অব বা অবলম্বন করা ঋণ রয়েছে আরও প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো। সবমিলে ব্যাংকিং খাতে ৯০ হাজার কোটি টাকার মতো খেলাপী ঋণ রয়েছে। যার সিংহভাগই আদায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। খেলাপী ঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ প্রদানে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, তহবিল ব্যয় কমাতে আমানতের সুদ কমিয়ে দিচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই খেলাপী ঋণ কমিয়ে আনার কৌশল গ্রহণ করাও নতুন গবর্নরের জন্য চ্যালেঞ্চ হবে।