২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডাল ও সমাজ পরিবর্তন -স্বদেশ রায়


কয়েকদিন আগে ভারতে ইংরেজী ভাষার লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে একটা লেখা পড়ছিলাম। যারা গোটা ইন্ডিয়াকে জানেন, তারা ভাল করেই জানেন, ওই ভাষা বৈচিত্র্যের ভূগোলে সবার কাছে কথাগুলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ইংরেজী এখন আর তাদের বিদেশী কোন ভাষা নয়। ওটা তাদের মূল মাধ্যমও বলা যেতে পারে। যাহোক, সে গেল ভিন্ন দিক। ওই লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে লেখাটা পড়তে পড়তে ওদের সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের সঙ্গে আমাদের ষাটের, সত্তরের ও আশির দশকের লিটল ম্যাগাজিনগুলো এবং যারা ওই ম্যাগাজিনগুলো করতেন তাদের ত্যাগের ও আকাক্সক্ষার হুবহু মিল খুঁজে পাই। সেই সাহিত্যের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, সেই সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা। কোন কোন তরুণ সেদিন এ কাজের জন্য তাদের একাডেমিক পড়াশোনাকে গুরুত্ব দেয়ারও সময় পায়নি। তার জন্য সারাজীবন তারা মূল্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজ পরিবর্তন হয়েছে কি হয়নি তা তো আর বর্তমান সমাজে বসে বলা যায় না। ভবিষ্যতই মূল্যায়ন করবে, যে পথটুকু এগোলো- এখানে কে কী ভূমিকা রেখেছে।

এই সব ভূমিকার কথা যখন লেখা হয়, তখন রাজা-বাদশাহদের কথাই লেখা হয়, হরিপদ কেরানি সেখানে ঠাঁই পায় না। সমাজ পরিবর্তনে বড় নেতাদের কথাই লেখা থাকবে। তাদের মূর্তি তৈরি হবে মোড়ে মোড়ে। অথচ ইতিহাসের পাথরের তলায় পড়ে থাকা কিছু ঘামের ফোঁটার কথা কেউ জানবে না- যাদের ঘাম ওই মূর্তিকে মানব থেকে মূর্তি হতে সাহায্য করেছিল। যারা লিটল ম্যাগাজিন বের করে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে তাদের ইন্দ্রমণির হারের মতো মূল্যবান তারুণ্যকে বিনামূল্যে দিয়েছে সমাজকে রাজকন্যা শ্যামার মতোই ভালবেসে। তাদের তারুণ্যের এক বিন্দু ঘামের কথাও জানবে না ইতিহাস।

মানুষের সভ্যতার ইতিহাসের বিবর্তনে এই হারিয়ে যাওয়া ইন্দ্রমণির হারের সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু কোমল পৃথিবীর আরেকটি ধর্ম নির্মমতা। নির্মম পৃথিবী ভুলে যায় সকল ইন্দ্রমণির হারকে। হরপ্পা নগরী ধ্বংস হয়ে গেছে। সভ্যতার ইতিহাস বিনির্মাণে কতভাবে না খোঁজা হচ্ছে হরপ্পার সভ্যতার কারিগরদের। কিন্তু ওই সেদিনের সেই গভীর রাতে ওই নগরীর পানির গেট রক্ষা করার জন্য যে গলাটি চিৎকার করে ডেকেছিল মানুষকে। যার ধ্বনি ঘুমন্ত হরপ্পা নগরীর বাতাসে কেঁপে কেঁপে মিশে যায় মহাকাশের বাতাসের সঙ্গে তার কথা কেউ মনে রাখেনি। আসলে ঘুমন্ত সমাজকে জাগাতে যুগে যুগে এই যে ইন্দ্রমণির হারের সমতারুণ্য বা যৌবনকে বিনামূল্যে বিকিয়ে দিয়েছে, এমনি চিৎকার করে ডেকেছে- এমন অসংখ্য’র থাকে না কোথাও কোন অবস্থান।

এই যে যারা বিনামূল্যে সমাজের জন্য, মানুষের জন্য- দেশের জন্য তারুণ্যকে বিক্রি করতে চায় এদের মুখগুলোই কিন্তু বলে দেয়, কেন শ্যামা ওই ভিন দেশী বণিককে বন্দী অবস্থায় দেখেই অমন করে নিজেকে পাগল করেছিল। সর্বশেষ এই তরুণ মুখ দেখেছি শাহবাগের গণজাগরণ চত্বরে। মাঘের সকালে পূর্ব দিক থেকে সূর্যের আলো গিয়ে পড়ত পিজি হাসপাতালের সামনে আমের মুকুলগুলোর ওপর- সূর্যের আলোয় সোনালি ওই মুকুলগুলো হার মেনে যেত শাহবাগের রাস্তায় ফুটে ওঠা শত শত মুকুলের কাছে। তখন মনে মনে ভাবতে ইচ্ছে হতো, ট্রেনিং শেষে প্রথম একটি অস্ত্র হাতে পেয়ে যে তরুণ দেশের ভেতর ঢুকত, তার মুখে এই সোনালি সূর্য কী আভা ছড়াত! তার শ্যামল রঙের ছটা কি হারিয়ে দিত না সোনালি সূর্যের আভাকে। অস্ত্র হাতে খালি পায়ের তরুণ থেকে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সেই সব ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডাল পায়ের তরুণদের।

লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে ওই লেখাটির একটি পর্যায়ে ছিল, এখন কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন টিকে আছে। তাদের কয়েকটি এখন সফট কপিতে চলে গেছে। নিউজ পোর্টালের মতো অনেকটা লিটল ম্যাগাজিন পোর্টাল আর কি? কিন্তু সব থেকে ভাল লাগল এদের ভেতর কয়েকটি এখনও সমাজ পরিবর্তনের কথাই ভাবছে। সেই লক্ষ্যেই আন্দোলন করে যাচ্ছে তাদের ওয়েব লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে।

রুশ বিপ্লবের পর থেকে সমাজ পরিবর্তনের কথা বললেই আমরা ধরে নেই বুঝি সমাজকে পরিবর্তন করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ করা হবে। শুধু লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে নয়, যুগে যুগে যারা সমাজ পরিবর্তন চেয়েছে, সমাজ পরিবর্তনের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন তারা কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক পরিবর্তন চাননি। এমনকি মার্কসও কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক পরিবর্তন চাননি। মার্কসের আগেও বুদ্ধ, কনফুসিয়াস হয়ে অনেক সমাজ পরিবর্তনকারী জন্মে গেছেন। তাদের শক্ত হাতে পাথর সরিয়ে তৈরি করা পথেই আমরা সাবলীল হাঁটছি। তাই সমাজের পরিবর্তন অনেক বড়। ওই যে তরুণ যার স্যান্ডাল ক্ষয়ে যেত লিটল ম্যাগাজিন বের করতে গিয়ে, তিনি সমাজের কত বড় পাথর নিজ হাতে সরিয়ে ছিলেন বা আদৌ সরাতে পেরেছিলেন কিনা তা বড় নয়। কিন্তু তিনি নিজের ভেতর একটি বড় বিপ্লব করতে পেরেছিলেন। তিনি নিজেকে পরিবর্তন করতে পেরেছিলেন। সমাজ পরিবর্তনের সব থেকে বড় বিষয় কিন্তু নিজেকে পরিবর্তন করা।

যেমন আজ রাষ্ট্র, সমাজের যে কোন স্থানের কথা, প্রতিষ্ঠানের কথা উঠলে সেখানে ঘুষের কথা আসে, দুর্নীতির কথা আসে। এমনকি অনৈতিকতার কথা আসে। যেমন শিক্ষামন্ত্রী উদ্বিগ্ন। তিনি একের পর এক পথ খুঁজছেন, কিভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করা যায়। তিনি অসহায় হয়ে পড়ছেন, কারণ অনেক শিক্ষককে জড়িত পাচ্ছেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে। কেন ওই শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছেন। কারণ কোথায়? এর মূল কারণ কিন্তু তারুণ্যে তার ভেতর কোন বিপ্লব ঘটেনি। পরিবার বা তার সঙ্গীরা কেউ তাকে এমন কোন কিছুতে টেনে নিয়ে যায়নি- যা তার জীবনে বিপ্লব ঘটাবে। বদলে দেবে তার জীবনাদর্শ। যেমন ওই যে তরুণ যিনি ষাট, সত্তর বা আশির দশকে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন করতেন। যার স্যান্ডাল ক্ষয়ে যেত লিটল ম্যাগাজিন বের করার রসদ জোগাড় করতে। যিনি, লাইব্রেরিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়তেন এক অদ্ভুত নেশায়। তিনি যদি শিক্ষক হন, তিনি কিন্তু জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করতে রাজি হবেন এমনকি জীবনটিকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে দিয়ে দেবেন; কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে দেবেন না তার জ্ঞাতসারে। আজ হয়ত তিনি প্রৌঢ়ত্ব ছাড়িয়ে গেছেন, কিন্তু আশির দশকে যে মনটি নিয়ে তিনি একুশের বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন নিয়ে বসতেন, আজও তা ধারণ করে আছেন। কারণ, তিনি তাঁর নিজের মনো-ভূগোলকে বদলাতে পেরেছিলেন জ্ঞান ও ত্যাগ দিয়ে ছাত্র জীবনে।

হ্যাঁ, অনেকে হয়ত ধরে রাখতে পারেননি। পরবর্তীতে লোভের কাছে তারা পরাজিত হয়েছেন। এর দুটি কারণ, এক লোভকে জয় করার জন্য মানুষের যে জ্ঞানের দরকার হয় ওই জ্ঞান মহাসাগরসম। এ অর্জন করা আরেক হিমালয় জয় করার সময়। হিমালয় তবু কয়েকদিন ধরে দুর্গম বরফময় পথ পাড়ি দিলে জয় করা যায়। কিন্তু জ্ঞানের পথে চলতে হলে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে নিজেকে সেখানে নিয়োজিত রাখতে হয়। জাগতিক নানান টানাপোড়েনে বা প্রৌঢ়ত্বে এসে অনেকেই তাই ক্লান্ত পথিক হয়ে পড়েন। এ কারণে প্রফেসর রাজ্জাক বলেছেন, জীবনের দশটা বছর যদি কেউ সৎ থাকে তাও সমাজের জন্য অনেক বড় বিষয়।

এই দশ বছর যাতে সর্বোচ্চ সৎ থাকে আর নিজ নিজ কর্মস্থলে যাতে নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়- এটুকু না হলে কিন্তু একটি সমাজ চলতে পারে না। এটুকু না হলে সেখানে সকল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যর্থ হয়ে যায়। আর এর জন্য দরকার, সমাজকে সার্বিক পরিবর্তনের একটি চলমান বিপ্লবের মধ্যে রাখা। এই চলমান বিপ্লব কিন্তু কখনই রাজপথে হয় না, পরিবারে, শিক্ষাঙ্গনে, সাহিত্য আন্দোলনে, সংস্কৃতির নানান কলায়, বিজ্ঞান আন্দোলনে, পরিবেশ আন্দোলনে, স্কাউটিং, গার্ল গাইডস, শরীরচর্চাসহ নানান কিছুর ভিতর নিহিত থাকে এই চলমান বিপ্লব। পহেলা বৈশাখের দিন যে তরুণ শিল্পীরা রাজপথকে মনের রঙে রাঙায়, সেখানে রাজপথ শুধু নতুন সাজে সাজে না তারও মনটাতে আরেকটি নতুন মনের জন্ম নেয়।

এই নতুন নতুন মনের জন্মই কিন্তু আধুনিক সমাজের দিকে এগিয়ে যাওয়া, সমাজ বিপ্লবের বিবর্তনের সঙ্গী হওয়া। একুশের বইমেলা চলছে। প্রতি বছর এখন অনেক কষ্টে কিছু তরুণ নিয়ে আসে লিটল ম্যাগাজিন। আগামীতে তারা নিয়ে আসবে ওয়েবে লিটল ম্যাগাজিন। হয়ত বিক্রি করবে সফট কপি বা অন্য কোনভাবে সরবরাহ করবে। নিশ্চয়ই বাংলা একাডেমি তাদের জন্যও কোন স্থান বরাদ্দ করবে। থেমে থাকবে না সমাজ। যাদের চক্ষু-কর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা তারা হয়ত কিছুটা বাধা দেবে। তারপরও তরুণরা তাদের সমাজের দায় তাদের নিজের কাঁধে তুলে নেবে। পরিবর্তন হবে। পরিবর্তিত হবে মানুষ ও সমাজ।

swadeshroy@gmail.com