১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

চট্টগ্রামের ব্যবসা ॥ ভোগ্যপণ্য থেকে শিল্পে


সচরাচর আমরা পড়ি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর। সরকার দু-চারটা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। অন্যদের কী প্রতিক্রিয়া হয় জানি না, আমি ব্যক্তিগতভাবে এ খবরে বড় বেশি উৎসাহিত হই না। এবার আমি খুশি, দারুণ খুশি হয়েছি একটা খবরে। সরকার দেশের প্রতিটি পুরনো জেলায় একটা করে ‘টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ করবে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বলেছেন, এটা করা হবে বস্ত্র খাতে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকাভাব দূর করতে। এর চেয়ে ভাল খবর হয় না। আমাদের বস্ত্র খাতের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা ও তার সমস্যা আলোচনায় আমি যাব না। একটি জিনিস পরিষ্কার এই খাতে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম সাহেব বলেছেন, বস্ত্র খাতে ১৩ হাজার বিদেশী কাজ করে। তারা কত টাকা বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পায়। তিনি বলেছেন, ১৩ হাজার বিদেশী তিন লাখ দেশী শ্রমিকের সমান বেতন-ভাতা নিয়ে যায়। এতে কত টাকা হয় তার হিসাব করে লাভ নেই। আপাতত সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখছি বিলম্বে হলেও এই সিদ্ধান্তের জন্য। জানা গেছে, এসব ‘টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট’ করতে সরকারের ব্যয় হবে ২০০ কোটি টাকা। বলাবাহুল্য, যে সুবিধা আমরা এদের থেকে পাব সেই তুলনায় এই খরচ কিছুই না। আসলে তা বিনিয়োগ। বহুদিন ধরেই আমি লিখছি সাধারণ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করার ঝোঁক থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। এমনকি ঢালাও বিবিএ, এমবিএ এবং সাধারণ মাস্টার্স ডিগ্রীহোল্ডার তৈরি করারও পরিণতি সম্পর্কে আমাদের সচেতন হয়ে ওঠা উচিত। এদিকে শিক্ষার গুণগত দিকই মুখ্য বিবেচিত হওয়া উচিত। আমাদের দরকার টেকনিক্যাল লোক। ব্যবসা যতই বাড়বে, ব্যবসায়িক খাত ততই বাড়বে। রফতানিমুখী খাত যতই বাড়বে ততই কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোক লাগবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা ‘মার্কেট’ বোঝে না, ব্র্যান্ডিং কী বোঝে না, কাপড় রং কিভাবে করতে হয় জানে না। হিসাব কিভাবে রাখতে হয় জানে না। ডাবল এন্ট্রি সিস্টেম অব এ্যাকাউন্টিং কাকে বলে জানে না। এ ধরনের জ্ঞানে উজ্জীবিত ছেলেমেয়ে আমাদের দরকার। ইলেক্ট্রিশিয়ান দরকার। প্লাম্বার দরকার। আমি জেনে খুবই খুশি হয়েছি যে, সরকার টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট করছে সারাদেশে। শুধু বস্ত্র শিল্পটিকে কেন, সকল শিল্পকেই যদি লোকেলাইজেশন সম্ভব হয় তাহলে দেশ উপকৃত হব।

এদিকে একটা খবর ছাপা হয়েছে তার পরিণতি কী হবে তা বলা এখনই মুশকিল। একটি কাগজে দেখলাম চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা ছাড়ছেন। তারা বলছেন, এই ব্যবসা আর লাভজনক নয়। ক্রমেই তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ কিছুদিন আগেও আমরা খবরে পড়েছি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও সরবরাহের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন। বেশ কিছু ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীর নাম সবার মুখে মুখে ছিল। যেমন : মোস্তাফা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, নূরজাহান গ্রুপ, ইলিয়াছ ব্রাদার্স (এমইবি), টিকে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম, পিএইচপি গ্রুপ, এসএ গ্রুপ, বিএসএম গ্রুপ, ইমাম গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ, কেডিএস গ্রুপ, খানজাহান আলী গ্রুপ। খবরের কাগজ খুললেই তাদের নাম পাওয়া যেত। তারাই বড় বড় ঋণগ্রহীতা, তারাই ‘ট্রাস্ট রিসিট’র মাধ্যমে ঋণগ্রহীতা ইত্যাদি ইত্যাদি। বেশ কিছুদিন যাবতই খবর পাওয়া যাচ্ছিল চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অবস্থা ভাল নয়। অনেকে আবাসন শিল্পে গেছে, ভাল করতে পারেনি। অনেকে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে গেছে, ভাল করতে পারেনি। এমনও খবর দেখেছি যাতে বলা হয়েছে, অনেক ব্যবসায়ী বহু লোকের টাকা মেরে উধাও হয়ে গেছে। অনেকের কাছে অনেক ব্যাংক প্রচুর টাকা পাবে যার বিরাট অংশই এখন খেলাপী। এর বিপরীতে কোন জামানত বা ‘কোলেটারেল’ নেই। ব্যাংকগুলো যৌথভাবে বসেও এ সমস্যার কোন সমাধান পাচ্ছে না। আমি নিজেও ভাবতাম আসলে চট্টগ্রামে কী হচ্ছে? ব্যবসা ও শিল্পে চট্টগ্রামের ধনীরা যদি পিছিয়ে পড়ে তাহলে আমাদের ভবিষ্যত কী, বিশেষ করে খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ইত্যাদি অঞ্চলে যখন নাম করা যায় এমন কোন উদ্যোক্তার খবর পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়িক অবস্থা আমাদের দারুণভাবে ভাবায়। বিশেষ করে বর্তমান খবরটি বড়ই উদ্বেকজনক। দেশের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসার পরিমাণ কম নয়। হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। বস্তুত আমরা সব জিনিসই আমদানি করে খাই। চাল-গম আমদানি করতে হয়। তেল, ডাল, মরিচ, পেঁয়াজ, সয়াবিন, মসলাপাতি, গুঁড়া দুধ থেকে শুরু করে এমন কোন ভোগ্যপণ্য নেই, যা আমাদের আমদানি করতে হয় না এবং এই আমদানি ব্যবসাটি চট্টগ্রামের গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর হাতে ছিল বন্দী। তারা রাতকে দিন করত, দিনকে রাত। প্রতিটি পণ্যভিত্তিক একটা সিন্ডিকেটই গড়ে উঠেছিল। এখন খবর পাওয়া যাচ্ছে তারা এই ব্যবসা ছাড়ছেন।

উপরোক্ত প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন- তারা কোথায় যাচ্ছেন? তাদের ব্যাংক ঋণের অবস্থা কী? যদি নতুন ব্যবসায় যান তাহলে ওই ব্যবসার প্রয়োজনীয় পুঁজি তারা কোত্থেকে সংগ্রহ করবেন? কোথায় যাচ্ছেন- এই প্রশ্নের উত্তরে কাগজের খবরে একটা আলামত পাওয়া যাচ্ছে। নতুন ব্যবসায়িক খাতগুলো হচ্ছে : জ্বালানি আমদানি, সিমেন্ট, ঢেউটিন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও শিল্প, ইস্পাত, গ্লাস, স্পিনিং, কাগজ, জুতা, কেমিক্যাল ইত্যাদি। এসব খাতের কথা দেখে মনেই হচ্ছে তারা শিল্পের দিকে যাচ্ছেন। ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা থেকে শিল্পে যাওয়ার ঘটনা দৃশ্যত ভাল খরব। মনে করা যায় ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় লোকসান হচ্ছে- এখন এ কথা বলা হলেও তারা এই খাত থেকে এক সময় প্রচুর মুনাফা করেছেন। সয়াবিনের উদাহরণই যথেষ্ট। এক টাকার সয়াবিন তারা কত টাকায় বিক্রি করেছেন এই খবর মধ্যবিত্তের সবাই জানে। ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় তারা যথেষ্ট লাভ করেছেন। এটা অস্বীকার করা হবে সত্যের অপলাপ। হয়ত এখন এই ব্যবসায় অন্যান্য ব্যবসার মতো একটা মন্দা নেমে এসেছে। কিন্তু তারা যে ব্যবসায় যাচ্ছেন বলে খবরের কাগজে দেখলাম সেসব কি খুব ভালভাবে চলছে? ওসবের আন্তর্জাতিক বাজার কি খুবই চমকপ্রদ বাজার? সেখানে প্রতিযোগিতা কি কম? নানা প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- ভোগপণ্যের বর্তমান লোকসানের বোঝা কে টানবে? ব্যাংকগুলোর পক্ষে তো এই বোঝা টানার ক্ষমতা নেই। এমনিতেই সরকারী ব্যাংকগুলো ‘গাল’ খাচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের খেলাপী সংস্কৃতির ফলে যে বিপুলসংখ্যক ব্যাংক পথে বসবে তার প্রতিকার কী? অধিকন্তু এরাই এখন আসবে নতুন ঋণের জন্য। তারা নতুন নতুন কারখানা গড়বেন। যেসব কারখানা গড়বেন তাতে পুঁজি লাগবে প্রচুর। সেই টাকা তারা কোত্থেকে যোগাড় করবেন। নিজস্ব উৎস থেকে? শোনা যায় তাই হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। এখানেই প্রশ্ন, ভোগ্যপণ্যের ব্যবসার জন্য ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ঋণের টাকা ফেরত না দিয়ে নিজস্ব টাকা দিয়ে কারখানা গড়ার অর্থ কী দাঁড়ায়? তার মানে তারা যে লোকসানের কথা বলেছেন এটা ঠিক নয়। তার মানে এও হতে পারে, তারা পূর্বতন ঋণের একটা অংশ অন্যত্র সরিয়ে রেখেছিলেন আর সেই টাকাই এখন নতুন নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করছেন। সবাই এ কাজ করছেন আমি তা বলব না। তবে অনেকেই যে করছেন তা পরিষ্কার। অনেকে ‘বিপদের’ কথা বলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ‘রিস্ট্রাকচার্ড লোন’ সুবিধা পেয়েছেন। এই সুবিধা সকলের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। কিন্তু তা ঢালাওভাবে দেয়া হয়েছে। এর পরিণতি কী তা বোঝা যাবে কিছুদিন পর। সে যাই হোক, ওই সুবিধা পাওয়ার ফলে বহু টাকা তাদের হাতে থেকে গেছে। যে টাকা এখন তারা শিল্পে ঢালছেন বলে অনুমিত। যেভাবেই হোক শিল্পে আসছে- তা আসুক। কিন্তু ব্যাংকের পাওনা টাকার একটা বিহিত তাদের করে দেয়া উচিত। শত হোক ব্যাংক করলে ব্যবসায়ীদের কোন লাভ হবে না। ‘স্টক এক্সচেঞ্জ’র টাকা বাংলাদেশে শিল্পায়ন হবে না। করতে হবে ব্যাংকের নামেই। অতএব ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের পথ খোঁজা উচিত। তাদের অনেকে প্রচুর জমি কিনে রেখেছেন। বেসরকারী খাতে তারা ‘ইকোনমিক জোন’ করতে পারেন। এতে সরকারও সাহায্য করতে পারে। শত হোক সরকারের পরিকল্পনা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১০০ ‘অর্থনৈতিক জোন’ করা। এই উদ্যোগে তারা অংশ নিতে পারেন। এদিকে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় যাতে ছেদ না পড়ে তার দিকে সরকারের দৃষ্টি রাখা দরকার। নতুন ব্যবসায়ীরা এতে আসুক। ‘টিসিবি’-কে প্রস্তুত রাখা হোক সর্বদা।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক, ঢাবি