২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সাড়ে পাঁচ হাজার খাতা উধাও ॥ শুরুতেই হোঁচট


সমুদ্র হক ॥ প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষার ফলাফলের পর চ্যালেঞ্জ করা বিষয়ের খাতা পুনর্নিরীক্ষণের কেলেঙ্কারির পাকে পড়েছে বগুড়ার কোমলমতি মেধাবী শিক্ষার্থীরা। পুনরায় নিরীক্ষণের সময় অতিবাহিত হওয়ার আগেই অন্তত সাড়ে পাঁচ হাজার খাতা উধাও হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের শিবগঞ্জ গুদাম থেকে। তদন্ত কমিটি করেও এসব খাতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। মেধাবী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা শঙ্কিত।

পুনর্নিরীক্ষার প্রতি বিষয়ে সরকারী ফি জমা দিয়ে, কর্মকর্তাদের কাছে ধর্ণা দিয়েও কোন সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে না। শিক্ষা অফিসের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা/কর্মচারী বিষয়টি ধামাচাপা দিতে মাঠে নেমেছেন। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বিষয়টি প্রকাশ না করার হুমকি-ধমকিও দিচ্ছেন। তার মধ্যেই কয়েকটি স্কুল নিজেদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতি দৃষ্টি রেখে বিষয়টি প্রকাশ করলে থলের বেড়াল বের হয়ে আসে। খাতা চ্যালেঞ্জ করা শিক্ষার্থীরা শতভাগ নিশ্চিত যে, পুনর্নিরীক্ষণ হলেই তাদের পূর্বের ফল আরও এগিয়ে জিপিএ-৫ হবেই।

বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হোসেন আলী কোন দায় না নিয়ে, চ্যালেঞ্জ করে কোন লাভ হবে না, ছেলেমেয়েদের যে ফল এসেছে তা মেনে নিতে বলছেন অভিভাবকদের। দায়সারা করে মিডিয়াকে বলেন, বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদফতরকে জানানো হয়েছে। ওপর মহলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন তিনি। খাতা উধাও হওয়ার বিষয়ে শিবগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। পুলিশী তদন্তের পর প্রমাণ সাপেক্ষে জিডিকে মামলায় রূপান্তর করা হয়নি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলছেন, চুরি হয়েছে তা কিভাবে বলা যাবে! দরজা বন্ধ ও দুইটি তালা ইনট্যাক ছিল। জানালা দেয়াল ভাঙ্গা হয়নি। তাহলে ২৭ বস্তার মধ্যে তিন বস্তা কি হলো এর কোন উত্তর নেই। গুদামের তালার চাবি থাকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জিল্লুর রহমান ও সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে।

পুনর্নিরীক্ষণের আগে কিভাবে গুদাম থেকে খাতা উধাও হলো এই নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। আলোচনা হচ্ছে সকল মহলে। গ্রামের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের ভয়ে মুখ খুলছে না।

গেল বছর (২০১৫) প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষার পর ওই বছরই ৩১ ডিসেম্বর ফল প্রকাশিত হয়। কোন বিষয়ের ফল পুনর্মূল্যায়ন বা পুনর্নিরীক্ষণের জন্য শিক্ষার্থীদের ১৫ দিনের সময় দেয়া হয়। জানুয়ারির ১৫ তারিখের মধ্যে তারা খাতা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পায়। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার সকল প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পিইসি পরীক্ষার ফলের চ্যালেঞ্জ হয় ৯০ জনের। এর আগে পরীক্ষা শেষে ওই উপজেলার প্রায় ৪২ হাজার পরীক্ষার্থীর খাতা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে জমা দেয়ার পর খাতা নিরীক্ষণের জন্য বণ্টন করা হয়। খাতা দেখার পর পুনরায় তা শিবগঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ফেরত পাঠিয়ে ভালভাবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়। খাতাগুলো প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কোন কক্ষে না রেখে পাশের মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। ফল প্রকাশের পর শিবগঞ্জের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করে নিয়মমতো। প্রতিটি বিষয়ে ২শ’ টাকার পেঅর্ডারসহ আবেদন জমা দিতে হয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে। শিক্ষা কর্মকর্তা খাতাগুলো শিবগঞ্জ গুদাম থেকে বের করার নির্দেশ দেন। ১৯ জানুয়ারি খাতাগুলো খোঁজার সময় তিন বস্তায় রাখা ৫ হাজার ৫শ’টি খাতার হদিস মেলে না। বিষয়টি থানায় জানিয়ে জিডি করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করে। ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর জেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ সাহাকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। বাকি দুই সদস্য হলেন শেরপুর ও কাহালুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা যথাক্রমে আব্দুল কাইয়ুম ও সারোয়ার হোসেন। তদন্তের পর তারা যে রিপোর্ট দিয়েছেন তাতেও খাতা চুরির বিষয়টি এসেছে। জেলার প্রায় এক হাজার খাতা চ্যালেঞ্জের মধ্যে শিবগঞ্জের বিভিন্ন স্কুলের যে ৯০ জন চ্যালেঞ্জ করেছিল তার ৭৩টি খাতা মেলে বাকি ১৭টি খাতা পাওয়া যায় না। এই ১৭ জনের ফল ছিল এ ও এ মাইনাস। এই পরীক্ষার্থীরা যে এ প্লাস (জিপিএ-৫) পাবে সেই আত্মবিশ্বাস তাদের আছে। যারা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছিল তাদের পুনর্মূল্যায়নে জিপিএ-৫ এসেছে। খাতা খুঁজে না পাওয়া ১৭ জনই স্কুলের মেধাবী। আমতলি মডেল স্কুল, বাড়িয়াহাটা মাল্টিমিডিয়া কেজি স্কুলসহ কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই চ্যালেঞ্জ করেছিল। একজনের খাতা পুনর্মূল্যায়নে এ গ্রেড থেকে এ প্লাস এসেছে। বাকি খাতাগুলো ইংরেজীর। গুজিয়া গ্রামের রাহাত হোসেন ও ধোন্দাকোলা গ্রামের সমা রানী মোদক এতটাই মেধাবী ও নিশ্চিত খাতা পুনর্নিরীক্ষণ হলে এ প্লাস আসবেই। স্কুলের ক্লাস টিচার ও প্রধান শিক্ষকরা সহমত পোষণ করেন।

স্কুলের শিক্ষক এবং অভিভাবকরা অভিযোগ করেন; জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হোসেন আলী ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জিল্লুর রহমানের কাছে খাতা দেখার জন্য গেলে তারা রূঢ় আচরণ করেন, খাতা হারিয়ে গেছে। যে ফল হয়েছে তা মেনে নিতে বলেন। এ অবস্থায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া পড়েছে। কোমলমতি মেধাবী শিক্ষার্থী যারা শিক্ষাজীবনের শুরুতে হোঁচট খেল তাদের কী হবে এমন প্রশ্নে জেলা শিক্ষা অফিসার সাফ বললেন ‘তার কিছুই করার নেই(!)। উল্লেখ্য, তারই নিয়ন্ত্রণে থাকা সাড়ে পাঁচ হাজার খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আগেই চুরি হয়ে গেছে গুদাম থেকে।