২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

পথ নাটক, পথে নাটক


কথায় বলে, নদীতে খাদ যত বড় তার ঢেউও তত বড়। এ্যাডলফ হিটলার যখন দেশ দখলের উন্মাদনায় মত্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, তখন ফ্রান্সের রোমাঁ রোলাঁ আধুনিক থিয়েটারের উৎপত্তি গবেষণার কাজ অসমাপ্ত রেখে পথে নেমে এসে পথনাটক করা শুরু করেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরার জন্য। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জনগণের সামনে মঞ্চায়িত এই পথ নাটকই তখন ফ্রান্সে পিপলস থিয়েটার। পথ নাটকের ঢেউ তিনি আবার অবিভক্ত ভারতবর্ষে আছড়ে দিলেন ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতার যুদ্ধ। সে ঢেউ প্রবহমান স্বাধীন বাংলাদেশের ভূমিষ্ঠ হওয়ার গর্ভ যন্ত্রণারকালে (ডক্টর ইনামুল হকদের ট্রাকে নাটক মঞ্চায়ন প্রভৃতি বিবেচ্য)। স্বাধীন বাংলাদেশে পথনাটক আবার প্রাণ ফিরে পেল স্বৈরাচারবিরোধী অবস্থানের কালে।

চরকাকড়ার ডকুমেন্টারি পথনাটক করতে গিয়ে নাট্যকর্মীরা কারারুদ্ধ হচ্ছে আর এসএম সোলায়মান রচিত-নির্দেশিত এবং অভিনীত পথনাটক ‘খ্যাপা পাগলার প্যাচাল’, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া তথা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের মনের বন্ধ দরজায় কড়া নেড়েছে। কি বিশাল দেশপ্রেম-মানবতাপ্রেম আর সংবেদনশীল শৈল্পিক মন থাকলে একজন সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যেতে পারে স্বচক্ষে শহীদ মিনারের অবমাননা সহ্য করতে না পেরে, তা নিয়েই পথনাটক ‘খ্যাপা পাগলার প্যাচাল’। সেই দেশপ্রেম-মানবতাপ্রেম আর সংবেদনশীল শৈল্পিক মন আজ আর তেমনটা দেখা যায় না। বরং আত্মপ্রেম আর আত্মপ্রচারণার সর্বগ্রাসী চোরাস্রোতে পড়ে বুড়িগঙ্গা পচে নর্দমা হয়ে যায়। সৌরভের বিপরীতে গন্ধ ছোটে। পথনাটক কি মঞ্চ নাটকের শৈল্পিক মানের উৎকর্ষ অপেক্ষা নাট্যনেতৃত্বের প্রতিষ্ঠায় নাট্য সংগঠকদের কর্ম ব্যস্ততা বেড়ে যায়।

মাঝখান থেকে নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা-অভিনেত্রীরা নিজেরা নিজেদের মতো বেড়ে ওঠার মতো পথ খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে দিকভ্রান্ত হয়। তথাপি রাতের গভীরতা যেমন প্রভাতের আগমনকে ত্বরান্বিত করে অনেকটা সেভাবে নাট্যদল এবং নাট্য কর্মীদের কর্মক্ষেত্রের বিস্তৃতিকে বাড়িয়ে নিতে এবং বেগমান করতে আগামী দিন শুক্রবার এবং রবিবার দুদিন জুড়ে দশটি নাট্যদলের অংশগ্রহণে, গীতাঞ্জলি ললিতকলা একাডেমির আয়োজনে, উত্তরায় প্রথমবারের মতো আয়োজিত হতে যাচ্ছে রবীন্দ্র স্মরণীর পশ্চিমের শেষ প্রান্তে বটমূলে দুদিনের থিয়েটার অঙ্গন পথনাট্যোৎসব।

নাটোৎসবে গীতাঞ্জলি ললিতকলা একাডেমির নাট্যকলা বিভাগের নাট্যদল থিয়েটার অঙ্গনসহ মোট দশটি নাট্যদল দু’দিনে পাঁচটি করে মোট দশটি নাটক মঞ্চায়ন করবে। আরণ্যক নাট্যদল আগুনের দাবানলের হাত থেকে মানবমুক্তির কথা নিয়ে মঞ্চায়ন করবে নাটক ‘আগুনের জবানবন্দী’। থিয়েটার আরামবাগ রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিশ্বাসঘাতকদের চিনিয়ে দিতে মঞ্চায়ন করবে নাটক ‘গ্রহনকাল’। প্রাচ্যনাট মঞ্চায়ন করবে পতিতকে উদ্ধারের নাটক ‘গর্ত’। মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় মঞ্চায়ন করবে নিশি-ভোরের নাটক ‘সূর্যোদয়ের হুংকার’। নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসম্বাল মঞ্চায়ন করবে মানবতার অন্বেষনের নাটক ‘জনৈক ইমাম আলী’। নাট্যধারা মঞ্চায়ন করবে কৃতকর্মের পরিণতি নিয়ে নাটক ‘দড়ি’। সাত্ত্বিক নাট্য সম্প্রদায় মঞ্চায়ন করবে ক্ষমতা আত্তীকরণের টানাপোড়েনের নাটক ‘দোয়ানির বাজার’। নাট্যপুরান মঞ্চায়ন করবে ক্ষমতার অন্দর মহলের নাটক ‘তন্ত্র বনাম মন্ত্র’। নাট্যরন থিয়েটার উত্তরা মঞ্চায়ন করবে ‘মড়া’। থিয়েটার অঙ্গন মঞ্চায়ন করবে রূপ বদলকারীদের রূপের বর্ণনার নাটক ‘প্রশ্নবোধক’। গীতাঞ্জলি ললিতকলা একাডেমি আয়োজন করছে উৎসবটি।