১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

৯৫ হাজারে বিচারক একজন


৯৫ হাজারে বিচারক একজন

বিকাশ দত্ত ॥ মামলা জট থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায় এ বিষয়ে আইন কমিশন বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক মামলা জট নিয়ে যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়েছেন তার কিছু বাস্তবায়নও হয়েছে। তিনি বলেছেন, ৩১ লাখ মামলা ও মোকদ্দমার ভারে বিচার বিভাগ আজ নু্যুব্জ এবং ক্রমাগত হারেই এই সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ১৬/১৭শ’ বিচারকের পক্ষে এতসংখ্যক মামলা মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করা কখনই সম্ভব নয়। প্রতিবছর মামলা মোকদ্দমার সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বাড়ছে বিচার বিভাগে নতুন কোন পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। নিয়োগ পর্যায় থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে পরিপূর্ণ একজন বিচারক হিসেবে কাজ আরম্ভ করতে কমপক্ষে তিন বছর সময় প্রয়োজন। নতুন মামলা দায়ের থেমে নেই। এ লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে প্রতিবছর দুই শ’জন করে নতুন বিচারক নিয়োগ দেয়া জনস্বার্থে জরুরী।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আরও বলেন, আমরা যদি বিদেশের দিকে তাকাই তাহলে কী দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ১০ হাজারে ১ জন বিচারক রয়েছেন। ভারতে ৬৭ হাজারের বিপরীতে ১ জন বিচারক। ওদের টার্গেট ২০ জনের জন্য একজন বিচারপতি নিয়োগ দেয়া। আর আমাদের এখানে ৯৫ হাজারের বিপরীতে একজন বিচারক রয়েছেন। সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক জনকণ্ঠকে বলেছেন, বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ হয়ে গেছে। এখন মামলা জট দূর করতে আইনমন্ত্রী বা সরকারের কোন ভূমিকা নেই। এখন সব কিছুই নির্ভর করছে সুপ্রীমকোর্টের ওপর।

দেশের উচ্চ আদালতসহ নিম্ন আদালতে প্রায় ৩১ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ অবস্থা এক দিনে বা এক বছরে হয়নি। বহু বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা বর্ধিত হয়ে বর্তমানে এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টির সময় তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ হতে বহু সংখ্যক বিচারক ভারতে অপশন দিয়ে চলে যান। ফলে অন্যান্য সার্ভিসের বিচার বিভাগেও বিচারক শূন্যতা দেখা দেয়। সঙ্কট এমন পর্যায়ে ছিল যে, অনেক জেলায় একজন মুন্সেফ জেলা জজের স্থানে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হন। জরুরী ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগের পদক্ষেপ গ্রহণ করে তখনকার সমস্যা অনেকটাই দূরীভূত করা সম্ভব হয়েছিল। ঐ সময় ঢাকা কেবল একটি জেলা শহর ছিল। রাতারাতি প্রাদেশিক রাজধানীতে পরিণত হলে প্রায় সর্বক্ষেত্রেই নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। শহর সম্প্রসারণের ফলে সরকার কর্তৃক জমি অধিগ্রহণ, জমির মূল্য বৃদ্ধি, ভারত ও অন্যান্য জেলা হতে অসংখ্য লোকের ঢাকায় আগমনের ফলে বাসস্থানের চরম অভাব, অগ্রক্রয় বৃদ্ধি, সামান্য জমি- যার জন্য আগে আদৌ কোন চিন্তা না থাকলেও জমির মূল্য বৃদ্ধি বাড়ার কারণে প্রচুর ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার উদ্ভব হতে থাকে। পাশাপাশি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আবার নতুন করে বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দেড় কোটি শরণার্থী তাদের ঘরবাড়ি সহায়-সম্পত্তি পরিত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। মুক্তিযুদ্ধ শেষে শরণার্থীরা দেশে প্রত্যাবর্তন করলেও অনেকেই তাদের পরিত্যক্ত সহায়-সম্পত্তি বেদখল দেখতে পান। ফলে নতুন অনেক দেওয়ানি ও ফৌজদারি মোকদ্দমার সৃষ্টি হয়। অতি সম্প্রতি আর এক ধরনের মোকদ্দমার আধিক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যয়ন আইন ২০১১ সালে সংশোধনের পর জানা যায় যে, ইতোমধ্যে ৯ লাখ মোকদ্দমা দায়ের করা হয়েছে।

আইন কমিশনের কিছু সুপারিশ ॥ মামলা জট নিরসনে আইন কমিশন বেশকিছু সুপারিশ করেছে। কমিশনের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে, অপ্রতুল বিচারক : দেশের নিম্ন আদালতের বিচারাধীন ২৬ লাখ মামলাসহ নতুন দায়েরকৃত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিতকরণে আরও তিন হাজার নতুন বিচারক নিয়োগ করা।

এজলাসের অভাব ॥ অনেক জেলাতেই একটি এজলাসে দুই বা ততোধিক বিচারক বিচার কাজ পরিচালনা করে থাকেন। তাই দেশের আদালতসমূহে পর্যাপ্ত সংখ্যক এজলাস স্থাপন করা আবশ্যক।

প্রশিক্ষণ ॥ যদিও প্রাথমিক অবস্থায় বিচারগণের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, সার্ভে সেটেলমেন্ট ট্রেনিংসহ যাবতীয় ট্রেনিং এবং ব্যাপক ইনসার্ভিস ট্রেনিংসহ অন্তত দেড় বছর প্রশিক্ষণ দেয়ার পূর্বে আদালতে সরাসরি বিচারিক কার্যক্রমে নিয়োজিত করা ঠিক নয়। কিন্তু বর্তমানে অতি অল্প মেয়াদে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়েই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অথবা সহকারী জজ আদালতে বিচারকগণ বিচার কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন।

সাক্ষীর অনুপস্থিতি ॥ সাক্ষ্য গ্রহণে বিলম্ব মামলার দীর্ঘসূত্রতার একটি প্রধান কারণ। ফৌজদারি মামলায় পুলিশকে দ্রুত সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। স্পর্শকাতর মামলা প্রমাণে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

ক্রমাগত শুনানি ॥ সি,আর,ও এর ১২৫-১২৬ এবং সি আর আর ও এর ৩৩-৩৪ বিধিতে সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও একটি মোকদ্দমায় ক্রমাগত সাক্ষ্যগ্রহণ না করে দিনের পর দিন শুনানি মুলতবি করে শুনানি প্রলম্বিতকরণ রোধকল্পে সি,আর,ও এবং সি আর আর ও এর বিধির বিধান অনুসারে মামলা ক্রমাগত শুনানি শেষে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

সুপ্রীমকোর্টের জন্য প্রযোজ্য ॥ আইন কমিশন মনে করে উচ্চ আদালতে মামলাজট কমানোর লক্ষ্যে যেসব ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে তার মধ্যে রয়েছেÑ (ক) প্রত্যেকটি মোশান এফিডেভিটের তারিখ ও ক্রমানুসারে নিষ্পত্তি। এতে বেঞ্চ অফিসারদের দৌরাত্ম্যের হাত থেকে আবেদনকারীগণ রেহাই পেতে পারেন। (খ)২৫-৩০ বছর পূর্বে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে মোশান শুনানি করা হতো। যদি মোশান সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় আসে ও রুল ধনংড়ষঁঃব হওয়ার আদৌ সম্ভাবনা থাকে শুধু সে ক্ষেত্রেই রুল ইস্যু হতো, অন্যথায় সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়ে খারিজ করা হতো। এমনকি হড়ঃ ঢ়ৎবংংবফ করার প্রচলনও ছিল না। বর্তমানে যথেষ্ট সময় নিয়ে মোশান শুনানি করা প্রয়োজন।

(গ) যদি প্রকৃত আইনগত কোন কারণ ছাড়াই রুল ইস্যু করা হয়েছে বলে প্রধান বিচারপতির নিকট প্রতীয়মান হয় তা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। (ঘ) রুল ইস্যু করা ব্যতিরেকে আবেদনকারীর পক্ষে কোন আদেশ প্রদান না করা।(ঙ) হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক রুল জারি করার ৬ মাসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি না হলে উক্ত রুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হবার বিধান প্রণয়ন করার বিষয়টি বিবেচনা করা এবং (চ) অবকাশ কালীন বেঞ্চের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।

আরও বিচারক প্রয়োজন ॥ বর্তমানে ১৬ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে অন্তত ৪ হাজার বিচারক প্রয়োজন। এই হিসেবে বিদ্যমান পদ ব্যতিরেকে আরও অন্তত ২৪০০ নতুন পদ সৃষ্টি করা জরুরী। যদিও বাস্তবতার নিরিখে এত সংখ্যক বিচারক স্বল্প সময়ের মধ্যে নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু বিদ্যমান শূন্যপদ ব্যতিরেকে নিয়মিতভাবে প্রতিবছর অন্তত ২০০ জন করে নতুন বিচারক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এরূপ সিদ্ধান্ত জনস্বার্থে জরুরী। এমনকি এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেও অতিরিক্ত নতুন ২,৪০০ বিচারক নিয়োগে ১২ বছর সময় লাগবে। এভাবে ক্রমান্বয়ে নতুন বিচারকরা দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারবেন। এতে মামলা জটবৃদ্ধির হার কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের নিয়োগ দেয়া যেতে পারে ॥ অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে বিচার বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের মধ্য হতে দক্ষ, সৎ, যোগ্য কর্মকর্তাগণকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে। এ জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। নতুবা মামলা-মোকদ্দমার জট বৃদ্ধির প্রবণতা কোনভাবেই নিম্নগামী করা যাবে না। ২০০৯ সাল হতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে মামলা বিচার স্তরে উন্নীত হবার পর রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টরের পরিবর্তে এপিপি নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তব ক্ষেত্রে খুব একটি ফলপ্রসূ হয়নি। অধিকাংশ আদালতেই এপিপিগণ নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না কিংবা উপস্থিত থাকলেও সাক্ষী উপস্থাপনে উৎসাহবোধ করেন না। অনেক সময় সাক্ষী ফেরত দেয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে। ফলে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে মামলা নিষ্পত্তি বিঘিœত হয়।

মোবাইল কোর্টের ক্ষেত্রে ॥ মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি আপীল ফোরাম না রেখে বরং চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট মোবাইল কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত দ-াদেশের আপীলের বিধান রাখলে তা যৌক্তিক হয়। উক্ত আপীলের রায়ের বিরুদ্ধে শুধু আইনের প্রশ্নে দায়রা আদালতে রিভিশনের বিধান রাখা যেতে পারে। মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর অধীনে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট যখন আদালত পরিচালনা করে থাকেন, তখন সেই আদালত বর্তমান আইনী কাঠামোর আওতায় একটি পূর্ণাঙ্গ আদালত হিসেবেই কাজ করে থাকে। তাই দেশের মোবাইল কোর্টসমূহ ফসরহরংঃৎধঃরড়হ ড়ভ ঈৎরসরহধষঔঁংঃরপব’-এর অন্যতম অনুষঙ্গ। ফলে দেশের অপরাপর আদালতের মতো এই আদালতের উপরেও কিছুটা হলেও সুপ্রীমকোর্টের ঝঁঢ়বৎারংড়ৎু চড়বিৎ থাকা আবশ্যক। কেননা একজন সরকারী কর্মকর্তা যখন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গিয়ে দ- প্রদান করে তখন তিনি ‘পূর্ণ বিচারিক ক্ষমতা ও এখতিয়ার’ ব্যবহার করেই এ দ- আরোপ করেন। ফলে এই পূর্ণ বিচারিক কার্যক্রমের আপীল যেমন নিয়মিত আদালতে হওয়া উচিত, তেমনি দেশের অপরাপর আদালতসমূহের মতো সুপীমকোর্টের ঝঁঢ়বৎারংরড়হ-এর আলোকেই এই আদালতসমূহের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ৫ ধারার ধারাবাহিকতায় ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অন্তত মোবাইল কোর্টসংক্রান্ত পরিসংখ্যান সুপ্রীমকোর্টে নিয়মিত প্রেরণ করার লক্ষ্যে বিধান প্রণয়ন আবশ্যক।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: