১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ মুনাফিকের স্থান দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে


মুনাফিক শব্দের অর্থবোধক শব্দসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- কপট, বিশ্বাসঘাতক, দ্বিধাগ্রস্ত, সন্দিহান, দুমুখো ইত্যাদি। প্রিয়নবী সরওয়ারে কায়েনাত খাতামুন্নাবিয়ীন হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মুনাফিকের আলামত বা লক্ষণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, আলামাতুল মুনাফিকি ছালাছুন ইযা হাদ্দাস কাযাবা ওয়া ইযা ওয়া’আদা খালাফা ওয়া ইযা উ’তুমিনা খানা- মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি : যখন কথা বলে তখন তা মিথ্যা বলে, ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং আমানতে খিয়ানত করে (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ)।

এই হাদিস শরীফ থেকে মুনাফিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর তা হচ্ছে- মিথ্যাচার, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা এবং আমানত খিয়ানত করা। আমরা ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাব ইসলামের এবং মুসলিমদের ক্ষতিসাধনে যারা অতিসন্তর্পণে কাজ করে এসেছে তারা প্রধানত মুনাফিক। তারা মুখে আল্লাহ্-রসুলের কথা বলে, বেশভূষাতেও খাঁটি মুসলিম বলে মনে হয়; কিন্তু তারা শয়তানী চক্রের দোসর হিসেবে তৎপরতা চালায়, তারা মানবিক মূল্যবোধকে অপমানিত করে। তাদের কথা এক রকম আর কাজ অন্য রকম।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে মক্কী জীবনে কাফির-মুশ্রিকদের মোকাবেলা করতে হয়েছে, কিন্তু ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনা মনওয়ারায় হিজরত করে আসার পর তাঁকে ইয়াহুদী এবং সেখানকার কিছু লোক যারা বাইরে ইসলাম গ্রহণকারী হলেও গোপনে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী ছিল তাদের মোকাবেলা করতে হয়। লোক দেখানো ইসলামে দাখিল হওয়া এই লোকরাই মুনাফিক হিসেবে পরিচিত হয়। এরাই ইয়াহুদী এবং মক্কার কাফির-মুশ্রিকদের সঙ্গে আঁতাত করে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ে। এই মুনাফিকদের সরদার বা নেতা ছিল আবদুল্লাহ্ ইব্নে উবাই। সে চেয়েছিল ইদনার কর্তৃত্ব নিজে গ্রহণ করতে। বাইরে সে হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ’আলায়হি ওয়া সাল্লামের একান্ত আপনজন হিসেবে জাহির করত আর তলে তলে ইসলামের ক্ষতি হয় এমন সব কাজ করত।

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু এই মুনাফিকদের চেহারা উন্মোচন করে দিয়ে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ’আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন : ওয়া মিনান নাসি মায়ইয়া কুলু আমান্না বিল্লাহি ওয়া বিল ইয়াওমিল আখিরি ওয়ামাহুম বি মু’মিনীন। ইউ খাদিউনাল্লাহা ওয়াল্লাযীনা আমানু ওয়া মা ইয়াখদাউনা ইল্লা আনফুসাহুম ওয়ামা ইয়াশ উরুন। -আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে, আমরা ইমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিবসের প্রতি : আদতে তারা মু’মিনদের অন্তর্ভুক্ত নয়। আল্লাহকে এবং মুমিনদের ওরা প্রতারিত করতে চায়, অথচ ওরা নিজেরাই যে নিজেদের প্রতারিত করে তা ওরা বুঝে উঠতে পারে না (সূরা বাকারা : আয়াত ৮-৯)। আল-কুরআনে মুনাফিকুন (মুনাফিকবৃন্দ) নামে একটি সূরাই আছে। ১১ খানা আয়াতে কারীমাবিশিষ্ট এই সূরাতে মুনাফিকদের সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

আল্লাহু জাল্লা শানুহু তাঁর প্রিয় হাবিব হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে ইরশাদ করেন : মুনাফিকরা আপনার নিকট এসে বলে ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহ্র রসুল।’ আল্লাহ্ তো জানেনই যে, আপনি নিশ্চয়ই তাঁর রসুল এবং আল্লাহ্ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। ওরা ওদের শপথগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এবং ওরা আল্লাহ্র পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে (সুরা মুনাফিকুন : আয়াত ১-২)।

এই সূরাতেই মুনাফিকদের আরও কিছু চিহ্ন তুলে ধরা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে : (হে রসুল) আপনি যখন তাদের দেখেন তাদের দেহাকৃতি আপনার নিকট প্রীতিকর মনে হয় এবং ওরা যখন কথা বলে তখন আগ্রহের সঙ্গে তাদের কথা শুনবেন। যদিও ওরা দেয়ালে ঠেকানো কঠোর স্তম্ভসদৃশ (সূরা মুনাফিকুন : আয়াত ৪)।

এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুনাফিকদের বেশভূষা, আচার-আচরণ মনোমুগ্ধকর হয়; তাদের কথাবার্তাও আকর্ষণীয় হয়, তাদের বাচনভঙ্গি লোককে আকৃষ্ট করে, তাদের চেহারা-সুরত দেখে বোঝা যায় না যে, তাদের বাইরের অবস্থা অন্তরের অবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা বাহ্যিক দিকটা সুন্দর ও মনোহর করে রাখে আর তাদের অন্তর মিথ্যা, প্রতারণা, বিদ্বেষ ও শয়তানী অভিসন্ধির কলুষতায় পরিপূর্ণ। হযরত ইমাম রাযী (রহ) উপরিউক্ত আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ্ ইব্নে উবাই, মুগীস ইবনে কায়েস ও ওয়াজদ দৈহিক গঠনে সৌন্দর্যে দামী দামী পোশাক পরিচ্ছদ পরিধানে খুবই আকর্ষণীয় ছিল। বিশেষ করে আবদুল্লাহ্ ইব্নে উবাই দেখতে অত্যন্ত সুশ্রী ছিল, সে দৈহিকভাবেও সবল ছিল, সে পরিমার্জিত ভাষায় কথা বলত, তার কথা শুনলে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে যেত।

যুগে যুগে নিত্যনতুন মুনাফিকের আবির্ভাব হয়েছে এবং হচ্ছে, যারা ইসলামের কথা বলে বটে কিন্তু ইসলামের শান্তির আদর্শ থেকে, সৌহার্দ্য ও পরিচ্ছন্নতার আদর্শ থেকে তারা বিচ্যুত থাকে। তারা অশান্তি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে কর্তৃত্ব গ্রহণের চেষ্টা করে; যেমনটা করেছিল মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ্ ইব্নে উবাই। এদের সম্পর্কে কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : ওয়া ইযা কীলালাহুম লা তুফসিদূ ফীল র্আদ, কালূ ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন, আলা ইন্নাহুমহুমুল মুফসিদুনা ওয়ালা কিল্লা ইয়াশ ‘উরূন- তাদের যখন বলা হয়, পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না, তারা বলে আমরাই তো শান্তি স্থাপনকারী। সাবধান! এরাই তো অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু এরা বুঝতে পারে না (সূরা বাকারা : আয়াত ১১-১২)।

কুরআন মজীদে আরও ইরশাদ হয়েছে : যখন তারা মু’মিনগণের সংস্পর্শে আসে তখন বলে, আমরা ইমান এনেছি, আর যখন তারা নিভৃতে তাদের শয়তানদের সঙ্গে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি, আমরা শুধু তাদের (মু’মিনদের) সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশা করে থাকি (সূরা বাকারা : আয়াত ১৪)।

যাদের কথায় এবং কাজে বৈপরীত্য থাকে তাদের সম্পর্কে আল-কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : ওয়া আন্নাহুম ইয়াকূলূনা মালা ইয়াফ্ ’আলূন- আর তারা যা বলে তা করে না (সূরা শু’আরা : আয়াত ২২৬)। মুনাফিকরা মিথ্যাচার রোগ দ্বারা আক্রান্ত। এই রোগ তাদের এমনভাবে পেয়ে বসে যে, তার খপ্পর থেকে তারা রেহাই পেতে পারে না। যে কারণে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন : ফী কুলূবিহিম মারাদুন্- তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি (সূরা বাকারা : আয়াত ১০)। আর এই ব্যাধি আক্রান্ত লোকদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি। ইরশাদ হয়েছে, মর্মন্তুদ শাস্তি, কারণ তারা মিথ্যাবাদী (ঐ)। ইরশাদ হচ্ছে : আম্ হাসিবাল্লাযীনা ফী কুলুবিহিম্ মারাদুন আল্লায়ইখ্ইরিজাল্লাহু আদ্গানাহুম- যাদের অন্তরে আছে তারা কি মনে করে যে, আল্লাহ্ কখনও ওদের বিদ্বেষ ভাব প্রকাশ করে দেবেন না? (সূরা মুহম্মদ : আয়াত ২৯)।

বস্তুত যারা মুনাফিকী করে এবং দুমুখো নীতি গ্রহণ করে তাদের এই অমার্জনীয় অপরাধের শাস্তি দুনিয়াতেই শুরু হয়ে যায়। পরিণামে তাদের অপমানিত হতে হয়, লাঞ্ছিত হতে হয়। মুনাফিককে কেউ প্রকৃত অর্থে সম্মান করে না। মানুষের কাছে সে বেইমান হিসেবে গণ্য হয়। আর আখিরাতে তার জন্য রয়েছে অত্যন্ত কঠোর ও কষ্টদায়ক শাস্তি। হযরত আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু থেকে বর্ণিত একখানি হাদিসে আছে যে, হযরত মুহম্মদ সাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তাজিদূনা র্শারান্নাসি ইয়াওমাল কিয়ামাতি যাল ওয়াজাহায়নিল্লাযী ইয়াতী হাউলায়ি বিওয়াজহিন্ ওয়া হাউলায়ি বি ওয়াজহি- কিয়ামতের দিন সেই মানুষটাকেই সবচেয়ে মন্দ পাবে যে দুমুখো। সে এক মুখে এদের নিকট যায় এবং অন্য মুখে তাদের দিকে যায় (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ)।

এই হাদিসখানিতে স্পষ্ট ভাষায় মুনাফিকদের সবচেয়ে মন্দ মানুষ বলা হয়েছে। এরা সব মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্র যেমন হয়, তেমনি আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুও মুনাফিকদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা করেছেন। হযরত আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু থেকে বর্ণিত, অন্য আর একখানি হাদীসে আছে যে, ইন্না মিন র্শারিন্নাসি ইন্দাল্লাহি ইয়াওমাল কিয়ামাতি যাল ওয়াজহায়নি- নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন আল্লাহ্র নিকট মন্দ লোক হিসেবে গণ্য হবে সেই মানুষ যে দুমুখো (তিরমিযী শরীফ)।

এই মুনাফিকরাই যুগে যুগে মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে নিজেদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে আসছে। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে। কারবালার যুদ্ধের কথাই বলি, দেখা যাবে, মুনাফিকদের কারণেই বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে। মুনাফিক মুখোশধারীরা আমাদের কালেও রয়েছে। এদের চিনতে এবং মুখোশ উন্মোচিত করে দিতে হবে।

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু মুনাফিকদের জন্য সবচেয়ে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেন : ইন্না মুনাফিকীনা ফীদ্ দারকিল আস্ফালি মিনান্নার-নিশ্চয়ই মুনাফিকদের দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে নিক্ষেপ করা হবে।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ,

উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা.),

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ