২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিশ্বে দেখা দেবে নেতৃত্ব সঙ্কট


জাতীয় হোক আন্তর্জাতিক হোক যে কোন জরুরী পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের এক অসাধারণ ভূমিকা থাকে। ২০১৬ সালের মতো এক টালমাটাল বছরে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে যে, বিশ্বে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটা অভাব দেখা দিয়েছে। দেখা দিয়েছে শূন্যতা। এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো জি-৭ শিল্পায়িত দেশগুলোর প্রধানরা ভূরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। সেই দিন চিরতরে বিদায় নিয়েছে। আজকের আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী প্রসারিত হয়েছে জি-২০-এ। সেখানে চীন ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান শক্তিও আছে। আয়তসে প্রসারিত হলেও এই গোষ্ঠী বিভিন্ন ইস্যুতে মতৈক্যে পৌঁছতে পারছে অনেক কম। এর ফলে এই গোষ্ঠীর অভিন্ন কোন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যবোধ বা অগ্রাধিকার নেই। ভবিষ্যত নিয়ে তাদের কোন রূপকল্প নেই। বহু বছরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই শূন্যতা এখন আমাদের ওপর চেপে বসেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এখন আর আন্তর্জাতিক পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকা পালন করা এমনকি সেই ভূমিকা পালনের ভান করাও সম্ভব নয়। কারণ দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে বিদেশে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন রাখার পেছনে অর্থ ব্যয় করতে মার্কিন করদাতারা আর রাজি নয়। এ কথা আইসিস মোকাবেলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাছাড়া সন্ত্রাসী হামলার জবাবে পাল্টা আঘাত হানতে নাইন-ইলেভেনের মতো অভিন্ন বা এককাট্টা মার্কিন জনমতও আর কোনদিন গড়ে উঠবে না। আবার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাস মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লগিরিও তেমন কেউ মানতে চাইছে না। সাবেক জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী কার্ল থিওডোবেনের ভাষায়, ট্রান্স আটলান্টিক আস্থা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী বছরে তা আরও বেড়ে গেছে। নির্বাচনী প্রচারে এমন কথাও উঠেছে যে, ‘ইউরোপকে ভুলে যাও।’

বিদেশে প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক দিয়ে আমেরিকার একদা যে প্রাধান্য ছিল তা দ্রুত ফিকে হয়ে আসছে। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা আইসিস ইরাক ও সিরিয়ায় বিশাল ভূখ- দখল করে বসে আছে। ইউক্রেনে রাশিয়াকে কিছুই করতে পারছে না আমেরিকা। পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন সামরিক শক্তি এবং অন্যত্র ওয়াশিংটনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে চীন। বিশ্বের সবচেয়ে জটিল সমস্যাবলীর সমাধানে যে ঐকমত্য গড়ে তোলা প্রয়োজন সে ব্যাপারে তেমন কিছু করতে পারছে না আমেরিকা। ইউরোপও নিজেদের সমস্যা নিয়ে এত ব্যতিব্যস্ত যে, তারাও এ ব্যাপারে কিছু করতে পারছে না। চীনও নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। এ অবস্থায় আইসিস থেকে শুরু করে বিশ্ব জলবায়ু, রাজনৈতিক স্থিতি ও জনস্বাস্থ্য সমস্যাসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার কেউ নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের মতো ভয়াবহ সমস্যা বিশ্বের আর কোথাও নেই। সেখানে একদিকে চলছে অকল্পনীয় বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং অন্যদিকে নেতৃত্ব সঙ্কট। সেখানে আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে দুই শক্তি সৌদি আরব ও ইরান বিভিন্ন ফ্রন্টে প্রক্সিযুদ্ধে লিপ্ত। এই প্রক্সিযুদ্ধের কারণে ইয়েমেনে রক্তপাত ঘটে চলেছে। ইরাকে বিরাট জায়গা দখলে নিয়েছে সুন্নি সংগঠন আইসিস। সিরিয়ায় আইসিস নিয়ন্ত্রিত ভূখ-ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্ক, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশের বোমাবর্ষণ চলতে থাকবে। তবে তাতে সামরিক দিক দিয়ে তেমন কোন প্রভাবই পড়বে না। সিরিয়ার উদ্বাস্তুর ঢল আশপাশের দেশগুলোতে অব্যাহত থাকবে। এক শ’ কোটি ডলারেরও বেশি আর্থিক রিজার্ভ ও সামাজিক মিডিয়াকে কাজে লাগানোর বদৌলতে আইসিসের আন্তর্জাতিক প্রভাব আরও প্রসারিত হবে এবং বিদেশে এর সহিংস তৎপরতা বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যে লড়াই ক্রমশ যে তীব্ররূপ ধারণ করবে তাতে কোন নেতাকে শান্তি পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় কোন সুবিশাল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা যাবে না।

২০১৬ সালে ইউরোপ আরও ব্যাপক পরিসরে বিভিন্নমুখী সমস্যার সম্মুখীন হবে। অথচ সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ঐক্যবোধ গড়ে উঠবে না। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কেন্দ্রবিন্দুতে জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলকে দেখা গেলেও জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তার সামনে বাস্তব কোন বিকল্প থাকবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবধান বাড়বে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে ভাল সংবাদটা হলো- ২০১৬ সালে পূর্ব এশিয়া অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকবে। কারণ চীন, জাপান ও ভারত তাদের নিজ নিজ অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে বলেই সংঘাতে যেতে চাইবে না। তথাপি এই অবস্থায় চীন মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার অন্য উপায়ের সন্ধান করবে। এক্ষেত্রে সে তার ৩.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কাজে লাগাবে। উন্নয়নশীল যেসব দেশ মার্কিন দাবি পূরণ করতে রাজি নয় তারা চীনের দ্বারস্থ হবে।

এতে করে চীন শক্তিশালী হয়ে উঠলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে দেশটিকে মোটেই আগ্রহী হতে দেখা যাবে না। চীন আইসিসের বিরুদ্ধে লড়বে না। সিরিয়ার পুনর্গঠনেও সাহায্য করবে না। রাশিয়া ও পাশ্চাত্যের মধ্যে উত্তেজনা লাঘবেও সাহায্যের হাত বাড়াবে না। চীন বিশ্বের একমাত্র দেশ যার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সত্যিকারের বৈশ্বিক স্ট্র্যাটেজি আছে। তবে সেই স্ট্র্যাটেজির লক্ষ্য চীনের নিজস্ব সমস্যার সমাধান- বিশ্বের সমস্যার নয়। এভাবে বিশ্ব এক নেতৃত্বাধীন অবস্থায় দাঁড়াবে যেখানে আন্তর্জাতিক পরিসরে বড় ধরনের জরুরী পরিস্থিতি দেখা দিলে তা মোকাবেলার জন্য নেতৃত্বের ভূমিকায় কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সূত্র : টাইম